জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে ছিনতাই, মারামারিসহ শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীরা পদ পেয়েছেন। কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে জায়গা পেয়েছেন অছাত্ররা। ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১২১ সদস্যের কমিটি ঘোষণার নিয়ম থাকলেও এই কমিটিতে পদ পেয়েছেন ৩৮৯ জন। এ ছাড়া ছাত্রলীগের অন্যান্য শাখা কমিটিতে পদ থাকার পরেও নতুন করে এই কমিটিতেও পদ পেয়েছেন কয়েকজন। এদিকে যোগ্যতা থাকা স্বত্ত্বেও অনেকে পদ পাননি বলে অভিযোগ উঠেছে।
চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস্ বিভাগের ৪২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আকতারুজ্জামান সোহেলকে সভাপতি এবং দর্শন বিভাগের ৪৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান লিটনকে সাধারণ সম্পাদক করে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়।
মঙ্গলবার (২৯ নভেম্বর) রাতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সভাপতি আল নাহিয়ান খান এবং সাধারন সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন করা হয়। পূর্ণাঙ্গ কমিটির এই বিজ্ঞপ্তি মঙ্গলবার রাত সোয়া ৯টায় ছাত্রলীগের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়। পরে রাত সোয়া ১২টায় এই বিজ্ঞপ্তি সংশোধন করা হয়।
সংশোধিত এই বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, উপ-গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক তাসমিয়া মেহরিনকে সহ-সভাপতি করা হয়েছে। অফিসিয়ালি ঘোষণার পর কমিটিতে নতুন করে এই সংযোজন-বিয়োজন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি সোহান খান বৃহৎ এই কমিটিকে শুভঙ্করের ফাঁকি বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘কমিটিতে বহিষ্কৃত কেউ থাকলে সেটি অন্যায়। ছাত্রলীগে এ ধরনের কমিটি হতে পারে না। একইসাথে, কোনো ইউনিটের পদে থাকা অবস্থায় নতুন করে অন্য কোনো ইউনিটের পদে আসা ছাত্রলীগের জন্য অবমাননাকর।’
প্রসঙ্গত, জাবি ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সহ-সভাপতি হয়েছেন ১০১ জন, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ১১ জন, সাংগঠনিক সম্পাদক ১১ জন, সহ-সম্পাদক ৬৬ জন এবং সদস্য ৫৫ জন। এছাড়া বিভিন্ন সম্পাদক ও উপ-সম্পাদক পদে আরও ১৪২ জন পদ পেয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ২৭ জানুয়ারি রাজধানীর একটি ভ্রমণবিষয়ক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সাড়ে পঁচানব্বই হাজার টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগ ওঠে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের তৎকালীন সহ-সম্পাদক হাবিবুর রহমান লিটন এবং কর্মী সৈয়দ লায়েব আলীর বিরুদ্ধে। লিটন বর্তমান কমিটির সাধারণ সম্পাদক আর সৈয়দ লায়েব আলী পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সহ-সভাপতির পদ পেয়েছেন।
২০১৯ সালের ৩০ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মচারীর জামাতাকে মারধর করে ছিনতাই ও তুলে নিয়ে মুক্তিপণ দাবির অভিযোগে বহিষ্কৃত সরকার ও রাজনীতি বিভাগের আল-রাজি সরকার পেয়েছেন উপ-ছাত্রবৃত্তি বিষয়ক সম্পাদকের পদ এবং কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শাহ মোস্তাক আহমেদ সৈকত হয়েছেন সহ-সভাপতি।
২০১৯ সালের ২২ জুলাই রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের র্যাগ দেওয়ার ঘটনায় ১১ শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার করা হয়। তাদের মধ্যে ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ফয়জুল ইসলাম নীরব পেয়েছেন উপ-ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদকের পদ এবং ইতিহাস বিভাগের সারোয়ার হোসেন সাকিল হয়েছেন উপ-কৃষি বিষয়ক সম্পাদক।
২০১৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ছিনতাইয়ে বাধা দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে লাঞ্ছনা ও কর্তব্যরত এক সংবাদকর্মীকে মারধরের ঘটনায় সাময়িক বহিষ্কৃত বাংলা বিভাগের ৪৫তম ব্যাচের শুভাশীষ ঘোষ পেয়েছেন উপ-ধর্ম বিষয়ক সম্পাদকের পদ।
চলতি বছরের ২ আগস্ট বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের অতিথিকক্ষে এক সাংবাদিককে নির্যাতনের দায়ে বহিষ্কৃত আইন ও বিচার বিভাগের মাসুম বিল্লাহ হয়েছেন সহ-সম্পাদক।
আর গত ৬ আগস্ট মওলানা ভাসানী হল ছাত্রলীগের এক কর্মীকে মারধরের ঘটনায় সাময়িক বহিষ্কৃত খালিদ হাসান ও সাব্বির হোসেন সদস্য পদ পেয়েছেন।
এ ছাড়া এ বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী এলাকার একটি ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যালয় ভাঙচুর ও মালামাল লুটপাটে অভিযুক্তদের মধ্যে সহ-সভাপতি হয়েছেন সাজ্জাদুল ইসলাম ও এহসানুল হক, আর সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ পেয়েছেন ফারসাদ হোসেন এবং মেহেদী জয়।
র্যাগিং-মারধরসহ বিভিন্ন কারণে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নানা মেয়াদে বহিষ্কৃত এবং শৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনায় বিতর্কিত আরও অন্তত ২০ জন ছাত্রলীগের এই কমিটিতে পদ পেয়েছেন। এর বাইরে শাখা ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত নন এমন অনেকেই পদ পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ বিভাগের ৪৫ তম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের স্নাতকোত্তর শেষ হয়েছে। পরীক্ষায় ফেল করাসহ নানাভাবে ছাত্রত্ব টিকিয়ে রাখলেও বড়জোর ৪৪তম ব্যাচ পর্যন্ত ছাত্রত্ব আছে। অথচ পূর্ণাঙ্গ কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে স্থান পেয়েছেন ৪২ ও ৪৩ তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, ছাত্রত্ব শেষ হয়ে যাওয়া কেউ কমিটিতে পদ পাওয়ার যোগ্য নন।
ছাত্রলীগের পদবঞ্চিত কর্মীরা বলছেন, কিছু নেতাকর্মী জেলা-উপজেলায় পদে থাকার পরেও বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ এ কমিটিতে পদ পেয়েছেন। যাদের মধ্যে ঢাকা জেলা উত্তরের সহ-সভাপতি শান্ত মাহবুবকে দেওয়া হয়েছে ত্রাণ ও দুর্যোগ বিষয়ক সম্পাদকের পদ। সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সোহেল রানা হয়েছেন কর্মসংস্থান বিষয়ক সম্পাদক এবং বান্দরবানের আলীকদম উপজেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি থোয়াই মহাজন হয়েছেন সদস্য।
নতুন কমিটির উপ মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক ফারহান আনজুম তানজিল বলেন, ‘এই কমিটিতে যোগ্যদের মূল্যায়ন করা হয়নি। বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত, অবৈধভাবে হলে থাকা পোষ্য কোটায় ভর্তি শিক্ষার্থী এবং মাদক কারবারে অভিযুক্তরাও পদ পেয়েছে।’
এসব বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি আকতারুজ্জামান সোহেল বলেন, ‘যেসব ছাত্রলীগ নেতাকর্মী দীর্ঘদিন থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং ইতোমধ্যে তাদের শিক্ষাজীবন শেষ করেছে করোনাভাইরাস বিবেচনায় তাদের বিষয়টিও মাথায় রেখেই আমরা পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে তাদের স্থান দিয়েছি। আর বিভিন্ন সময়ে যারা বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিল আমরা তাদেরকে দীর্ঘ সময় পর্যবেক্ষণ করেছি এবং শুধরানোর সুযোগ দিয়েছি। তাই অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকার পরও তাদেরকে কমিটিতে স্থান দিয়েছি।’
ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদের দপ্তর সম্পাদক ইন্দ্রনীল দেব শর্মা বলেন, ‘কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তার ব্যাখ্যা দেবেন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক।’
তবে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সভাপতি আল নাহিয়ান খান এবং সাধারন সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের সঙ্গে ফোনে যোগযোগ করা যায়নি। এমনকি বার্তা পাঠালেও তারা সাড়া দেননি।
