ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের আট মাস পূর্ণ হতে চলেছে। এমন সময়ে এসে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী চাপে আছে বলে স্বীকার করেছেন যুদ্ধক্ষেত্রের দায়িত্ব পাওয়া নতুন রুশ কমান্ডার। তার এই স্বীকারোক্তি বেশ বিরল। রুশ কমান্ডারের এই স্বীকারোক্তি যুদ্ধক্ষেত্রের সত্যিকারের পরিস্থিতি সম্পর্কে রাশিয়ার উদ্বেগকে সামনে তুলে এনেছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার কমান্ডার হিসেবে চলতি মাসের প্রথম দিকে নিযুক্ত হন রুশ বিমান বাহিনীর জেনারেল সের্গেই সুরোভিকিন।
তিনি বলেছেন, ইউক্রেনের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে রাশিয়ার হাতছাড়া হয়ে যাওয়া ভূখণ্ডগুলো পুনরুদ্ধারের জন্য চাপে আছে রুশ বাহিনী। ইউক্রেনের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলীয় চারটি এলাকাকে কয়েক সপ্তাহ আগেই রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার ঘোষণা দেয় মস্কো। কিন্তু এরপরই সেসব এলাকায় ইউক্রেন তীব্র পাল্টা আক্রমণ শুরু করলে চাপে পড়ে যায় রুশ সেনারা।
খেরসনের পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠেছে
রুশ সেনাবাহিনীর নতুন কমান্ডার বলেছেন, খেরসনের পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের শহর ছেড়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেয়া সাক্ষাৎকারে জেনারেল সের্গেই সুরুভিকিন বলেছেন, ইউক্রেনের সৈন্যদের ছোঁড়া হিমার্স রকেট শহরের অবকাঠামো আর বাড়িঘরে আঘাত করছে।
তিনি বলেছেন, ‘খেরসনের বাসিন্দাদের নিরাপদে শহর ছেড়ে যাওয়ার ব্যাপারে সব রকম সহায়তা করবে রাশিয়ার সেনা সদস্যরা’। জেনারেল সুরুভিকিন বলেছেন, ‘বিশেষ সামরিক অভিযানের পুরো এলাকাজুড়েই উত্তেজনা রয়েছে’।
তার এই বক্তব্য ইউক্রেনে হামলা চালানো রাশিয়ার সৈন্যদের সংকটে থাকার বিরল এক স্বীকারোক্তি। এর আগে স্থানীয় শীর্ষ একজন কর্মকর্তাও এ ধরনের মন্তব্য করেছিলেন। রুশ সমর্থিত আঞ্চলিক কর্মকর্তা কিরিল স্তেরেমোসভ এর আগে খেরসনের বাসিন্দাদের সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, খুব তাড়াতাড়ি ইউক্রেনের সৈন্যরা খেরসনে হামলা চালানো শুরু করবে।
‘আমার কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনুন-আমি পরামর্শ দিচ্ছি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শহর ছেড়ে চলে যান,’ টেলিগ্রাম অ্যাপের মাধ্যমে তিনি এই বার্তা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, নিপার নদীর পশ্চিম তীরে যারা রয়েছেন, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইউক্রেনে হামলা শুরু পর খেরসন শহরটি প্রথম দখল করেছিল রাশিয়া।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ধীরে ধীরে আশেপাশের এলাকা পুনরুদ্ধার করতে শুরু করে ইউক্রেনের বাহিনী। তারা এখন নিপার নদীর দক্ষিণে ৩০ কিলোমিটারের মধ্যে চলে এসেছে। ফলে সেখানে থাকা রাশিয়ার সৈন্যদের ফাঁদে আটকে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
হামলা শুরুর পর রাশিয়ার দখলে নেয়া ইউক্রেনের একমাত্র আঞ্চলিক রাজধানী খেরসন। ক্রেমলিন এখন দাবী করছে, খেরসন এবং ইউক্রেনের অন্য তিনটি এলাকা রাশিয়ার অংশ হয়ে গেছে- যে দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে আঞ্চলিক সম্প্রদায়।
রাশিয়ার হামলার পর সহস্রাধিক শহরে ব্ল্যাকআউট
ইউক্রেনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাশিয়ার সাম্প্রতিক হামলার পর ইউক্রেনের সহস্রাধিক শহর ও গ্রাম বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, গত আট দিনে রাশিয়ার হামলায় ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস হয়ে গেছে। এমনকি মঙ্গলবারের হামলার পর কিয়েভের কিছু অংশ বিদ্যুৎ এবং পানিবিহীন রয়েছে।
ইউক্রেনের জরুরি সেবা বিভাগের মুখপাত্র ওলেকসান্দির খোরুনযায়ি বলেছেন, অক্টোবরের সাত থেকে ১৮ তারিখ পর্যন্ত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোয় চালানো হামলায় ১১টি অঞ্চলের প্রায় চার হাজার বসতি বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এই মুহূর্তে ১১৬২টি বসতি বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় রয়েছে।
ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় শীত আসতে আর কয়েক দিন বাকি। দেশের তাপমাত্রা ইতিমধ্যে কমতে শুরু করেছে। নভেম্বরে সাধারণত তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকে। আর ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে থাকে। এই সময় বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়ে যায়। পূর্ণমাত্রার শীত যখন আসি আসি করছে, ঠিক তার আগে গত এক সপ্তাহে রুশ হামলায় ইউক্রেনের ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস হয়েছে। এতে দেশটির ১ হাজার ১০০ শহর ও গ্রাম বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
নর্ড স্ট্রিম পাইপলাইনে বিস্ফোরণ
রাশিয়া থেকে জার্মানিতে সমুদ্র তলদেশ দিয়ে যে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ করা হয়, সেই নর্ড স্ট্রিম পাইপলাইনের অন্তত ৫০ মিটার (১৬৪ ফিট) গত মাসের একটি বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়ে গেছে। নরওয়ের একটি রোবট কোম্পানির তোলা ভিডিওতে দেখা গেছে, ওই স্থানটি ছিন্নভিন্ন অবস্থায় রয়েছে। ওই ভিডিও প্রকাশ করেছে সুইডেনের সংবাদ মাধ্যম এক্সপ্রেসেন।
ডেনমার্কের পুলিশ ধারণা করছে, শক্তিশালী বিস্ফোরণে পাইপলাইনে চারটি গর্তের তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে কাছাকাছি থাকা নর্ড স্ট্রিম-২ পাইপলাইনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ঘটনার পেছনে অন্তর্ঘাতের ধারণা করা হলেও কী কারণে বিস্ফোরণ ঘটেছে বা কারা এর পেছনে রয়েছে, তা এখনো জানা যায়নি।
বাল্টিক সাগরের নীচ দিয়ে যাওয়া ওই পাইপলাইনে বিস্ফোরণের কারণে গত ২৬শে সেপ্টেম্বর থেকে গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। প্রথমে ওই বিস্ফোরণের জন্য রাশিয়াকে দায়ী করেছিলেন পশ্চিমা নেতারা। যদিও পরবর্তীতে সেই অবস্থান থেকে তারা সরে আসেন।
অন্যদিকে, ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, ‘সাধারণ যুক্তিতে বলা যায়, পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটা রাশিয়ার স্বার্থের সঙ্গে যায় না’। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা এর আগে অভিযোগ করেছিলেন, গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাকে একটি অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করছে রাশিয়া।
রাশিয়াকে ইরানের ড্রোন সরবরাহ নিষেধাজ্ঞার লঙ্ঘন: যুক্তরাষ্ট্র
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে মোড় ঘুরছে ইরানের ড্রোনে, বিশ্ব গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এমনটাই দাবি করা হচ্ছে কয়েক সপ্তাহ ধরে। এটা নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, বিস্ফোরণের ক্ষমতাবাহী ইরানের ড্রোন রাশিয়ার কাছে সরবরাহ করার মানে হচ্ছে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার লঙ্ঘন।
গত সোমবার ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে একাধিক ‘কামিকাজি’ ড্রোনের হামলা চালানো হয়েছে। রাশিয়া ওই হামলা চালালেও এসব ড্রোন ইরানে তৈরি বলে বিশ্বাস করা হয়। এসব ড্রোন ইরানে তৈরি শাহিদ-১৩৬ বলে শনাক্ত করেছে ইউক্রেন, যাকে কামিকাজি ড্রোন বলে বর্ণনা করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের যে ফাইটার বিমানের যোদ্ধারা আত্মঘাতী হামলা চালাতেন, তাদের নামের সঙ্গে মিল রেখে এই নামকরণ।
