পাঁচ গোলে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন কিলিয়েন এমবাপ্পে। গোলে-ড্রিবলিংয়ে মরুর বিশ্বকাপ মাতিয়ে রেখেছেন লিওনেল মেসি। আর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো? বিশ্বফুটবলের তিন মহাতারকার একজন তিনি। অথচ পর্তুগিজ রাজার পায়ে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না আগের ছন্দ। মাঠে তার উপস্থিতি আলাদাভাবে বোঝার উপায় নেই। তবে কি তিনি দলের জন্য বোঝা হয়ে গেলেন? এমন প্রশ্নের মুখে আজ পর্তুগালকে নামতে হচ্ছে অগ্নিপরীক্ষায়। লুসাইলে তাদের পরীক্ষা নিতে প্রস্তুত সুইজারল্যান্ড। পর্তুগাল আজ জিততে না পারলে মুকুটহীন রাজা হয়ে বিশ্বকাপকে বিদায় বলতে হবে রোনালদোকে।
৩৭ বছরের রোনালদোয় আস্থাটা নড়ে গেছে পর্তুগিজদের। ব্রুনো ফার্নান্দেস, বার্নাদো সিলভা, জোয়াও কানসেলো, রুবেল দিয়েসের মতো তরুণরা এই পর্তুগালের স্বপ্নের ধারক-বাহক। তারপরও রোনালদো আছেন। ঠিক নিজের মতো করে না হলেও, প্রতিপক্ষের রক্ষণ ছারখার করার তীব্র বাসনা নিয়ে। তবে গত দেড় দশক গোটা বিশ্বকে যেভাবে আনন্দ দিয়ে গেছেন, সেটা এখন দিতে না পারায় অনেকেই রোনালদোকে এই দলের বোঝা ভাবতে শুরু করে দিয়েছে। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে রোনালদোকে সেরা একাদশে দেখতে না চাওয়ার পাল্লাই ভারী। একটি পর্তুগিজ পত্রিকার পাঠকদের নিয়ে জরিপে দেখা গেছে ৭০ শতাংশ পর্তুগিজ তাকে আজকের সেরা একাদশে দেখতে চায় না। বাকিরা আস্থা রাখছেন অধিনায়ককে। যেমনটা রেখেছেন ৬৮ বছর বয়সী কোচ ফার্নান্দো সান্তোসও।
যদিও বিশ্বকাপের নকআউটপর্বে বরাবরই মøান রোনালদো। ২০০৬ থেকে ২০১৮ শেষ বিশ্বকাপের কোনো আসরেই নকআউটপর্বে গোল পাননি। পরিসংখ্যানও তার পক্ষে নেই। আগের চার বিশ্বকাপে তিনি খেলেছেন পাঁচটি নকআউটপর্বের ম্যাচ। অথচ একবারও প্রতিপক্ষের দুর্গ ভাঙতে পারেননি। অথচ উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগে হেসেখেলেই তাকে দেখা গেছে নকআউটপর্বে গোল করতে। চ্যাম্পিয়নস লিগে সর্বোচ্চ ৬৭ গোল করা রোনালদোর বিশ্বকাপের গোল এর মধ্যেই ছাড়িয়ে গেছেন মেসি ও এমবাপ্পে। দুজনেরই গোল ৯টি করে। পর্তুগালের জার্সিতে বিশ্বকাপে বেশি গোলের রেকর্ডটি ভাঙতে পর্তুগালের জার্সিতে সর্বোচ্চ ১৮ গোল করা রোনালদোর প্রয়োজন আরও এক গোল। সেই ৯ গোলের রেকর্ড এখনো পর্তুগিজ কিংবদন্তি ইউসেবিওর দখলে।
এই বিশ্বকাপেও একটা রেকর্ড গড়েছেন বিশ্বকাপের মধ্যেই ম্যানইউর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটা রোনালদো। ঘানার বিপক্ষে গ্রুপের প্রথম ম্যাচে তার স্পটকিকে এগিয়ে নেয় দলকে। সেই গোলেই বিশ্বকাপের ইতিহাসে টানা পাঁচ বিশ্বকাপে গোলের রেকর্ড গড়ে ফেলেন তিনি। পরে অবশ্য সেই রেকর্ড হয়েছে মেসিরও। পরের দুই ম্যাচে গোল করতে পারেননি রোনালদো। আজ তাই তাকে নিয়ে এত প্রশ্ন। তবে প্রতিপক্ষ যখন সুইজারল্যান্ড, তখন কিছুটা আশাবাদী হতেই পারেন কালই ২০০ মিলিয়ন ইউরো বাৎসরিক বেতনে সৌদি আরবের আল নসর ক্লাবে খেলা চূড়ান্ত করা রোনালদো। এ বছর শুরুতে তার জোড়া গোলে সুইসদের উয়েফা ন্যাশন্স লিগে ৪-০ তে হারিয়েছিল পর্তুগাল। তবে ফিরতি দেখায় সুইসরা প্রতিশোধ নেয় ১-০ জয়ে।
রোনালদো আজ খোলস থেকে বেরিয়ে এলে, জয়ের পাল্লা ভারী হবে পর্তুগিজদের। আর এই জয়ে ঘুচবে ১৬ বছরের অপেক্ষার। ২০০৬ সালে সেমিফাইনাল খেলার পর শেষ তিনটি বিশ্বকাপে পর্তুগাল কোয়ার্টার ফাইনালেই পৌঁছাতে পারেনি।
তিনবার কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা সুইসদের অপেক্ষাটা আরও দীর্ঘ। সবশেষ তারা কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট পেয়েছিল ১৯৫৪ সালে। জি গ্রুপের রানার্স-আপ হিসেবে এই মঞ্চে পা রেখেছে সুইজারল্যান্ড। প্রথম ম্যাচে ক্যামেরুনকে ১-০ তে হারানোর পর তারা ব্রাজিলের কাছে হারে একই ব্যবধানে। শেষ গ্রুপ ম্যাচে সার্বিয়া তাদের ভালোই ভুগিয়েছিল। তবে ৩-২ জয়ে তাদের নিশ্চিত হয় দ্বিতীয়পর্ব। মুরাত ইয়াকিনের দলের বড় ভরসার নাম জারদান শাকিরা। সিকাগো ফায়ারের এই উইঙ্গারের নামের পাশে আছে বিশ্বকাপে করা পাঁচ গোল। তিনটি পজিশনেই তাদের আছে ভালোমানের খেলোয়াড়।
মুখোমুখির হিসাবটা যাচ্ছে সুইসদের পক্ষে। ২৫ বারের দেখায় সুইজারল্যান্ড জিতেছে ১১টিতে। আর পর্তুগালের জয় ৯টিতে। ৫ ম্যাচ ড্র হয়েছে। তবে বিশ্বকাপের মঞ্চে দুই ইউরোপিয়ান দলের আজই প্রথম দেখা। সবশেষ সাক্ষাতেও জিতেছিল সুইসরা। সেই ধারা আজ অব্যাহত থাকলে লুসাইল পরিণত হবে রোনালদোর বিদায়ী মঞ্চ। ফাইনালের ভেন্যুতেই আগেভাগে বিদায়ের পরিণতিটা নিশ্চয় মেনে নিতে চাইবেন না। বিশ্বজুড়ে ভক্তরাও মনেপ্রাণে চাইবে আজকের রাতটা হোক পর্তুগিজ রাজার।
