ইলিয়াস কাঞ্চন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান। প্রায় তিন দশক ধরে নিরাপদ সড়কের দাবিতে সোচ্চার রয়েছেন এই চলচ্চিত্র অভিনেতা ও চিত্রনায়ক। সড়ক দুর্ঘটনা, সড়ক পরিবহন আইন, পরিবহন মালিক-শ্রমিক-যাত্রী সম্পর্কসহ প্রাসঙ্গিক বিষয়ে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এহ্সান মাহমুদ
দেশ রূপান্তর : গত এক সপ্তাহে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজারের এক দুর্ঘটনায় পাঁচ সহোদরের মৃত্যু হয়েছে। আরও দুই ভাই এবং এক বোন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা নিকট অতীতে দেখা যায়নি। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি সড়ক দুর্ঘটনার কারণ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে সড়ক নিয়ন্ত্রণহীন। সড়কের নিয়ন্ত্রণ কেন হারিয়ে গেল বলে মনে করেন?
ইলিয়াস কাঞ্চন : প্রথম কথা হচ্ছে, সড়ক আসলে কখনো নিয়ন্ত্রণে ছিল কি? কখনো দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে যায়, কখনো কম থাকে। যখন পরিমাণ বেশি থাকে, তখন কয়েকদিন আলোচনা-সমালোচনা হয়। আবার তা হারিয়ে যায়। এবারও একই ঘটনা ঘটেছে। কেন নিয়ন্ত্রণ নেই যদি জানতে চান, তবে বলতে হবে হয়তো নিয়ন্ত্রণ করার কেউ নাই। যদি সত্যিকার অর্থেই কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে চাইত তবে এমন দুর্ঘটনা ঘটত না। তাহলে কমে আসত।
দেশ রূপান্তর : আমরা যদি গত বছরের (২০২১) সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান দেখি, নিহত হয়েছেন ৬ হাজার ২৮৪ জন। অন্যান্য মৃত্যুর তুলনায় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ভয়াবহতা অনেক বেশি। এই বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?
ইলিয়াস কাঞ্চন : কোনো দেশে যুদ্ধ হলেও এত মানুষ মারা যায় না, যত সংখ্যক মানুষ বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। কিন্তু যুদ্ধের পরিস্থিতিতে যেভাবে রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের নাগরিকের মধ্যে এক ধরনের প্রস্তুতি দেখা যায়, মানুষ মোকাবিলা করার কৌশল খুঁজে বের করে এখানে তাও নেই। কিন্তু, আমাদের এখানে সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধ করা নিয়ে তেমন কোনো পদক্ষেপই চোখে পড়ছে না। সব যেন গা সওয়া হয়ে গেছে। নইলে প্রতিদিন এখানে যে হারে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যাচ্ছে তাতে কারও কোনো বিকার দেখা যাচ্ছে না কেন!
দেশ রূপান্তর : আপনাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল সড়ক পরিবহন আইন করা। দেরিতে হলেও ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ করা হলো। কিন্তু এই আইন বাস্তবায়নে এক ধরনের উদাসীনতা দেখা যায়। আইনের কয়েকটি ধারায় আপত্তি তুলে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের রাস্তায় নেমে আসা, গাড়ি বন্ধ রাখার ঘটনাও ঘটেছে। শেষমেশ আইনটি হলো। কিন্তু, পালনে অনীহা দেখা যাচ্ছে কেন বলে মনে করেন? বাধা কোথায়?