ফরাসি ও ব্রিটিশ মিত্রদের সঙ্গে বিশ্লেষণের পর যুক্তরাষ্ট্র একমত হয়েছে, ইরানের ওপর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তার লঙ্ঘন। ইরানের পারমাণবিক চুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত ওই নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী, বেশ কিছু সামরিক প্রযুক্তি সরবরাহের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তা ভিদান্ত প্যাটেল বলেছেন, রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতাকে সারা বিশ্ব একটি হুমকি হিসাবে দেখবে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে সামরিক সহায়তা দিয়েছে এই দুই দেশ ইরানের সাথে যারা ব্যবসা করবেন, তাদের যদি ইউএভি অথবা ব্যালেস্টিক মিসাইল কর্মসূচীর সঙ্গে কোন সম্পৃক্ততা থাকে, অথবা ইরান থেকে রাশিয়ায় অস্ত্র সরবরাহে কোনরকম সংযোগ পাওয়া যায়, তাহলে তাদের খুব সতর্ক হওয়া উচিত এবং বুঝেশুনে কাজ করা উচিত। যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা জারি করতে দ্বিধা করবে না।
এর মধ্যেই নতুন খবর মিলেছে যে, রাশিয়াকে আরও ড্রোন ও ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইরান। ইরানের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও দুই কূটনীতিকের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স আজ বৃহস্পতিবার এ তথ্য জানিয়েছে।
ইরান রাশিয়াকে যে ড্রোনগুলো দেবে তার মধ্যে একটি হলো শহীদ-১৩৬ ‘কামিকাজে’ ক্ষেপণাস্ত্র। আর ফাতেহ-১১০ ও জুলফাগার ক্ষেপণাস্ত্র ৩০০ থেকে ৭০০ কিলোমিটার দূরত্বের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।
শহীদ-১৩৬ বা কামিকাজে ড্রোনগুলো বিদ্যুৎকেন্দ্র বা অন্যান্য স্থাপনা বা স্থির বস্তুতে হামলা চালানোর জন্য বেশ কার্যকর। সামরিক বাহিনীর ওপর এগুলো ব্যবহারে অতটা সফলতা পাওয়া যায় না। এ জন্য ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে ব্যাপক আকারে ক্ষতি সাধনের উদ্দেশ্যেই কামিকাজে ড্রোন ব্যবহার করছে রাশিয়া। ছোট প্রাণঘাতী এ ড্রোনগুলো রাডারে শনাক্ত করা কঠিন।
কামিকাজে শব্দটির উৎপত্তি হলো জাপানে। অর্থ আত্মঘাতী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানিরা কৌশল হিসেবে এটি ব্যবহার করত। কৌশল হলো শত্রুর লক্ষ্যবস্তুতে বিমানসহ আত্মঘাতী হামলা করা, যেন শত্রুপক্ষের সর্বোচ্চ ক্ষতিটা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি বিমানবাহিনীর একটি বিশেষ শাখাকে বলা হতো ‘কামিকাজে স্পেশাল অ্যাটাক ইউনিট’। ইরানের শহীদ-১৩৬ ড্রোনগুলো হলো আত্মঘাতী ড্রোন। লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করার জন্য এগুলো এগিয়ে। কিন্তু ড্রোন থেকে কোনো কিছু ছোড়া হয় না।
ড্রোনটিই গিয়ে সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে এবং ধ্বংস হয়ে যায়। এ কারণে এগুলো কামিকাজে বা আত্মঘাতী ড্রোন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের গতিপথ কি বদলাবে এ ড্রোনে?
ঝাঁকে ঝাঁকে হামলা করে বলে ইউক্রেনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও এগুলোকে সম্পূর্ণভাবে রুখে দিতে অক্ষম। ইউক্রেনীয় বিমানবাহিনীর এক মুখপাত্র বলেছেন, ঝাঁকে ঝাঁকে এসব ড্রোনের ব্যবহার ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষার জন্য শক্ত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
এ ড্রোনকে ভূপাতিত করতে পারে, এমন ব্যবস্থা ইউক্রেনকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে পশ্চিমারা। তবে সেসবের বেশির ভাগই এখনো ইউক্রেনে পৌঁছায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, ‘কামিকাজে’ প্রতিহত করার সরঞ্জাম পেতে কিয়েভকে আরও মাসখানেক অপেক্ষা করতে হবে।
