দুই লিওনেলে তাকিয়ে আর্জেন্টিনা। লিওনেলদ্বয় সফল হলেই ঘুচবে ৩৬ বছরের অপেক্ষা। গত বছর কোপা আমেরিকা জিতিয়ে যে দুজন ঘুুচিয়েছিলেন ২৮ বছরের শিরোপা খরা। তারাই পারেন দেশকে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ এনে দিতে। একজন লিওনেল মেসি, আরেকজন লিওনেল স্কালোনি। একজন বহু বছর ধরেই আলবিসেলেস্তেদের স্বপ্নসারথী। অন্যজন খুব অল্প সময়ে কেড়ে নিয়েছেন আস্থার আসন। দুই লিওনেলকে ঘিরে বিশ্বজয়ের মিশন আর্জেন্টিনা শুরু করবে আজ। লুসাইল আইকনিক স্টেডিয়ামে তাদের প্রতিপক্ষ সৌদি আরব। এ মাঠেই হোক রূপকথার শুরু। ১৮ ডিসেম্বর বিজয় সংগীত গেয়ে এখানেই নিশ্চয় রূপকথার শেষটা করতে চাইবেন মেসিরা। বলে দেওয়াই যায় আরবকে এক ইঞ্চি ছাড় দেওয়ার মনোবৃত্তি দেখা যাবে না আর্জেন্টাইনদের মধ্যে। স্বপ্ন জয়ের অভিযান বলেই প্রয়োজনে ধারণ করতে হবে নিষ্ঠুর রূপ।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির শুরুটা সেই ২০০৫ সাল থেকে। বাঁ পায়ের জাদুকর সেই থেকে মায়াবী জাদুতে সম্মোহিত করে রেখেছেন সারা দুনিয়াকে। বার্সেলোনা একাডেমিতে বেড়ে ওঠা, তার আলোতেই স্প্যানিশ ক্লাবটি জিতেছে সম্ভাব্য সবকিছুই। ক্লাবের হয়ে মেসিও হীরে-জহরতে গেঁথেছেন সাফল্যের মালা। তবে কেন যেন আকাশি জার্সিতে হচ্ছিল না। সাফল্যের খুব কাছে গিয়েও ফিরতে হয়েছে খালি হাতে। তা বিশ্বকাপ বলুন কিংবা কোপা আমেরিকা। একটা সময় মনে হচ্ছিল মেসি খেলা দিয়ে হৃদয় জিতবেন ঠিকই, তবে শিরোপা জেতা হবে না। কোনো শিরোপাই নয়। সেই মনে হওয়াটা ভুল প্রমাণিত হয় অভিষেকের ঠিক ১৬ বছর পর, গত বছর। ব্রাজিলকে তাদের মাঠে ফাইনালে হারিয়ে কোপা আমেরিকা ওঠে ফুটবলের বরপুত্রের হাতে। সেই আসরে আর্জেন্টিনার ১২ গোলের ৯টিতেই ছিল তার অবদান। করেছিলেন চার গোল, সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছিলেন পাঁচটি। সে বছরই ওয়েম্বলিতে ইতালিকে ৩-০ গোলে হারিয়ে কনমেবল-উয়েফা কাপ অব চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জেতে আর্জেন্টিনা। সেই ১৯৯৩ সালে সর্বশেষ কোপা জয়ের ২৮ বছর পর জোড়া শিরোপায় মেসির যেমন অবদান, কোচ স্কালোনির অবদানকেও খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। জর্জ সাম্পোওলির সহকারী হয়ে ২০১৬-তে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে পা রাখা। ২০১৮-তে যখন হেড কোচের দায়িত্ব পান, তখন কম সমালোচনা সইতে হয়নি। খোদ ডিয়েগো ম্যারাডোনা এমন একজনের হাতে দায়িত্ব দেওয়ায় সমালোচনায় বিদ্ধ করেছিলেন আর্জেন্টাইন ফুটবল ফেডারেশনকে। সে সময়ের সমালোচনাগুলো মুখ বুজে সয়ে যাওয়া স্কালোনি একটা পন্থাই নিয়েছিলেন। মেসিকে কেন্দ্রে রেখে পুরো দলটাকে একটা পরিবার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। ৪৪ বছর বয়সী কোচও বুঝেছিলেন মেসি সুখী থাকলে দলও যেমন খুশি, পুরো আর্জেন্টিনাই খুশি।