ইলিয়াস কাঞ্চন : দেখেন, যাদের এই আইন বাস্তবায়নে মাঠে থাকার কথা, তদারকি করার কথা তারা যদি এটা না করেন, তবে করার কী আছে! একটু ভিন্নভাবে দেখেন, এর জন্য কি তাদের বেতনভাতা, পদোন্নতি আটকে আছে? কোনো কিছু কি থেমে আছে? কিছুই কমতি হচ্ছে না। সব স্বাভাবিক আছে। আপনিও নিশ্চয় দীর্ঘদিন ধরে শুনে আসছেন, বা দেখে আসছেন বিআরটিএ-তে দালাল রয়েছে। তারা সেখানে টাকার বিনিময়ে লাইসেন্স করে দেয়। সেখানকার দালালদের কি সরানো গেছে? যায়নি। আবার দেখেন, ফুটপাতে দোকান বসছে। হাঁটার জায়গা নেই শহরে। রাস্তা দখল করে অবৈধ দোকানপাট বসানো হয়েছে। এইসব ফুটপাত দখলমুক্ত করা, অবৈধ দোকানপাট তুলে দেওয়ার কাজ কার? মেয়রের নিশ্চয়। কিন্তু মেয়র এসব করছেন না। তাতে কি মেয়রের সুযোগ-সুবিধা কমে যাচ্ছে। কিছুই যেহেতু কমছে না, তারাও একই রকম রয়ে যাচ্ছেন। কে বাঁচল আর কে মরল তার দিকে কোনো খেয়াল নেই। কোনো গুরুত্ব নেই। যার যে কাজ সে তা করছে না। আবার ধরেন, কোনো কাজের জন্য পরিকল্পনা নেই। কোনো কৌশলও নেই। যেমন ধরা যাক, রিকশা তুলে দেওয়া হবে। একসঙ্গে শহরের সব রিকশা তুলে দিলে সবাই মিলে রাস্তা অবরোধ করবে, আন্দোলন করবে। এটা না করে যদি ধীরে ধীরে প্রতি মাসে অল্প পরিমাণে বন্ধ করা হয়, তবেই কিন্তু করা যায়। এমন আরও কিছু কৌশল নেওয়া যায়। আপনি যদি সত্যিকার অর্থেই কিছু করতে চান, তার জন্য আন্তরিকভাবে কাজ শুরু করতে হবে। আমরা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের কথা বলতে পারি। সদিচ্ছা থাকলে কাজ করা যায়, তিনি তা দেখিয়ে গিয়েছিলেন। যেমন ঢাকার তেজগাঁওয়ের ট্রাক স্ট্যান্ডের কথা বলতে পারি। তিনি অবৈধ ট্রাক স্ট্যান্ড উচ্ছেদ করে সুন্দর একটি রাস্তা বানিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন গেলেই দেখা যাবে, রাস্তা আছে ঠিকই কিন্তু তাতে ট্রাকে ভরতি হয়ে আছে। আবার মহাখালী বাস টার্মিনালের সামনের রাস্তায় যেভাবে বাস রাখা হয়েছে, তাতে স্বাভাবিক চলাচলই মুশকিল হয়ে পড়েছে। এসব সরানো যাচ্ছে না কেন? সরানো যাচ্ছে না, কারণ যাদের সরানোর কথা তাদের কোনো কিছু এসব না করলেও আটকে থাকছে না। অসুবিধা হচ্ছে না। আনিসুল হকের আরেকটি উদ্যোগ ছিল ঢাকায় যানজট কমাতে নগর পরিবহন সেবা চালু করা। তা এখনো বাস্তবায়িত হলো না। ঢাকায় দেখা যায়, ‘প্রাইভেট’ লেখা সিএনজি অটোরিকশা রয়েছে। এরা যাত্রী পরিবহন করছে। এগুলো দূর করা গেল না। কেন দূর করা যাচ্ছে না? যাদের এসব তদারকি করার কথা তারা এই শহরের দিকে তাকালেই তো সব দেখতে পাওয়ার কথা। তবুও অবৈধ অটোরিকশা চলছে, বাস চলছে, রিকশা চলছে।
দেশ রূপান্তর : সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে যারা কাজ করছেন তাদের অনেকেই মতামত দিয়েছেন, এই বিষয়টি রাজনৈতিক। আপনার ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন প্রায় তিন দশকের কাছাকাছি হতে চলল। আপনার অভিজ্ঞতা কী বলে? কীভাবে সড়ক দুর্ঘটনার হার কমিয়ে আনা যাবে?
ইলিয়াস কাঞ্চন : পুরো বিষয়টাই রাজনৈতিক। এটা রাজনৈতিকভাবে সমাধান করতে হবে। দেখা যাবে অল্প কয়েকজন চিহ্নিত মালিক ও নেতা আমি তাদের নাম নিতে চাই না, তারা এসব থেকে সুবিধা আদায় করে। আর রয়েছে পাশাপাশি কৌশলের অভাব। যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে কাজ করা গেলেই দুর্ঘটনার হার কমিয়ে আনা সম্ভব।
দেশ রূপান্তর : আপনাদের সংগঠনের যে কর্মসূচি, তার সঙ্গে পরিবহন মালিক-চালক-শ্রমিক এদের কোনোভাবে সংযুক্ত করা যায় কি-না? অর্থাৎ, সচেতনতার বিষয়টি কেবল যাত্রীদের না হয়ে চালকদের যুক্ত করলেও ভালো ফল পাওয়ার কথা।
ইলিয়াস কাঞ্চন : এটা খুবই একটা কার্যকর দিক। আমরা এটার সুফলও পেয়েছিলাম। আমরা তো সব কাজ করতে পারব না। সবকিছু করার মানসিকতাও আমাদের নেই। আমি কাজ শুরু করার সময়েই মনে করি, সব তো আর করতে পারব না, কিন্তু শুরুটা করতে হবে। পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে নিয়ে আমরা একটা কর্মসূচি করেছিলাম। ২০১০ এর দিকে আমরা একটা কাজ করতে চেষ্টা করেছিলাম। সেটি ছিল এখন যে ড্রাইভার ও তার সহকারীরা রয়েছে, তাদের তো আর চাইলেই বাবদ দেওয়া যাবে না। তাদের সংসার আছে। আয়ের একটি উৎস দরকার জীবন-যাপনের জন্য। সেই চিন্তা থেকেই আমরা চেয়েছিলাম তাদের ভুলত্রুটিগুলো ধরিয়ে দিয়ে যদি তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া যায় তবে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। ২০১০ সালে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজটা করা হয়েছিল। এর ফলটা আমরা পেয়েছিলাম ২০১৬ এর দিকে। সড়ক দুর্ঘটনার হার কমে এসেছিল। যদি ওই সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দেখবেন তাতে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা অনেকাংশে কম। এখন এমন ধরনের কর্মসূচি করতে হলে কিছু ফান্ডের দরকার। যে সব ড্রাইভারকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে তাদের ওই ক’দিনের (দুই বা তিন দিনের) আয়ের সমপরিমাণ একটা অর্থ দিতে হবে। আবার তাদের প্রশিক্ষণকালীন খাবার একটা খরচ আছে। হলরুম ভাড়া করতে হয়, প্রশিক্ষণের ব্যয় আছে। প্রতিদিন প্রায় দুইশো লোকের জন্য এসব করতে বেশ কিছু অর্থের দরকার হয়। আমাদের যে সংগঠন, তার মাধ্যমে এই ধরনের ব্যয়ভার পুরোপুরি বহন করা সম্ভব নয় আসলে। ওই সময়ে স্থানীয় সরকারের একজন ইঞ্জিনিয়ার আমাকে ফোন করে বললেন, জার্মানি থেকে একটি ফান্ড এসেছে। কিন্তু সেটি এখন ব্যবহার না করলে ফেরত যাবে। আমি কোনোভাবে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারব কি-না? তখন আমি বললাম যে, আমরা পারব। পরে আমরা সেই কাজটি শুরু করেছিলাম। ২০১৬ এ আমরা আশ্চর্যজনকভাবে ফলাফল পেলাম। কিন্তু সেটি করতে গিয়ে চিহ্নিত কয়েকজনের আমি শত্রুতে পরিণত হলাম। তারা দেখল পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে আমাদের একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। তখনই তারা আমার বিরুদ্ধে নানা কিছু করতে শুরু করল। এমনকি আমার ছবিতে জুতা দেওয়া হলো। এসব তো দেখতে হয়েছে। এরা যারা করেছে, তারা মূলত সুবিধাভোগী। এদের কিন্তু দেশের সবাই চেনে।
দেশ রূপান্তর : আপনার পরামর্শ কী থাকবে?
ইলিয়াস কাঞ্চন : আমি এই কথাটি এর আগেও বলেছি। আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনার যে দায়দায়িত্ব তা বিস্তৃত করতে হবে। অর্থাৎ, সরকারকে একা যাতে সড়ক দুর্ঘটনার মুখোমুখি দাঁড় করানো না হয়। যেমন স্কুলের বাচ্চা, কলেজের শিক্ষার্থী, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব কেন ট্রাফিক পুলিশ নেবে! প্রতিষ্ঠানগুলো কেন নেবে না? প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটি কেন নেবে না? আমাদের প্রধানমন্ত্রী কয়েকদিন আগে খুবই দরকারি একটি নির্দেশনা দিয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের রাস্তা ব্যবহারবিধি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে। এখন প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু আমার জানামতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এখনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেয়নি। মন্ত্রণালয়ের উচিত ছিল প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা, নির্দেশনা বাস্তবায়নে উদ্যোগী হওয়া। কিন্তু তা তো হচ্ছে না! আমাদের এখানে কোনো কাজ বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণ হচ্ছে উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী কেউ এগিয়ে আসেন না। একধরনের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে বা জবাবদিহি দেখা যায় না। নইলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা উপেক্ষিত হবে, এমনটা আশা করা যায় না।
দেশ রূপান্তর : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
ইলিয়াস কাঞ্চন : আপনাকেও ধন্যবাদ।
(দেশ রূপান্তরে পূর্বে প্রকাশিত)
