মঞ্চ থেকে হু জিনতাওকে জোর করে সরিয়ে নেওয়া কীসের ইঙ্গিত?

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২২, ০৩:১৮ পিএম

চীনের সাবেক প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও-কে গত শনিবার একপ্রকার ধরেবেঁধেই দলীয় সম্মেলনের মঞ্চ থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির ২০তম কংগ্রেসের সমাপনী পর্ব চলছিল শনিবার। এই ঘটনার ছবি বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়তেই জল্পনা শুরু হয়ে যায়। চীনের এক সরকারি সংবাদমাধ্যম রবিবার জানিয়েছে, হু জিনতাও মঞ্চে অসুস্থ বোধ করায় তাকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে অন্য কোনও কারণ খোঁজা উচিত নয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট এখন সুস্থই রয়েছেন।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের পাশ থেকে হু-কে তুলে নিয়ে যাওয়া নিয়ে শনিবার থেকেই বিশ্বব্যাপী চর্চা শুরু হলেও কমিউনিস্ট পার্টি মুখে কুলুপ এঁটেছিল। রবিবার চীনের সরকারি সংবাদ সংস্থা শিনহুয়ানেটের সাংবাদিক লিউ জিয়াওয়েন জানান, কিছু দিন আগে অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন ৭৯ বছরের জিনতাও। সম্প্রতি তিনি সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য জিদও ধরেছিলেন। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ‘সম্মেলন মঞ্চে হু জিনতাও আচমকা অসুস্থ বোধ করছিলেন। তখন তাকে কর্মীরা মঞ্চ থেকে নামিয়ে নিয়ে যান। অধিবেশন কক্ষের পাশের ঘরে তিনি বিশ্রাম নেন। এখন তিনি অনেক ভাল রয়েছেন’।

চীনের কমিউনিস্ট পার্টি কংগ্রেসের সম্মেলনে অদ্ভুত এই ঘটনার ভিডিও পুরো বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছে। পশ্চিমা প্রায় সব সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। ভিডিওটিতে দেখা যায়, পার্টি কংগ্রেস চলাকালীন ৭৯ বছর বয়সী চীনের সাবেক প্রেসিডেন্ট হু জিনতাওকে একরকম জোর করে সম্মেলন কক্ষ থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি দিয়েছে পুরো ভিডিও চিত্রে বিবরণ।

এতে দেখা গেছে, হু জিনতাও ৬৯ বছর বয়সী চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঠিক পাশেই বসে ছিলেন। এ সময় তাকে সেখান থেকে তুলে হাত ধরে এক ব্যক্তি জোর করে দাঁড় করান। এ সময় হু জিনতাওয়ের শারীরিক ভাষা দেখে বোঝা যাচ্ছে যে তিনি কোনোভাবেই উঠতে চাননি। একপ্রকার জোর করেই তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

এ সময় তাকে বারবার বাইরের দিকে পথ দেখানো হয়। তিনি পাশে বসা শি জিনপিংকে কিছু একটা বলেন। এ সময় জিনপিং তার প্রত্যুত্তরে মাথা নাড়ান। এ ছাড়া হু জিনতাও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংয়ের ঘাড়েও হাত দেন। এ সময় লে কেকিয়াংকেও বিমর্ষ দেখা যায় ভিডিওতে। এভাবেই দুই ব্যক্তির সহায়তায় হু জিনতাওকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়।

২০০৩ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত হু জিনতাও চীনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। বিবিসি জানিয়েছে, শনিবার কমিউনিস্ট পার্টি কংগ্রেস সম্মেলনের প্রথম অধিবেশনে ২০৫ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি থেকে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংসহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে বাদ দেয়া হয়েছে।
 
বিবিসি জানায়, এই কমিটির প্রায় সব সদস্য চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনিপিংয়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। পরে চীনের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে শি জিনপিংয়ের প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে ২০৫ সদস্যবিশিষ্ট কমিউনিস্ট পার্টির এই কেন্দ্রীয় কমিটি।

এ ছাড়া রোববার (২৩ অক্টোবর) কমিউনিস্ট পার্টি কংগ্রেস শি জিনপিংকে তৃতীয়বারের মতো সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত করে। এর ফলে শি জিনপিং তৃতীয়বারের মতো চীনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। একই সঙ্গে তিনি সামরিক বাহিনীর প্রধান হিসেবে থাকছেন। এর আগে ২০১৮ সালে এক রুল জারি করে সর্বোচ্চ পদে শুধু দুবার ক্ষমতায় থাকার বিষয়টি রোধ করেন শি জিনপিং।

চীনের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি)-র সম্মেলনে চিত্রনাট্য নিখুঁত ভাবে মেনে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম নিশ্চিত করলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। আগামী পাঁচ বছরের জন্য তৃতীয় বার সিপিসির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলেন তিনি। মাও জে দঙের পরে তিনিই প্রথম সিপিসি নেতা যিনি টানা তিন বার দল ও সরকারের শীর্ষ পদে আসীন হতে চলেছেন। আগামী মার্চে সরকারের বার্ষিক অধিবেশনে জিনপিংকে তৃতীয় বারের জন্য দেশের প্রেসিডেন্ট হিসাবে ঘোষণা করা হবে।

এবার পলিটবুরোতে কোনও নারী সদস্য নেই। বিদায়ী পলিটবুরোতে ছিলেন প্রবীণ নেত্রী সুন চুনলাং। কিন্তু তাকে এ বার পলিটবুরো থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আট সদস্যের স্ট্যান্ডিং কমিটির সকলেই জিনপিংয়ের অনুগামী।

পার্টি ও দলের নিয়ন্ত্রণে থাকা সেনার উপরে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিশ্চিত করা পরে জিনপিং বলেছেন, ‘বিশ্ব এখন চীনকে চাইছে। বিশ্বের উন্নতি না হলে যেমন চীনের উন্নতি হবে না, তেমনই বিশ্বের উন্নতির জন্য চীনকে প্রয়োজন’। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘৪০ বছরের চেষ্টার ফলে চীন দুটো অসম্ভব কাজ করতে পেরেছে। এক, দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা’। কমিউনিস্ট পার্টির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, চীনের প্রেক্ষিতে সমাজতন্ত্র নিয়ে জিনপিংয়ের চিন্তাধারা নতুন যুগের সূচনা করবে।

তাই অনেকে বলছেন, হু জিনতাওয়ের সঙ্গে এই আচরণের সম্ভাব্য আরেকটি কারণ হতে পারে শি জিনপিংয়ের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির পূর্ণ প্রদর্শন। সেটা বোঝাতেই চীনের সাবেক প্রেসিডেন্টকে প্রতীকী অর্থে সরিয়ে দেওয়া হলো। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেসে কখন কী হবে, তা আগে থেকেই নির্ধারণ করা থাকে। ফলে হু জিনতাওয়ের সঙ্গে যে সময় ঘটনাটি ঘটেছে, তা আকস্মিক নয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিন এই ঘটনার আগে কংগ্রেসের একটি রুদ্ধদ্বার অধিবেশন হয়।

সেখানে হু জিনতাও উপস্থিত ছিলেন। এরপর কংগ্রেসের চূড়ান্ত পর্ব ক্যামেরায় ধারণ করা হয়। ক্যামেরাগুলো চালু করার পরপরই হু জিনতাওকে সম্মেলনকক্ষ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি সাধারণত তাদের খারাপ বিষয়গুলো প্রকাশ্যে আনে না। যদি হু জিনতাওকে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়, তাহলে এতে বোঝা যায় যে দলটি তাদের প্রচলিত রীতিনীতি থেকে সরে আসছে।

হু জিনতাও ২০০৩ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত চীনের প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় পলিটব্যুরোর স্ট্যান্ডিং কমিটিতে বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিত্ব ছিল। বহির্বিশ্বের কাছেও চীন তখন অনেকটা উন্মুক্ত ছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, ২০০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিকের কথা। সে সময় অনেক বিদেশি প্রতিষ্ঠান চীনে ব্যবসা শুরু করেছিল। আনাগোনা বেড়েছিল পর্যটকদের। ইন্টারনেট ব্যবহারেও বিধিনিষেধ কম ছিল। আর স্বাধীন সাংবাদিকতার সুযোগও কিছুটা দেওয়া হয়েছিল। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীনের সুনাম দিন দিন বাড়ছিল।

তবে সি চিন পিংয়ের শাসনামলে ভিন্ন রূপ নিয়েছে চীন। বর্তমান সরকারে চীনে জাতীয়তাবাদী ভাবাবেগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে ভিন্নমত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সি চিন পিং দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নামে বিরোধী মতের সবাইকে রাজনীতির ময়দান থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। এখন চলতি বছরের কংগ্রেসের মাধ্যমে তার পথে বাকি যেসব কাঁটা আছে, তাদের দূর করেছেন।

চলতি বছরের কংগ্রেস থেকে হু জিনতাও হয়তো বিষয়টি কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছেন। ২০৫ সদস্যের নতুন কমিটিতে লি কেছিয়াং ও ওয়াং ইয়াংকে রাখা হয়নি। দুজনই হু জিনতাও প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তার পরিকল্পনাগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।

আরও পড়ুন...

ফের ৫ বছরের জন্য ক্ষমতায় শি জিনপিং, চীনে নতুন ইতিহাস

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত