মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ইরান ও পশ্চিমের দ্বৈরথে নতুন পরীক্ষা মাহসা আমিনি

আপডেট : ১৩ নভেম্বর ২০২২, ০১:৩৮ এএম

গত ১৬ সেপ্টেম্বর মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর ইরানসহ সারা পৃথিবীতে ‘নৈতিক পুলিশি’ তথা শাসক গোষ্ঠীর এহেন আচরণের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বরাবরের মতো এবারও ইরানের বর্তমান শাসক গোষ্ঠী বিক্ষোভকারীদের ওপর ব্যাপক মাত্রায় দমন-পীড়ন চালাচ্ছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী এবারের বিক্ষোভে এই নভেম্বর পর্যন্ত তিনশ’র বেশি মানুষ মারা গেছে যার মধ্যে শিশুরাও আছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম অনুযায়ী এই বিক্ষোভে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করছে আর তাদের দমনের জন্য ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী মাত্রাতিরিক্ত শক্তির ব্যবহার করছে।

মাহসা আমিনি তেহরান ভ্রমণ করেছিলেন এবং ঠিকভাবে হিজাব পরিধান না করার কারণে ইরানের নৈতিক পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। অভিযোগ আছে নৈতিক পুলিশের নির্যাতনে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে বাইশ বছরের এই তরুণী। কর্র্তৃপক্ষ বলছে তার মৃত্যু হয় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম জানায়, গ্রেপ্তারের পর পুলিশের গাড়িতে তাকে নির্যাতন করা হয়। মাহসা আমিনি একজন কুর্দি তরুণী। ইরানের মতো সামাজিক বাস্তবতায় তার প্রান্তিকতা ন্যূনতম দ্বিমাত্রিক। এই শিয়া রক্ষণশীল শাসকগোষ্ঠীর কাছে তিনি একজন নারী, দ্বিতীয়ত, তিনি একজন কুর্দি নারী। কুর্দি জাতীগোষ্ঠীর ওপর বর্তমান ইরানের শাসক শ্রেণির ক্ষোভ ঐতিহাসিক। আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিতে সোচ্চার জাতিগত কুর্দি জনগোষ্ঠী ইরানের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ১০ শতাংশ, যাদের একটি বড় অংশ সুন্নি মুসলিম। ইরানের শাসক গোষ্ঠী এখন চূড়ান্ত পর্যায়ের রক্ষণশীল। এই রক্ষণশীলতা যেন ইরান নামক রাষ্ট্র পরিচালনার তাদের বৈধতা তৈরি করে। আর এর সাফাই গাওয়ার জন্য শাসক গোষ্ঠী বলে থাকে তারা শুধু দেশের মানুষের বিশ্বাস ও সংস্কৃতিকে লালন করছে। যেন দেশের মানুষই রক্ষণশীল সংস্কৃতি ধারণ করছে! জনগণকে বলির পাঠা বানাতে কী ভয়ংকর কথা।

মাহসা আমিনি এখন সারা পৃথিবীতে প্রতিবাদের প্রতীক। পৃথিবীর দেশে দেশে যখন  তার এই অকাল মৃত্যু নিয়ে প্রতিবাদ হচ্ছে তখন স্বাভাবিকভাবেই ইরান একে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের চক্রান্ত হিসেবে চিহ্নিত করতে চাইছে। ইরান মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শিল্প ও তেলসমৃদ্ধ দেশ। পশ্চিমাদের একের পর এক নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা করে গত চার দশক বেশ ভালোভাবেই টিকে আছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরানের সফলতাও বেশ বিস্ময়ের উদ্রেক করে। পশ্চিমারা যখন ইরানের ওপর একের পর নিষেধাজ্ঞা দেয় তখন তারা রাশিয়ায় যুদ্ধ ড্রোন পাঠায় ইউক্রেনে হামলায় সহযোগিতা করার জন্য। তবে পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞা যে রাজনৈতিক তা নানা ধরনের ঘটনাপ্রবাহে প্রমাণিত। একই সঙ্গে এই নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য যে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে সুন্নি অধ্যুষিত ক্ষমতা বলয়ের বিপরীতে ইরানকে কোণঠাসা করার চেষ্টা সেটাও প্রমাণিত। মাহসা আমিনির হত্যার প্রতিবাদ আন্দোলন শুধু নারীদের চলাফেরার স্বাধীনতা সম্পর্কিত আন্দোলনের সঙ্গে আর যুক্ত নেই; এটা ইরানের বর্তমান রেজিম-এর রক্ষণশীলতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই ইরানের কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে আন্দোলনের তীব্রতা বেশি। বলা হচ্ছে এবারের বিক্ষোভের গভীরতা গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এতে নারীরা শুধু বিক্ষোভই করছে না, প্রতিবাদে জনসম্মুখে হিজাব খুলে ফেলছে, চুল কেটে ফেলছে। 

১৭৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার এক মাসের মধ্যে আয়াতুল্লাহ খোমিনি ইরানের নারীদের জনসম্মুখে হিজাব পরা বাধ্য করে একিটি ডিক্রি জারি করেন।  তখন থেকেই ইরানের নারীরা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে এবং একইভাবে অব্যাহত আছে এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে শাসক গোষ্ঠীর চরম রক্ষণশীল আচরণ। মাহসা আমিনির ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে যারা নিহত, আহত ও গ্রেপ্তার হয়েছেন তারাই এসব নৃশংসতার প্রমাণ। আর এই পরিপ্রেক্ষিতেই বলা যায়, মাহসা আমিনির হত্যার প্রতিবাদ পৃথিবীর যে প্রান্তেই হোক না কেন, এর পেছনে যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই থাকুক না কেন, এর সবগুলোই সমর্থনযোগ্য। এখনকার পৃথিবীতে শাসক গোষ্ঠীর এমন আচরণ কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য না এবং এটা প্রতিবাদের বাইরে থাকতে পারে না। যতদিন ইরানে এই ধরনের আচরণ অব্যাহত থাকবে তার বিরুদ্ধে সচেতন ও বিবেকবান মানুষের প্রতিবাদ অব্যাহত রাখতে হবে পৃথিবীর যে প্রান্তেই হোক না কেন। পৃথিবীতে এখনো যারা সব মানুষের অধিকারের প্রতি যোগ্য সম্মান প্রদর্শন করতে পারে না তাদের অন্য যেকোনো রাজনীতির দোহাই দিয়ে নিজেদের অনৈতিক কাজের বৈধতা অর্জন করার কোনো নৈতিক ভিত্তি থাকতে পারে না।

ইরানি বিপ্লবের একটি মজার দিক হলো, খোমেনি যখন বিদেশে বসে তার মতবাদ প্রচার করছিলেন সেই সময় তিনি অনেক ধর্মনিরপেক্ষ, বামপন্থি ও জাতীয়তাবাদীদের সমর্থন পেয়েছিলেন। এর আগে পশ্চিমাদের সমর্থনপুষ্ট ইরানের শাহ আর্থ-সামাজিক কিছু কিছু ক্ষেত্রে সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন এবং তার কিছু সফলতাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সবার সমর্থন নিয়ে আয়াতুল্লাহ খোমেনি যখন ক্ষমতায় এলেন তখন ধীরে ধীরে সব সহযোগীকে ত্যাগ করলেন, বিপ্লব প্রথমে ছিল অসাম্য, বৈষম্য ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে; বিপ্লব পরবর্তীকালে হয়ে গেছে ইসলামি বিপ্লব। এ বছর ইরানি বিপ্লবের ৪৩ বছর পূর্ণ হলো। প্রায় অর্ধশতাব্দী পূর্ণ হলেও এটাই আবার প্রমাণ হলো সব বিপ্লব সব মানুষের জন্য কল্যাণকর না। প্রমাণ হলো বিপ্লবের কাঠামো ও কেন্দ্র যদি প্রগতিশীল না হয়, গণমানুষের পক্ষে না হয়, তার সুফল সাধারণ মানুষের পক্ষে যায় না। অনেক ক্ষেত্রে তারা শুধু গণমানুষের ভাবাবেগকে কাজে লাগায় ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য কিন্তু মানুষকে ক্ষমতার অংশীদার করে না। উপরন্তু এর হাত ধরে ভিন্ন পরিচয় এবং ভেদাভেদের সূত্র ধরে নতুন করে প্রান্তিকতা তৈরি হয়। ইরানের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে যেখানে শিয়া ধর্মীয় অভিজাতরা আগের থেকে নিশ্চয়ই ভালো আছে কিন্তু সংকটটা অন্যদের।

বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে ইরানের প্রতি পশ্চিমাদের রুষ্ট হওয়ার কারণ আছে। শাহের আমলে তারা ছিল ইরানের তেল সম্পদের সুফলভোগী। শাহের পতনের পর ইরান ও ইরানের জনগণকে বিপদে ফেলার জন্য যারপরনাই এমন উদ্যোগ নিতে বাকি রাখেনি পশ্চিমারা। তাই স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে যে চলমান আন্দোলনের প্রতি প্রশ্চিমাদের সমর্থন আসলে কতটা ইরানের জনগণের পক্ষে? ইরানের জনগণের শক্তি ও সামর্থ্য আছে নিজেদের রাজনৈতিক কাঠামোতে পরিবর্তন নিয়ে আসার সেটা এখন বা আর কিছুদিন পরে এবং সেই শক্তির ওপর বিশ্বাস করেই বর্তমান আন্দোলনকে সমর্থন দিতে হবে। অন্যদিকে, ইরানের বর্তমান শাসক গোষ্ঠী যদি তাদের এই গোঁড়ামি অব্যাহত রাখে তাহলে যে পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে শাহের বিরুদ্ধে জনগণ ফুঁসে উঠেছিল ঠিক তেমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। তখন আর পশ্চিমাদের দোষারোপ করে লাভ হবে না। ইরানের ক্ষমতাসীনদের বর্তমান আচরণ শুধু দেশের অভ্যন্তরে তাদের অবস্থানকে দুর্বল করবে না, পশ্চিমা বিশ্ব ও ইসরায়েলের আগ্রসনের পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের প্রতি যারা সহানুভূতিশীল ছিলেন তারাও ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নেবেন আর সেটাই হবে সময়ের বিচার। সময়ের এই বিচারে এখন ইরান ও পশ্চিমের দ্বৈরথে নতুন পরীক্ষা মাহসা আমিনি।

লেখক : উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত