সুরা ফাতেহার সৌরভময় তাৎপর্য

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২২, ১১:৫৮ পিএম

আল্লাহতায়ালা অহংকার, সম্মান ও মহত্ত্বকে স্বীয় প্রভুত্বের ভূষণ বানিয়েছেন। আর অনুগ্রহ, ইহসান, দয়া, দান, ক্ষমা ও মার্জনাকে করেছেন স্বীয় রহমতের প্রবৃদ্ধিস্বরূপ এবং তার পরাক্রমশীলতা, শক্তিমত্তা, প্রতাপ, প্রতিশোধ, ইনসাফ ও হুকুমকে স্বীয় রাজত্ব ও শেষ বিচারের প্রতীক নির্ধারণ করেছেন। তার সুন্দর নামসমূহ ও পূর্ণ গুণাবলিকে স্বীয় প্রভুত্ব, রহমত, রাজত্ব ও শেষ বিচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন। আর এগুলো দিয়েই তার মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের সূচনা করেছেন, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসমান থেকে জমিনে নাজিল করা সর্বোত্তম বাণী। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সৃষ্টিকুলের রব। দয়াময়, পরম দয়ালু। বিচার দিনের মালিক।’ সুরা আল ফাতেহা : ২-৪

এর সঙ্গেই জড়িত সৃষ্টির শুরু ও শেষ এবং তাদের সূচনা ও সমাপ্তি মহাবিচারের দিনে। যেদিন মানুষ বিশ্ব পালনকর্তার সামনে দণ্ডায়মান হবে। সুতরাং ‘ইলাহ’ যিনি সত্য উপাস্য, ‘রব’ যিনি সৃষ্টির অস্তিত্ব দানকারী, ‘আর রহমান আর রাহিম’ যিনি ইহকাল ও পরকালে তাদের ওপর অনুগ্রহকারী এবং ‘বিচার দিবসের মালিক’ যিনি যথাযথভাবে সৃষ্টিকুলের হিসাব গ্রহণ ও প্রতিদান দানকারী। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর কেয়ামতের দিনে আমি ন্যায়বিচারের পাল্লাসমূহ স্থাপন করব, সুতরাং কারও প্রতি কোনো জুলুম করা হবে না এবং (ভালো-মন্দ) কাজ যদি শস্যদানা পরিমাণ ওজনেরও হয়; তবুও তা আমি উপস্থিত করব আর হিসাব গ্রহণকারীরূপে আমিই যথেষ্ট।’ সুরা আল আম্বিয়া : ৪৭

ইলাহিয়্যাতের চূড়ান্ত লক্ষ্য যার কারণে সৃষ্টিকুলকে সৃষ্টি করা হয়েছে, রাসুলদের প্রেরণ করেছেন এবং কিতাবসমূহ অবতীর্ণ করা হয়েছে। তা হচ্ছে একমাত্র আল্লাহর জন্যই ইবাদত করা, যার কোনো শরিক নেই। যেহেতু সৃষ্টির মধ্যে তার মতো কেউ নেই, তার কোনো সহযোগী নেই এবং রাজত্বে তার কোনো অংশীদার নেই; সেহেতু তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করা যাবে না এবং অন্য উপাস্যের প্রতি ভালোবাসা, ভয় ও আশা-আকাক্সক্ষা প্রকাশ করা যাবে না। মহান আল্লাহর রুবুবিয়্যাত বলতে সৃষ্টিগত, প্রস্তুত ও মদদ প্রদানের দিক থেকে সৃষ্টিকুলকে সৃষ্টি করা, রিজিক দেওয়া, পরিচালনা ও লালন-পালন করাকে বোঝায়। জগতের সবকিছুই তার অস্তিত্ব ও বদান্যতার আলামত বহন করে; ফলে বিশ্বজগৎই আল্লাহর একত্ববাদের মুখপাত্র। কাজেই ‘সৃষ্টিকুলের রব’, সব সৃষ্টি তারই; আসমানসমূহ ও জমিন এবং এ দুয়ের মধ্যে আমাদের জানা-অজানা যা কিছু আছে।

প্রত্যেক বস্তুই আল্লাহর তাসবিহ ও সিজদারত, যার সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহই জানেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সাত আসমান ও জমিন এবং এগুলোর অন্তর্বর্তী সবকিছু তারই পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এবং এমন কিছু নেই যা তার সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে না; কিন্তু তাদের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা তোমরা বুঝতে পারো না; নিশ্চয় তিনি সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ।’ সুরা বনি ইসরাইল : ৪৪

চিন্তা দ্বারা আল্লাহর পরিচিতি লাভের মাধ্যমে অন্তর রঙিন হয়, জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহর ভালোবাসায় অন্তর আলোকিত হয় আর জিকির, চিন্তা ও মনোনিবেশের সমন্বয় বান্দাকে আল্লাহর একত্ববাদ, ক্ষমতা ও মহত্ত্বের হাকিকতের দিকে নিয়ে যায়। যে ব্যক্তি আল্লাহর মহত্ত্বের ব্যাপারে গবেষণা করে সে তার অবাধ্য হয় না, যে তার মালিকের স্মরণ করে তিনি তাকে হেদায়েত দেন এবং যে তার মাওলার কাছে আশ্রয় চায় তিনি তাকে আশ্রয় দেন। আর মহাক্ষমতাধর আল্লাহ সম্পর্কে গবেষণা, শিক্ষাগ্রহণ, জিকির, উপদেশ গ্রহণ ও বিনয়তার মাধ্যমে মহাপিরক্রমশালী দয়ালু আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠিত হয়।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টি সম্বন্ধে চিন্তা করে, আর বলে ‘হে আমাদের রব! আপনি এগুলো অনর্থক সৃষ্টি করেননি, আপনি অত্যন্ত পবিত্র, অতএব আপনি আমাদের আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। হে আমাদের রব! আপনি কাউকে আগুনে নিক্ষেপ করলে তাকে তো আপনি নিশ্চয়ই লাঞ্ছিত করলেন এবং জালেমদের কোনো সাহায্যকারী নেই। হে আমাদের রব! আমরা এক আহ্বায়ককে ইমানের দিকে আহ্বান করতে শুনেছি, ‘তোমরা তোমাদের রবের ওপর ইমান আনো। কাজেই আমরা ইমান এনেছি। হে আমাদের রব! আপনি আমাদের পাপরাশি ক্ষমা করুন, আমাদের মন্দ কাজগুলো দূরীভূত করুন এবং আমাদের সৎকর্মপরায়ণদের সহগামী করে মৃত্যু দিন। হে আমাদের রব! আপনার রাসুলদের মাধ্যমে আমাদের যা দিতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা দান করুন এবং কেয়ামতের দিন আমাদের হেয় করবেন না। নিশ্চয় আপনি প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম করেন না। তারপর তাদের রব তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে বললেন, নিশ্চয় আমি তোমাদের মধ্যে আমলকারী কোনো নর বা নারীর আমল বিফল করি না; তোমরা একে অপরের অংশ। কাজেই যারা হিজরত করেছে, নিজ ঘর থেকে উৎখাত হয়েছে, আমার পথে নির্যাতিত হয়েছে এবং যুদ্ধ করেছে ও নিহত হয়েছে আমি তাদের পাপকাজগুলো অবশ্যই দূর করব এবং অবশ্যই তাদের প্রবেশ করাব জান্নাতে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। এটা আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার; আর উত্তম পুরস্কার আল্লাহরই কাছে রয়েছে।’ সুরা আলে ইমরান : ১৯১-১৯৫

আমাদের রব পরম দয়ালু, তার রহমত অফুরন্ত ও পরিপূর্ণ। আল্লাহর রহমতের বাহ্যরূপ তার সম্মানে, শ্রদ্ধায়, ইবাদতে এবং আনুগত্যে দ্বীপ্তিময়, তিনিই পরম করুণাময়, যিনি রহমত দ্বারা সৃষ্টিকুলকে বেষ্টন করে আছেন; অনিষ্ঠতা প্রতিরোধ, অপরাধ গোপন রাখা ও শাস্তি মওকুফ করার মাধ্যমে। তিনি বলেন, ‘তিনিই আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই, তিনি গায়েব ও উপস্থিত বিষয়াদির জ্ঞানী; তিনি দয়াময়, পরম দয়ালু।’ সুরা আল হাশর : ২২

তিনিই মালিক, রাজত্বের অধিকারী মহান সত্তা; সৃষ্টির পূর্বাপর সবার একত্র হওয়ার মহান দিবসে তার পূর্ণ রাজত্ব ও আদেশ-নিষেধ প্রকাশ পাবে। আল্লাহ ছাড়া সেদিন কারও নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর সেদিন মেঘমালা দ্বারা আকাশ বিদীর্ণ হবে এবং ফেরেশতাদের দলে দলে অবতরণ করানো হবে। সেদিন চূড়ান্ত কর্র্তৃত্ব হবে দয়াময়ের এবং কাফেরদের জন্য সে দিনটি হবে অত্যন্ত কঠিন।’ সুরা আল ফুরকান : ২৫-২৬

দিনটি হবে কর্র্তৃত্ব স্থাপন, জবাবদিহি প্রদান, প্রতিদান লাভ এবং রবের কাছে বান্দাদের আত্মসমর্পণের দিন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যখন প্রবল কম্পনে জমিন প্রকম্পিত করা হবে, আর জমিন তার ভার বের করে দেবে, আর মানুষ বলবে, এর কী হলো? সেদিন জমিন তার বৃত্তান্ত বর্ণনা করবে, কারণ আপনার রব তাকে নির্দেশ দিয়েছেন, সেদিন মানুষ ভিন্ন ভিন্ন দলে বের হবে, যাতে তাদের তাদের কৃতকর্ম দেখানো যায়, সুতরাং কেউ অণু পরিমাণ ভালো কাজ করলে, সে তা দেখতে পাবে। আর কেউ অণু পরিমাণ অসৎকাজ করলে সে তাও দেখবে।’ সুরা জিলজাল

কিয়ামতের এই দিনটিতে আল্লাহতায়ালা পৃথিবীকে ডান হাতের মুষ্টিতে নিয়ে বলবেন, ‘আমিই বাদশাহ, কোথায় দুনিয়ার বাদশাহরা? তিনি বলেন, তিনিই আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনিই অধিপতি, মহাপবিত্র, শান্তি ত্রুটিমুক্ত, নিরাপত্তা বিধায়ক, রক্ষক পরাক্রমশালী, প্রবল, অতীব মহিমান্বিত। তারা যা শরিক স্থির করে আল্লাহ তা থেকে পবিত্র, মহান। তিনিই আল্লাহ সৃজনকর্তা, উদ্ভাবনকর্তা, রূপদাতা, তারই সব উত্তম নাম। আসমানসমূহ ও জমিনে যা কিছু আছে, সবকিছুই তার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ সুরা হাশর: ২৩-২৪

২১ অক্টোবর শুক্রবার মসজিদে নববিতে জুমার খুতবা।

অনুবাদ মুহাম্মদ আতিকুর রহমান

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত