পৃথিবীতে বর্তমানে আটশো কোটি মানুষের বসবাস। এর প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষই কোনো না কোনো ধর্মের অনুসারী। অর্থাৎ প্রায় সব মানুষই স্রষ্টায় বিশ্বাসী। হয়তো কারও মধ্যে ধর্মের প্রভাব কম, কারও মধ্যে ধর্মের প্রভাব বেশি। কিন্তু এক কথায় তারা ধর্মে বিশ্বাসী। এ ধারাবাহিকতাই সৃষ্টির আদিকাল থেকে চলে আসছে, বর্তমানে চলছে এবং ভবিষ্যতেও চলবে। ধর্মই নিয়ন্ত্রণ করছে মানুষের সভ্যতা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং জীবনধারা। এই ধর্মই গঠন করেছে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং দেশ। একজন মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সবকিছুই ধর্ম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কেউ যদি না মানে সেটা হচ্ছে ধর্ম থেকে বিচ্যুতি। তাই একজন ব্যক্তি সেক্যুলার হলেও তার বিয়ে এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ধর্মীয় রীতিতেই সম্পন্ন হয়।
সমাজের যা কিছু সত্য, সুন্দর, মহৎ এবং চির কল্যাণকর তার সবই ধর্ম থেকে উৎপন্ন। আর ভিন্ন ধর্মের রীতিনীতি ভিন্ন হলেও, ধার্মিকরা সবাই বিশ্বাস করে এই সৃষ্টিজগতের একজন স্রষ্টা আছেন। তিনিই সবকিছুর সৃষ্টিকারী, লালনকারী এবং পালনকারী। সবাই বিশ্বাস করে যে মৃত্যুর পরে তার কৃতকর্মের জন্য স্রষ্টার কাছে বিচারের মুখোমুখি হবে এবং কৃতকর্মের ফলাফলের ওপর কেউ চির সুখের জান্নাত আবার কেউ চির দুঃখের জাহান্নামে স্থান লাভ করবে। প্রত্যেক ধর্মেই একজন প্রধান ব্যক্তি রয়েছেন যারা এই ধর্মকে ধারণ করেছেন, অনুসরণ করেছেন এবং প্রচার করেছেন। এই সব ব্যক্তি নিজ নিজ ধর্মের অনুসারীদের কাছে অত্যন্ত সম্মানিত এবং পবিত্র। তাই এই সব ব্যক্তির অপমান তাদের অনুসারীদের কেউই সহ্য করতে পারে না। হজরত ঈসা (আ.) যেমন খ্রিস্টানদের কাছে অত্যন্ত সম্মানিত, গৌতম বুদ্ধ যেমন বৌদ্ধদের কাছে অত্যন্ত সম্মানিত, শ্রীকৃষ্ণ যেমন হিন্দুদের কাছে অত্যন্ত সম্মানিত ঠিক তেমনি হযরত মুহাম্মদ (সা.)ও মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত সম্মানিত। আর হযরত ঈসা (আ.)-এর অপমান যেমন কোনো খ্রিস্টান সহ্য করতে পারে না, গৌতম বুদ্ধের অপমান যেমন কোনো বৌদ্ধ সহ্য করতে পারে না, শ্রীকৃষ্ণের অপমান যেমন কোনো হিন্দু সহ্য করতে পারে না, ঠিক তেমনি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অপমানও কোনো মুসলমান সহ্য করতে পারে না। সুতরাং প্রত্যেক মানুষের উচিত তার নিজ ধর্ম এবং ধর্মের সম্মানিত ব্যক্তিদের সম্মান ও শ্রদ্ধা করার পাশাপাশি অপরের ধর্ম এবং ধর্মের সম্মানিত ব্যক্তিদেরও সম্মান করা।
শ্রদ্ধা এবং সম্মান না করলেও কখনোই এবং কিছুতেই অপরের ধর্ম এবং ধর্মের সম্মানিত ব্যক্তিদের অসম্মান, অবজ্ঞা এবং অপমান করা যাবে না। কারণ এতে সমাজের শান্তি, সম্প্রীতি এবং ভালোবাসা নষ্ট হয়। সৃষ্টি হয় অশান্তি, অরাজকতা, হিংস্রতা ও বর্বরতা। যার আগুনে পুড়ে সর্বনাশ হয় সমাজ, ধ্বংস হয় সভ্যতা। সুতরাং এই ধ্রুব সত্যটা জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবারই অনুসরণ করা উচিত এবং করতে হবে।
সবারই মনে রাখা উচিত, ইসলাম ধর্ম তার আপন মহিমায় মহিমান্বিত। ইসলামকে অবমাননা করলে ইসলামের কোনো ক্ষতি হয় না। অপর দিকে ইসলাম এবং মহানবীকে কটাক্ষকারীরা নিজেদেরই ক্ষতি করছে। এদিকে ইসলাম এবং নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে অবমাননার কারণে মুসলমানদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হলেও তাদের ধৈর্য ধারণ করতে হবে এবং কখনো সহিংস হওয়া যাবে না। মুসলমানদের হতে হবে ধৈর্যশীল, সহনশীল এবং ক্ষমাশীল। আবেগের বশবর্তী হয়ে ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না। শুধু তাই নয়, অমুসলমানদের ধর্ম, ধর্মীয় রীতিনীতি এবং তাদের ধর্মের সম্মানিত ব্যক্তিদের কখনোই অবজ্ঞা এবং অসম্মান করা যাবে না- সম্মান করতে হবে।
এ বিষয়ে স্বয়ং আল্লাহতায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন- আল্লাহকে ছেড়ে তারা যাকে ডাকে, তাদের তোমরা গালি দিয়ো না, কেননা তারা সীমালঙ্ঘন করে অজ্ঞানতাবশত আল্লাহকেও গালিস দেবে। -সুরা আনআম : ১০৮
সুতরাং অমুসলিমরা, তাদের ধর্ম, তাদের দেবতা এবং তাদের ধর্মের সম্মানিত ব্যক্তি সবই মুসলমানদের কাছে নিরাপদ। আর মন্দের প্রতিবাদ কখনো মন্দ দিয়ে হয় না। ভালো কাজ দিয়েই মন্দ কাজের প্রতিবাদ করতে হবে। ইসলাম সেটাই শিক্ষা দিয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘মন্দের মোকাবিলা কর যা উত্তম তা দ্বারা।’ -সুরা মুমিনুন : ৯৬
সৃষ্টিকর্তা আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘ভালো কাজ এবং মন্দ কাজ সমান হতে পারে না। মন্দ প্রতিহত করো উৎকৃষ্ট দ্বারা, ফলে তোমার সঙ্গে যার শত্রুতা আছে, সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো।’ -সুরা হামিম সাজদাহ : ৩৪
যেকোনো মূল্যে মুসলমানদের ধৈর্যশীল হতে হবে। মনে রাখতে হবে ধর্ম এবং ধর্মের সম্মানিত ব্যক্তিদের অবমাননা করে একটি গোষ্ঠী সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে চাচ্ছে। সুতরাং ষড়যন্ত্রকারীদের পাতানো ফাঁদে পা দিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করা যাবে না। ইসলাম সাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাস করে না এবং তা সমর্থনও করে না। ইসলাম হচ্ছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং সর্বজনীন মানবাধিকারের গ্যারান্টি।