মেসিকে ভালো রাখতে জানেন বলেই দুই লিওনেলে রসায়নটা হয়েছে চমৎকার। সেই রসায়নেই এবার সময় এসেছে বিশ্বসেরা হওয়ার। আর্জেন্টিনা দোহায় পা রেখেছে টানা ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত থাকার অনন্য এক রেকর্ড নিয়ে। আজ সৌদি আরবকে হারালে তারা ছুঁয়ে ফেলবে ইতালির ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত থাকার বিশ্বরেকর্ড। আর গ্রুপের পরে ম্যাচে মেক্সিকোকে হারালে রেকর্ডটা হয়ে যাবে এককভাবে তাদের। এমন ছন্দে থাকা আর্জেন্টিনা যদি এবার বিশ্বকাপ না জেতে, তাহলে অন্যায় হবে। ঘোরতর অন্যায়। এ যে মেসির সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ। বয়স তো আর এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তবে স্কালোনি তা মানছেন না। কোচ মেসিকে ২০২৬ বিশ্বকাপেও দেখতে চান। আমেরিকা-কানাডা বিশ্বকাপে মেসি থাকবেন কি না, এ নিয়ে এখন মাথা ঘামানোর মানে নেই। আগে তো কাতার মিশনটা ঠিকঠাক শেষ করতে হবে।
তবে ঠিকঠাক কাজের পরিকল্পনা করতে গিয়েই স্কালোনি পড়েছেন বিপাকে। এই সুখী আর্জেন্টিনার মাঝমাঠের নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন জিওভানি লো সেলসো ও রদ্রিগো ডি পল। সেই ২০১৯ থেকে। বিশ্বকাপ শুরুর আগ মুহূর্তে লো সেলসো হ্যামস্ট্রিং চোটে পড়ে ছিটকে যান। এতদিন ডি পল ও লো সেলসো মাঝমাঠ থেকে আর্জেন্টিনার খেলাটা গোছাতেন। সুবাদে মেসি অনেকটা স্বাধীন হয়ে খেলার সুযোগ পেতেন। কখনো ওপরে আবার কখনো একটু নেমে এসে জায়গা করে আক্রমণে উঠতেন। কখনো গোল করতেন, কখনো করিয়ে শান্তি পেতেন। তাই লো সেলসোর না থাকাটা বড় দুশ্চিন্তা। এটা বাদ দিয়ে এই আর্জেন্টিনার দুর্বলতা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আজ লো সেলসোর জায়গায় মাঝমাঠে ডি পলের সঙ্গী হতে দেখা যেতে পারে লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে। ৪-৩-৩ ফরম্যাটে নাম্বার নাইন পজিশনে লাউতারো মার্তিনেজকে রেখে দু’পাশে খেলবেন মেসি ও অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া। রক্ষণে স্কালোনি আস্থা রাখতে পারেন নাহুয়েল মলিনা, নিকোলাস ওতামেন্দি, ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো ও নিকোলাস তাগলিয়াফিকোর ওপর। মাঝমাঠে ডি পল ও পারেদেসকে সহায়তা দেবেন দিগো রড্রিগেজ। আর দুর্গ সামলানোর জন্য তো এমি মার্তিনেজ আছেনই।
ওদিকে সৌদি আরবের মনে শান্তি নেই। সেটা কেবল প্রথম ম্যাচের প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনার বলে নয়। পাশের ছোট্ট দেশ কাতার বিশ্বকাপ আয়োজন করে একটা বড় শিক্ষাই দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের মোড়লদের। তারপর বেরসিক ভাগ্য প্রথম ম্যাচেই জুটিয়ে দিয়েছে মেসির দলকে। তাই পরের ধাপে যাওয়ার বড় আশা করাটাই কঠিন হয়ে পড়েছে ফরাসি কোচ হার্ভে রেনাঁর শিষ্যদের। তারপরও অভ্যস্ত আবহাওয়ায় খেলা বলেই যা একটু সুবিধে। বড়জোর দলের মূল শক্তির জায়গা রক্ষণভাগকে জমাট করে মেসি-মার্তিনেজ, ডি মারিয়াদের রুখে দিতে পারলেই বড় পাওয়া হবে আরবদের জন্য।
শক্তি, ঐতিহ্য, ফর্ম বিবেচনায় বড় কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলে আজ বড় জয়েই বিশ্বকাপ শুরু করতে চাইবে আর্জেন্টিনা। কাল পর্যন্ত যতটুকু জানা গেছে, হালকা চোট থেকে সেরে মেসিও প্রস্তুত মাঠে নামতে। নামবেন না-ই বা কেন? এই বিশ্বকাপ যে অনেক কিছু পাওয়ার বিশ্বকাপ। এই শিরোপা না জিতলে যে কখনই আর্জেন্টিনা মেসির আর্জেন্টিনা হবে না। সেটা হয়ে থাকবে ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা। লিওনেলদের রূপকথার যাত্রাটা তাই শুরু হোক জয়ের মুকুট পরে। যেভাবে তারা কোপা জিতে হাসি ফিরিয়েছিলেন ভক্তদের মুখে, ঠিক সেভাবেই যেন লুসাইল স্টেডিয়ামে ১৮ ডিসেম্বর শেষ হাসিটা হাসেন লিওনেল জুটি।
