শেরপুরে যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২২, ০২:১৯ পিএম

শেরপুর জেলা সদর উপজেলার যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. হামিদুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তিনি চাকরিতে যোগদান করেন ১৯৯৯ সালে। তার বাড়ি ঝিনাইগাতি উপজেলার ধানশাইল গ্রামে।

এক কর্মস্থলে তেরো বছর, প্রশিক্ষণের টাকা আত্মসাৎ, ভুয়া বিল ভাউচার বানিয়ে সরকারি টাকা আত্মসাৎ, যুবকদের প্রশিক্ষণের টাকা আত্মসাৎ, বিতর্কিত সনদ দিয়ে চাকরিতে যোগদানসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে এই উপজেলা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

সম্প্রতি সাংবাদিকদের হাতে আসা বিভিন্ন বিল ভাউচার, অফিসের হাজিরা খাতা এবং বিভিন্ন প্রকার তথ্য উপাত্ত অনুসন্ধান করে জানা যায়, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা একই কর্মস্থলে ৩ বছরের বেশি থাকতে পারেন না। কিন্তু শেরপুর সদর উপজেলার যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. হামিদুর রহমান টানা ১৩ বছর ধরে শেরপুর সদর যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে অদৃশ্য শক্তির বলে খুঁটি গেড়ে বসে আছেন। ফলে তার সেই খুঁটির জোরে একের পর এক করে যাচ্ছেন নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি। তার বাবা শহীদ হন একাত্তরে, কিন্তু তার জন্ম দেখানো হয়েছে ১৯৭৩ সালের ১৪ জানুয়ারি। বাবার মুক্তিযোদ্ধা সনদ এবং তার জন্ম তারিখ বিস্তর ফারাক থাকলেও মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরিতে যোগদান করেন এই যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা।

এ নিয়ে তৎকালীন উপপরিচালক (উপসচিব) সেলিনা শাহাদত তার বাবার মুক্তিযোদ্ধা সনদ এবং তার জন্ম তারিখ নিয়ে গরমিল দেখতে পেয়ে তার বিরুদ্ধে মহা-পরিচালক বরাবর বিভাগীয় তদন্তের জন্য অভিযোগ করেছিলেন।

সেই অভিযোগ ও তদন্ত আজও আলোর মুখ দেখেনি বলে অফিস সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়।

জানা গেছে, হামিদুর রহমান জামালপুর জেলা সদরে আসেন ২০০৬ সালে এবং পরবর্তীতে ২০১০ সালে শেরপুর সদরে বদলি হয়ে আসেন। এরপর থেকেই তিনি শেরপুর সদরেই অদ্যাবধি কর্মরত আছেন।

ইতিমধ্যে শেরপুর সদরের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্বে জেলার ঝিনাইগাতি উপজেলায় দুই দফায় ২০১৩ সাল থেকে ২০১৫ সাল এবং সর্বশেষ ২০২১ সালের ৩ মার্চ থেকে ২০২২ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দায়িত্বে থাকেন।

ঝিনাইগাতিতে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা অবস্থায় প্রতি মাসে ৪ দিন শেরপুর থেকে ঝিনাইগাতিতে নিজের মোটরসাইকেলে অফিস করেন।

শেরপুর থেকে ঝিনাইগাতির দূরত্ব ২০ কিলোমিটার। চার দিনে তেল খরচ হওয়ার কথা সর্বোচ্চ চার লিটার কিন্তু তিনি তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের জন্য প্রতি মাসে ৩৬ লিটার তেলের বিল ভাউচার তৈরি করে সরকারি টাকা আত্মসাৎ করেন।

এছাড়াও তিনি বিভিন্ন সময় ভুয়া বিল ভাউচারসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছেন সরকারের লক্ষ লক্ষ টাকা।

ঝিনাইগাতি যুব উন্নয়ন অফিসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঝিনাইগাতিতে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকার সময় তিনি (হামিদুর রহমান) তড়িঘড়ি করে সরকার থেকে দেওয়া অফিস খরচ বরাদ্দের ৫৫ হাজার টাকার একটি বিল ২৮ আগস্ট উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসে দাখিল করেন। এরপর তিনি ওই বিল ৩০ আগস্ট উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেন।

এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন সময়ে যুব প্রশিক্ষণের কোন ব্যানার তৈরি না করে এবং প্রশিক্ষণের বিভিন্ন খরচ না করেই ভুয়া বিল ভাউচার করে অর্থ আত্মসাৎ করারও প্রমাণ পাওয়া গেছে।

ঝিনাইগাতি অফিস থেকে প্রশিক্ষিত যুব নুরজাহান আক্তার মিতা জানান, পূর্বের কর্মকর্তা হামিদুর রহমানের সময়কালে একটি প্রশিক্ষণে তাকে ট্রেইনার হিসেবে নিয়ে এসে ১ হাজার ৫শত টাকা দেন। অথচ ওই প্রশিক্ষণে বরাদ্দ ছিল ৫ হাজার টাকা ভ্যাট কেটে ৪ হাজার ৫শত টাকা। অপর একটি প্রশিক্ষণের বিষয়ে ওই যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যুব প্রশিক্ষক আবু রায়হানকেও কম টাকা দিয়ে বেশি বিল ভাউচার করে টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে  ২০১৮ সালে জেলার শ্রীবর্দী উপজেলায় অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তৎকালের ন্যাশনাল সার্ভিসের ভাতার লাখ লে টাকা আত্মসাৎ করারও অভিযোগ রয়েছে।

সেসময় এই টাকা আত্মসাতের বিষয় নিয়ে অফিসে গোলযোগ হলে তৎকালীন উপপরিচালক একটি তদন্ত কমিটি করলেও সেই তদন্ত আর আলোর মুখ দেখেনি।

অভিযোগের বিষয়ে হামিদুর রহমানের সঙ্গে কয়েক দফা যোগাযোগ করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

শেরপুর জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. নুরুজ্জামান চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য না দিয়ে উল্টো তার অফিসে গিয়ে চা খেতে বলেন।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আজহারুল ইসলাম খান বলেন, অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত