ঢাবি শিক্ষকের অদ্ভুত গবেষণা

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২২, ১০:৪৫ পিএম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২২ ও ২৩ অক্টোবর দুই দিনব্যাপী ‘গবেষণা ও প্রকাশনা মেলা’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে এ মেলার আয়োজন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও গবেষণাকেন্দ্র তাদের গবেষণা ও প্রকাশনা তুলে ধরেছে এই মেলায়। অন্যান্য গবেষণার মতই বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়স বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আবুল হুসাইনের একটি গবেষণা মেলার বিভাগটির স্টলে প্রদর্শিত হয়।

সেখানে দেখা যায়, রসায়নের ওই শিক্ষক মানবদেহ নিয়ে একটি গবেষণা পরিচালনা করেছেন। তিনি গবেষণায় দেখিয়েছেন মানুষের দেহের বিভিন্ন অঙ্গের সাথে আরবি হরফে লেখার মিল রয়েছে। মানুষের অঙ্গের সাথে তিনি আরবিতে আল্লাহ লেখার সাদৃশ্যও দেখিয়েছেন। মেলায় প্রদর্শিত এই গবেষণার পোস্টারটি ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়। শিক্ষার্থীরা বলছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের কাছ থেকে এই মানের গবেষণা তারা প্রত্যাশা করে না।

প্রদর্শিত ওই পোস্টারটিতে দেখা যায়, আল্লাহ ও ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মাদ (স.) এর নামের সাথে তিনি গবেষণা করে মানব দেহের সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছেন। তার দাবি অনুযায়ী মানুষের হাতের পাঁচ আঙ্গুলের সাথে আরবি হরফে আল্লাহ নাম লেখা আছে। এছাড়াও মানুষের পুরো শরীরের কঙ্কালের মধ্যে আরবিতে মুহাম্মদ লেখা রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মেলায় শুরুর আগেই বিভাগের একাডেমিক মিটিং এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় কোন কোন পোস্টার মেলায় প্রদর্শন করা হবে। অন্য গবেষণা পোস্টারগুলোর মতই এই পোস্টারটিও প্রদর্শন করার জন্য অনুমতি দেয় রসায়ন বিভাগ।

শনিবার (২২ অক্টোবর) মেলা শুরুর প্রথম দিন বিভাগের স্টলে  ড. আবুল হুসাইনের গবেষণার পোস্টারটি প্রদর্শন করা হয়। পরে এ নিয়ে বিতর্ক শুরু হলে শনিবার রাতেই মেলা থেকে পোস্টারটি সরিয়ে নেওয়া হয়।

এ বিষয়ে কথা বলতে বিভাগের চেয়ারম্যান সাহিদা বেগমের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস ছামাদ জানিয়েছেন, বিষয়টি ভুলবশত হয়েছে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ওই পোস্টারটি গতকালকেই মেলা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আমরা ওই শিক্ষককে সতর্ক করব যাতে ভবিষ্যতে তিনি এই ধরণের কাজ আর না করেন।

বিজ্ঞান অনুষদের একটি বিভাগের স্টলে এমন একটি পোস্টার লাগানো যৌক্তিক হয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা ঠিক হয়নি বলেই তো সাথে সাথে সেটা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞান মেলায় এ ধরণের অবৈজ্ঞানিক পোস্টার লাগানো তো কোনোভাবেই কাম্য নয়।

সমালোচিত গবেষণার বিষয়ে জানতে অধ্যাপক ড. আবুল হুসাইনকে একাধিকবার কল দেওয়া হলে তিনি প্রতিবার ফোন কেটে দেন। পরে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে এসএমএস পাঠিয়ে পুনরায় কল দেওয়া হলে তার নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।

বিজ্ঞান অনুষদের একজন শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সময় নামকরা সব গবেষক ছিলেন। সত্যেন্দ্রনাথ বসুর মত বিজ্ঞানী আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। আর এখন কারা আমাদের পড়াচ্ছে? আমরা তাদের কাছ থেকে কী শিখছি?

তিনি আরও বলেন, আমাদের একজন শিক্ষক দেখলাম মানবদেহের সাথে আল্লাহ ও নবীর নামের মিল পেয়েছেন। এটা কী কোনো বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা হল। এগুলো তো গুলিস্তানের হকাররা করে। আমাদের শিক্ষকদের মান কী সেই পর্যায়ে চলে গিয়েছে? আমরা আমাদের শিক্ষকদের কাছ থেকে এমন বস্তাপঁচা গবেষণা চাই না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিষয়টি আমি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখেছি। পরে শুনেছি ওটা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে ওই গবেষণাটি তো রসায়ন সংক্রান্ত নয়। এটা এখানে মেলায় প্রদর্শন করা ঠিক হয়নি।

প্রথমবারের মতো আয়োজিত গবেষণা ও প্রকাশনা মেলায় প্রায় শতাধিক স্টল বসানো হয়েছিল। এসব স্টলে ঢাবির শতবর্ষ উপলক্ষে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রকাশনা ও উদ্ভাবনসহ ৫৫টি গ্রন্থ, ২৬টি বিশেষ জার্নাল, ২১৬টি গবেষণা প্রজেক্ট, ৬২৪টি পোস্টার এবং ৮৬টি ফ্লাইয়ার/ব্রুশিয়ার স্থান পেয়েছিল।

রবিবার (২৩ অক্টোবর) কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে সমাপনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মেলা শেষ হয়েছে। উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান মেলার সমাপনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন।

উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান গবেষণা-প্রকাশনা মেলা সফলভাবে আয়োজনের ক্ষেত্রে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সংস্কৃতি তৈরি এবং নতুন শতকে বিশ্ববিদ্যালয়কে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই মেলা কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

উপাচার্য বলেন, প্রতি বছর নিয়মিতভাবে এই মেলা আয়োজনের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে বলেও তিনি জানান।

সমাপনী অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত কবিতা, রচনা ও ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতা এবং প্রত্যেক জার্নালের বিশেষ সংখ্যার শ্রেষ্ঠ আর্টিক্যাল লেখককে সনদ, ক্রেস্ট ও প্রাইজমানি প্রদান করা হয়। এছাড়া, প্রত্যেক অনুষদ, ইনস্টিটিউট এবং সেন্টারের পোস্টার সমূহ থেকে নির্বাচিত প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পোস্টার উপস্থাপনকারীকেও পুরস্কার দেওয়া হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত