মার্কো আসেনসিও
মার্কো আসেনসিওর গায়ের জার্সির রংটা আগুন লাল না হয়ে কমলাও হতে পারত! আসেনসিওর বাবা স্প্যানিশ, মা ডাচ। সেই সুবাদে ডাচ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন যোগাযোগও করেছিল আসেনসিওর সঙ্গে, তাকে স্পেন থেকে নেদারল্যান্ডসে নিয়ে আসার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্যাম্পেইনও চালু হয়েছিল! তবে আসেনসিও থেকে গেছেন স্পেনেই, সব সময়ই স্পেনকে নিজের দল ভেবে আসা এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার/উইঙ্গার এই নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো লা ফিউরিয়া রোজাদের প্রতিনিধিত্ব করছেন বিশ্বকাপে।
কোস্টারিকার বিপক্ষে স্পেনের ৭-০ গোলের জয়ে দ্বিতীয় গোলটা আসেনসিওর। বিশ্বকাপে গোলের দেখা পেলেন এবারই প্রথম। রাশিয়া বিশ্বকাপে খেললেও গোল পাননি। সেবার স্পেন বিদায় নিয়েছিল দ্বিতীয় রাউন্ড থেকেই, গোটা আসরেই করেছিল ৪ ম্যাচে ৬ গোল। সেখানে এবার প্রথম ম্যাচেই সাত গোল। তবে তাদের আসল পরীক্ষা আজ জার্মানির বিপক্ষে, তাতেই বোঝা যাবে লুই এনরিকের ছেলেদের কতটা দম।
রিয়াল মাদ্রিদ-বার্সেলোনা নিয়ে সমর্থকদের ভেতর বেশ লড়াই চললেও জাতীয় দলে এসে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর ফুটবলারদের ভেতর বেশ ভাব! পেদ্রি তো মনে করেন রিয়াল ছেড়ে বার্সেলোনাতেই চলে আসা উচিত আসেনসিওর, ‘ও খুব ভালো ফুটবলার। দেখা যাক ওর চুক্তির শেষে কী হয়, তবে আমি তো মনে করি সব ভালো খেলোয়াড়েরই বার্সেলোনায় আসা উচিত। সিদ্ধান্তটা তাকেই নিতে হবে।’ ওদিকে কোস্টারিকা ম্যাচের পর পেদ্রির প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন আসেনসিও, ‘মাঝে মাঝে আমিই অবাক হয়ে যাই যখন ভাবি ওর বয়স মাত্র ১৮। তাকে আমি অনুশীলনে দেখি, সে খুব উঁচু মানের খেলোয়াড় আর প্রচ- আত্মবিশ্বাসী।’
আসেনসিওর বাবা গিলবার্তোও ছিলেন ফুটবলার, বাস্ক অঞ্চলের মানুষ হিসেবে চেয়েছিলেন ছেলে খেলবে অ্যাথলেটিক বিলবাওতে। কিন্তু সে সময়ের ক্লাব সেক্রেটারি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন আসেনসিওকে; কারণ হিসেবে বলেছিলেন ক্লাবের দর্শনের সঙ্গে বেমানান! তখন মায়োর্কা অঞ্চলের ছেলে হিসেবে আসেনসিওকে রিয়াল মাদ্রিদে পাঠাতে অনেক সহযোগিতা করেছিলেন টেনিস তারকা রাফায়েল নাদাল। সেই আসেনসিও স্পেনের সফলতম ক্লাবের হয়ে খেলে ক্লাব পর্যায়ে রীতিমতো সম্ভাব্য সব শিরোপা (লিগ, চ্যাম্পিয়নস লিগ, ক্লাব বিশ্বকাপ, স্প্যানিশ ও ইউরোপিয়ান সুপার কাপ) জিতেছেন। গোল আছে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালেও। আগামী গ্রীষ্মেই রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদটা ফুরিয়ে যাবে আসেনসিওর। চুক্তির মেয়াদটা বাড়াতে হলে দাবিটা ফুটবলের ভাষাতেই তুলতে হবে আসেনসিওকে। আর সে জন্য বিশ্বকাপের চেয়ে বড় মঞ্চ আর কী হতে পারে? প্রথম গোলের দেখা তো পেয়েই গেছেন, এখন আরও গোল নামের পাশে যোগ করার পালা।
কাই হাভার্টজ
বুন্দেসলিগার দল বেয়ার লেভারকুসেন থেকে যখন প্রায় ৭১ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করে কাই হাভার্টজকে দলে নেয় চেলসি, তারপর থেকেই এই জার্মান তরুণের ওপর চেপে বসে প্রত্যাশার চাপ। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে গোল পাচ্ছিলেন না, তখন দামের সঙ্গে গোলের অনুপাতও খোঁজা হচ্ছিল! তবে শেষ পর্যন্ত প্রথম মৌসুমে চেলসিকে অমূল্য দুটো গোল আর একটা অ্যাসিস্ট করে দিয়েছেন হাভার্টজ; এরপর থেমে গেছে সব সমালোচনা।
২০২১ চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে একমাত্র গোলটা কাই হাভার্টজের। এই জার্মানের গোলেই ১০ বছর পর নিজেদের দ্বিতীয় চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা জিতেছিল চেলসি, ফাইনালে হারিয়েছিল ম্যানচেস্টার সিটিকে। সেটাই ছিল চ্যাম্পিয়নস লিগে হাভার্টজের একমাত্র গোল। সে বছর ক্লাব বিশ্বকাপের ফাইনালেও পেনাল্টি থেকে জয়সূচক গোলটা হাভার্টজের, এমনকি উয়েফা সুপার কাপে হাকিম জিয়েচের গোলেও অ্যাসিস্ট ছিল হাভার্টজের।
দলের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় সময়ে গোল করার অভ্যাসটা জাতীয় দলেও করে দেখাতে হবে হাভার্টজকে। অল্পদিনের ক্যারিয়ারে অবশ্য কাজটা ভালোই করছেন তিনি। ২০২০ ইউরোতে পর্তুগালের বিপক্ষে জার্মানির ৪-২ গোলে জেতা ম্যাচটায় দলের তৃতীয় গোলটা করেছিলেন হাভার্টজ। হাঙ্গেরির বিপক্ষে ম্যাচেও পিছিয়ে পড়া জার্মানিকে ১-১ সমতায় ফিরিয়েছিলেন হাভার্টজ। টিমো ভারনার ফিট থাকলে হয়তো হাভার্টজের ওপর প্রত্যাশার চাপ এতটা থাকত না, তবে এটা একদিকে হাভার্টজের জন্য সুযোগও। গতকাল সংবাদ সম্মেলনে এসে অবশ্য খানিকটা বিরক্তই হয়েছেন হাভার্টজ। বলেছেন ‘পজিশন নিয়ে এই আলাপটা সত্যিই একেবারে আমার স্নায়ুর ওপর চড়ে বসছে। সবাই জানে আমি ডানে খেলতে পারি, বামেও খেলতে পারি; ৯ নম্বর হিসেবেও খেলতে পারি, আবার ১০ নম্বর হিসেবেও খেলতে পারি। আমি শুধু জানি সামনে যেকোনো জায়গাতেই আমি খেলতে পারি।’
জাপানের কাছে হারের পর সমালোচনার স্রোতকে অস্বীকার না করে হাভার্টজ জানালেন ঘুরে দাঁড়াবার কথা, ‘আমি বুঝতে পারছি ভক্তদের কাছ থেকে অনেক নেতিবাচক কথাবার্তা ভেসে আসছে। আমরা অনেক চাপে আছি, তবে আমি এসব পাত্তা দেই না। অতীতে কী হয়েছে সেসব নিয়ে ভাবছি না। রবিবার বড় ম্যাচ, এখন মাথায় নেতিবাচক ভাবনা ঢুকিয়ে কোনো লাভ নেই। আমাদের মনোযোগ এখন ভবিষ্যতের দিকে।’
কোস্টারিকাকে বড় ব্যবধানে হারিয়ে উড়তে থাকা স্পেনের সামনে জাপানের বিপক্ষে হেরে বসা জার্মানদের জন্য জয় ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই বলেও জানালেন চেলসিতে খেলা এই তরুণ, ‘আমরা খেলাটা (জাপানের বিপক্ষে ম্যাচ) খুব ভালোভাবে বিশ্লেষণ করে দেখেছি এবং বুঝতে পেরেছি কোথায় কোথায় আমাদের কমতি আছে আর কোথায় উন্নতি করতে হবে। আমাদের দল হয়েই স্পেনের মুখোমুখি হতে হবে, এরকম চাপের ম্যাচে আমাদের পা রাখতে হবে অ্যাক্সেলেটরে, আমাদের অন্য কোনো পথ নেই’ বলেছেন হাভার্টজ।
জাপান ম্যাচে হারের পর দলের খেলোয়াড়দের সমালোচনা করেছিলেন ইলকে গুনদোয়ান ও ম্যানুয়ের ন্যয়ার। এই নিয়ে জার্মান দলে বিভক্তির গুঞ্জন শোনা গেলেও হাভার্টজ বলছেন সব ঠিক আছে, ‘ইলকে অভিযোগ করেছে আমরা আক্রমণভাগের সবাই লুকিয়ে পড়েছিলাম, সে বলেছে আমাদের কেউ দ্বিতীয় বা তৃতীয় গোলটা করতে পারেনি। কথাটা সবার সামনে বলেছে নাকি ভেতরে বলেছে এতে মানেটা পাল্টে যায় না।’
