দেশ থেকে পালিয়েও বাঁচতে পারলেন না ইমরান খানের সমর্থক হিসেবে পরিচিত পাকিস্তানের এক স্বনামধন্য সাংবাদিক। আরশাদ শরিফ নামে ওই সাংবাদিক দুই মাস আগে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আফ্রিকার দেশ কেনিয়ায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন তিনি। ইমরান খানের অভিযোগ তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আরশাদ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কড়া সমালোক ছিলেন।
আরশাদ শরিফের স্ত্রী জাভেরিয়া সিদ্দিক স্বামীর মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। গত রোববার (২৩ অক্টোবর) রাতে এক টুইটার বার্তায় তিনি বলেন, ‘আমি আজ আমার বন্ধু, স্বামী ও খুবই প্রিয় একজন সাংবাদিককে হারালাম। পুলিশের তথ্য মতে, তাকে কেনিয়ায় গুলি করা হয়েছে’।
কেনিয়ার গণমাধ্যম স্থানীয় পুলিশের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, গুলির ঘটনা ‘ভুলবশত’ ঘটেছে। তবে কেনিয়ার পুলিশ ও গণমাধ্যমের এ তথ্য নিয়ে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের সন্দেহ তৈরি হয়েছে। দেশটির সাংবাদিক মহল ও মানবাধিকার সংস্থা কেনিয়া সরকারের কাছে এ ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত দাবি করে তা প্রকাশ করার দাবি জানিয়েছে।
আরশাদ শরিফ পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর কড়া সমালোচক এবং ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বড় সমর্থক ছিলেন। ইরমান খান ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা তাকে (শরিফ) হয়রানি করে আসছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।
ইমরান খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী শাহবাজ গিলের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও তার প্রকাশ করায় রাষ্ট্রদ্রোহের মামলাসহ তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি হয়রানিমূলক মামলা দেয়া হয়। ওই সাক্ষাৎকারে সেনাবাহিনী নিয়ে শাহবাজ আপত্তিকর মন্তব্য করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে হয়রানি ও মৃত্যুর হুমকির মুখে গত আগস্ট মাসে দেশ ছাড়েন ৪৯ বছর বয়সী এই সাংবাদিক। প্রথমে যুক্তরাজ্য, সেখান থেকে দুবাইয়ে, এরপর কেনিয়া যান তিনি।
দেশ ছাড়ার আগ পর্যন্ত পাকিস্তানি টিভি চ্যানেল এআরওয়াই নিউজে কাজ করতেন আরশাদ। ‘মিথ্যা, বিদ্বেষপূর্ণ ও রাষ্ট্রদ্রোহী’ সংবাদ সম্প্রচারের অভিযোগে গত আগস্ট মাসে এআরওয়াই টিভির সম্প্রচারও সাময়িক বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল।
কিন্তু বিদেশে পালিয়েও বাঁচতে পারলেন না আরশাদ। দুই মাসের মাথায় অস্বাভাবিক মৃত্যুর শিকার হলেন তিনি। আরশাদের এ মৃত্যুর ঘটনা বিশ্বাস করতে পারছেন না তার সাবেক সহকর্মী কাশিফ আব্বাসী। এ ঘটনাকে তিনি ‘হৃদয়বিদারক’ বলে অভিহিত করেছেন।
এআরওয়াই নিউজের উপস্থাপক কাশিফ আব্বাসী টুইট করে লিখেছেন, ‘আমার ভাই, আমার বন্ধু, আমার সহকর্মী আরশাদ শরিফকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে … আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না। এটা হৃদয়বিদারক। এটা বেদনাদায়ক…আমি তোমাকে ভালোবাসি ভাই’।
এআরওয়াই ডিজিটাল নেটওয়ার্ক প্রেসিডেন্ট ও সিইও সালমান ইকবাল বলেন, ‘আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না। আমি বাক্রুদ্ধ, আল্লাহ তাকে জান্নাত দান করুন’। আরেক বিশিষ্ট সাংবাদিক হামিদ মীর টুইট করে লিখেছেন, অবিশ্বাস্য। মহান আল্লাহ তার আত্মাকে শান্তি দান করুন।
এ ঘটনায় পাকিস্তানের মানবাধিকার কমিশন বলেছে, সাংবাদিকদের স্তব্ধ করার জন্য সহিংস কৌশলের একটি দীর্ঘ ও ভয়াবহ রেকর্ডের ধারাবাহিকতাতেই আরশাদ শরিফকে হত্যার ঘটনা ঘটল। এ ঘটনায় সাংবাদিক সম্প্রদায়ের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সংস্থাটি এ ঘটনায় সরকারের কাছে স্বচ্ছ তদন্ত দাবি করেছে।
এ ঘটনায় টুইটার বার্তায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। দেশের জনসাধারণকে এই মৃত্যুকে ঘিরে নিজেদের মতো করে কিছু না ভেবে নেয়ার জন্য সতর্ক করেছেন তথ্যমন্ত্রী মরিয়ম আওরঙ্গজেব।
বিরোধী দলীয় নেতা ইমরান খান এ ঘটনার সঠিক বিচারিক তদন্ত দাবি করেছেন। তিনি এ ঘটনাকে ‘হত্যা’ অভিহিত করে বলেছেন, ‘সত্য বলার জন্য চূড়ান্ত মূল্য দিতে হলো’।
কেনিয়ার পুলিশ ওয়াচডগ দ্য ইনডিপেনডেন্ট পুলিশ ওভারসাইট অথরিটি (ইপোয়া) জানিয়েছে, ঘটনার পরপরই একটি দলকে কাজিয়াদো কাউন্টিতে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। ইপোয়ার চেয়ারপারসন অ্যান মাকোরি সাংবাদিকদের বলেন, পুলিশের হাতে পাকিস্তানি নাগরিকের মৃত্যুর বিষয়টি তদন্ত করা হবে।
পুলিশের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়, পুলিশ ভুলবশত মনে করেছিল, শরিফ যে গাড়িতে ছিলেন, তা চুরি হওয়া গাড়ি ছিল। পুলিশ গাড়িটিকে থামাতে ব্যর্থ হয়ে গুলি করে।
