ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় শাসকদের ভূমিকা

আপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০২২, ০২:১০ এএম

ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সবক্ষেত্রে এবং সর্বস্তরে ইনসাফ তথা ন্যায় প্রতিষ্ঠা মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত। তা ছাড়া নবী-রাসুল প্রেরণের বিশেষ উদ্দেশ্যও এটি। আল্লাহতায়ালা বলেন, আমি স্পষ্ট নির্দেশনাবলি দিয়ে আমার রাসুলদের পাঠিয়েছি এবং আমি তাদের সঙ্গে কিতাব ও দাঁড়িপাল্লা অবতীর্ণ করেছি। যাতে মানুষ ন্যায়ের ওপর অবিচল থাকে। সুরা হাদিদ : ২৫

তিনটি জিনিস দিয়ে নবী-রাসুলদের পৃথিবীতে পাঠানোর কথা এই আয়াতে বলা হয়েছে। ১. সুস্পষ্ট নির্দেশনাবলি, যা দেখে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়, তিনি বাস্তবিকই আল্লাহর রাসুল এবং তার আনীত বাণী শতভাগ সত্য। ২. আসমানি গ্রন্থ, তথা পবিত্র অহি, যা মানুষের পথপ্রদর্শনের জন্য নবীদের ওপর অবতীর্ণ হয়েছে। ৩. দাঁড়িপাল্লা, অর্থাৎ সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের মাপকাঠি, যা দাঁড়িপাল্লার মতো মেপে ভুল-শুদ্ধ নির্ণয় করে দেবে। ফলে সব ধরনের প্রান্তিকতা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। সমাজ ন্যায়নিষ্ঠা আর ইনসাফের রোলমডেলে পরিণত হবে।

যেহেতু সমাজে ও রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং ইনসাফ কায়েমের গুরুভার প্রধানত রাষ্ট্রপ্রধানের ওপর এবং এ ক্ষেত্রে তাদের পক্ষ থেকেই ব্যত্যয় ঘটার সম্ভাবনা থাকে বেশি, তাই ইসলাম শাসকদের প্রতি ইনসাফ কায়েমের বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেছে। যাতে তারা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দিকে বিশেষ নজর রাখে। অন্যথায় তাদের অবহেলায় একটি সমাজে ইনসাফ এবং ন্যায়বিচারের মৃত্যু ঘটতে পারে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদিগকে নির্দেশ দেন যে, তোমরা যেন প্রাপ্য আমানতসমূহ প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দাও। আর যখন তোমরা মানুষের কোনো বিচার-মীমাংসা করতে আরম্ভ করো, তখন মীমাংসা করো ন্যায়ভিত্তিক। আল্লাহ তোমাদিগকে সদুপদেশ দান করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রবণকারী, দর্শনকারী।’ সুরা আন নিসা : ৫৮

দুই পক্ষের মধ্যে ফায়সালা করার ক্ষেত্রে ইনসাফের প্রতি বিশেষ লক্ষ রাখতে হজরত দাউদ (আ.)-কে উদ্দেশ করে বলা হয়েছে, ‘হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি, অতএব তুমি মানুষের মধ্যে ন্যায়সংগতভাবে রাজত্ব করো এবং খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না। তা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে।’ সুরা সোয়াদ : ২৬

আমাদের প্রিয় নবীজি (সা.)-কে উদ্দেশ করে বলা হয়েছে, ‘যদি ফায়সালা করেন তবে ন্যায়ভাবে ফায়সালা করুন, নিশ্চয় আল্লাহ সুবিচারকারীদের ভালোবাসেন।’ সুরা আন নিসা : ৪২

হজরত মুহাম্মদ বিন কাব কুরবি (রা.) বলেন, এক দিন আমিরুল মুমিনিন হজরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ইনসাফ বলতে কী বোঝায়? আমি বললাম এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। শুনুন ইনসাফ হচ্ছে, ক. ছোটদের সঙ্গে পিতৃতুল্য আচরণ, খ. বড়দের কাছে স্নেহময় সন্তান সেজে থাকা, গ. সমবয়সীদের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ে তোলা, ঘ. পরিবারের লোকদের সঙ্গে উত্তম ব্যবহার করা ও ঙ. অপরাধীকে তাদের অপরাধ এবং শারীরিক সামর্থ্য অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া। রাগের বশবর্তী হয়ে একটি বেত্রাঘাতও না করা। অন্যথায় আপনি সীমালঙ্ঘনকারী সাব্যস্ত হবেন। রুহুল মায়ানি : ১৪/৩২০

ইনসাফের মতো গুণে যদি আমরা গুণান্বিত হতে পারি, তাহলে আমাদের ইবাদত-বন্দেগি, লেনদেন, জীবনাচার এবং সামাজিকতা সবকিছু ত্রুটিমুক্ত হবে। সব ধরনের ঝগড়া-ফ্যাসাদ মিটে পৃথিবীতে শান্তির বাতাস বইবে। জান্নাতি পরিবেশ তৈরি হবে। কারণ নিরাপত্তার চাবি কাঠিই হচ্ছে ইনসাফ।

মুফাসসিরে কোরআন আল্লামা ইবনুল আরাবি বলেন, এক. আল্লাহ এবং বান্দার মধ্যে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার অর্থ হলোআল্লাহর হুকুমকে নিজের মনের চাহিদার ওপর প্রাধান্য দেওয়া। তার সন্তুষ্টিকে নিজের ইচ্ছার ওপর প্রাধান্য দেওয়া। শরিয়তের বিধিবিধানের ওপর অটল অবিচল থাকা এবং গর্হিত কাজ থেকে বেঁচে থাকা।

দুই. নিজের ব্যক্তি সত্তার সঙ্গে ইনসাফের অর্থ হলো, নিজেকে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ এবং আল্লাহর আজাবে নিপতিত হওয়ার কারণ থেকে দূরে রাখা। সর্বাবস্থায় লোভ-লালসার পরিবর্তে শরিয়তের অনুসরণ এবং অল্পে তুষ্টির প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা।

তিন. অন্যদের সঙ্গে ইনসাফের অর্থ হলো, সবার কল্যাণকামিতা, সর্বক্ষেত্রে খেয়ানত এবং আত্মসাৎ থেকে দূরে থাকা, প্রকাশ্যে বা গোপনে কাউকে কষ্ট না দেওয়া এবং কেউ কষ্ট দিলে সবর করা। আল জামে লিআহকামিল কোরআন : ১০/১৫১

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত