যুক্তরাষ্ট্রে দেওবন্দি ধারার সবচেয়ে বড় মাদ্রাসা

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১২:১২ এএম

যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত দেওবন্দি (দারুল উলুম দেওবন্দ, ভারত) ধারার সবচেয়ে বড় মাদ্রাসা হচ্ছে নিউ ইয়র্কের দারুল উলুম আল মাদানিয়া বাফেলো। মাদ্রাসাটির প্রতিষ্ঠাতা ও পৃষ্ঠপোষক শায়খুল হাদিস জাকারিয়া কান্ধলভি (রহ.)-এর খলিফা ডা. ইসমাইল মাইমান মাদানি। এখানে দারুল উলুম দেওবন্দের সিলেবাসকে আমেরিকার মূলধারার সিলেবাসের সঙ্গে সমন্বয় করে পড়ালেখা করানো হয়। অর্থাৎ মাদ্রাসার সিলেবাসের পাশাপাশি দারুল উলুম ও তার শাখাসমূহে স্কুল-কলেজের সিলেবাস পড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রতিটি ছাত্র দাওরায়ে হাদিস পাস করার পাশাপাশি দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সমাপ্ত করে। এই মাদ্রাসা থেকে প্রতি বছর প্রচুর শিক্ষার্থী কোরআনের হাফেজ ও আলেম হচ্ছেন। এখানে থাকা-খাওয়াসহ সব ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে।

১৯৮৬ সালে কানাডার ওয়াটারলুতে বসবাসের সময় ডা. ইসমাইল মাইমান ও তার ছেলে শায়খ ইব্রাহিম মাইমান মাদানি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার জন্য বাড়ি খুঁজতে থাকেন। ১৯৮৯ সালে নিউ ইয়র্কের ডানকার্কে, ১৯৯০ সালে বাফেলোর ডজ স্ট্রিটে, ১৯৯১ সালে পূর্ব অরোরার নর্থ ডেভিস রোডে, ১৯৯২ সালে নিউ ইয়র্কের হামবুর্গে, ডাউনটাউন বাফেলোর সিকামুর স্ট্রিটে বাড়ি কেনার চেষ্টা করেন। কিন্তু স্থানীয়দের বিরোধিতা ও প্রশাসনের যথাযথ অনুমতি না পাওয়াসহ নানা কারণে বাড়ি কেনা সম্ভব হয়নি। অবশেষে ১৯৯৩ সালে পোলিশ ন্যাশনাল ক্যাথলিক চার্চের রোজারি ক্যাথেড্রাল ল্যাঙ্কাস্টারে স্থানান্তরিত হলে তা কিনে মসজিদ এবং মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরে আরও বিভিন্ন স্থানে পরিত্যক্ত কারাগার ও চার্চের জায়গা কিনে মাদ্রাসা ও মসজিদ প্রতিষ্ঠা করা হয় দারুল উলুম মাদানিয়ার তত্ত্বাবধানে।

বর্তমানে মাদ্রাসার প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করছেন পাকিস্তানের মুফতি ফায়সাল আনসারি। এই মাদ্রাসায় দেওবন্দ, ডাবেল, করাচিসহ বিশ্বের নামিদামি প্রতিষ্ঠানের গ্র্যাজুয়েট উস্তাদরা দরস দেন। মাদ্রাসায় ইংরেজি ও উর্দু ভাষায় পাঠদান করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও এখানে আফ্রিকা, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করেন।

জামেয়ার বিশাল একটি গ্রন্থাগার রয়েছে। কোনো মাদ্রাসায় এর চেয়ে বড় আর কোনো গ্রন্থাগার নেই। এখানে প্রায় সব শাস্ত্রের বিরল ও দুর্লভ কিতাবের সংগ্রহ রয়েছে। ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যিদ আসআদ মাদানি (রহ.)-এর সঙ্গে ডক্টর ইসমাইল মাইমানের খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। তার পরামর্শে তিনি এ প্রতিষ্ঠান চালু করেন। দারুল উলুম আল মাদানিয়া বাফেলোর বেশ কটি শাখা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলো হলো

দারুল উলুম কানাডা। এটি পার্শ্ববর্তী দেশ কানাডার চাটামে অবস্থিত। এখানে দাওরায়ে হাদিসের পাশাপাশি মানসম্মত ইফতা বিভাগও রয়েছে।

দারুর রাশিদ। এটি মেয়েদের জন্য প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা। এখানে নিয়মতান্ত্রিকভাবে দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষাদানের ব্যবস্থা রয়েছে। শায়খ আবদুল মুঈয এই মাদ্রাসার শাইখুল হাদিস।

দারুল খালিল। এটি অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেমেয়েদের দ্বীনি শিক্ষার জন্য বিশেষায়িত অনন্য এক বিদ্যাপীঠ। এখানে নির্দিষ্ট ক্লাস পর্যন্ত পড়ালেখা করে ছেলেরা দারুল উলুমে এবং মেয়েরা দারুর রাশিদে ভর্তি হয়।

দারুল ইমদাদ। এটি একটি ইভিনিং গার্লস মাদ্রাসা। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরা বিকেলে এখানে এসে কোরআন-হাদিসসহ নির্দিষ্ট সিলেবাসে পড়ালেখা করেন।

দারুল হিকমাহ বুকশপ। মাদ্রাসার অধীনে পরিচালিত একটি ইসলামিক বুকশপ। এখানে সব ধরনের প্রয়োজনীয় বই-পুস্তক পাওয়া যায়।

মসজিদে জাকারিয়া। এটি বাফেলোর পরিচিত একটি মসজিদ। দারুল উলুমের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। এখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পাশাপাশি আরও কিছু দ্বীনি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সেগুলো হলোক. স্কুল-কলেজের ছাত্রদের প্রতিদিন বিকেলে দ্বীনি ইলম শিক্ষার ব্যবস্থা। খ. সাপ্তাহিক মজলিস। প্রতি সপ্তাহে এক দিন দ্বীনি আলোচনা, এক দিন দরুদের মজলিস এবং প্রতিদিন জিকিরের মজলিস ও কিতাবি তালিম অনুষ্ঠিত হয়। মসজিদ সংশ্লিষ্ট এলাকায় অবস্থিত বাসিন্দাদের আজান শ্রবণ ও দ্বীনি মজলিসগুলোতে নারীদের শরিক করার জন্য ঘরে ঘরে সাউন্ড সিস্টেম লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় মুসলিমদের জন্য মাদ্রাসার অর্থায়নে কবরস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কাফন-দাফন ইত্যাদি মাদ্রাসার ব্যবস্থাপনায় হয়।

নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের উত্তর-পশ্চিমের প্রান্তিক নগরী বাফেলো। প্রায় চার লাখ লোকের শহর বাফেলো আরাম-আয়েশের কারণে অনেকের কাছে জাদুর শহর হিসেবে পরিচিত। নিউ ইয়র্ক থেকে ৩৭৫ মাইল দূরত্বের বাফেলোর আয়তন ৫২ বর্গমাইল। বাফেলো সিটির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে ১৫ মিনিটের মতো সময় ব্যয় হয়। এর কারণ নিরিবিলি এ শহরের কোথাও ট্রাফিক জ্যাম নেই।

বাফেলো শহরে মুসলিম নারী ও মেয়েরা হিজাব মাথায় চলাফেরা করেন। হিজাবের আধিক্যের কারণে এ শহরকে হিজাবের নগরীও বলা হয়। অনেকে বলেন, শহরের ইসলামি পরিবেশ, আইন-কানুনের যথাযথ ব্যবহারের ফলে সন্ত্রাসসহ নানান ভয়ভীতি থেকে মুক্ত এ শহর।

কওমি ধারার মাদ্রাসা ছাড়াও গ্রেটার বাফেলোতে ২০টির মতো ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান নতুন প্রজন্মকে ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যুক্তরাষ্ট্রের পাবলিক স্কুল কারিকুলাম ইসলাম শিক্ষার জন্য যথেষ্ট নয়। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কমিউনিটি স্বতন্ত্র স্কুল প্রতিষ্ঠা করছে। এসব প্রতিষ্ঠান নতুন প্রজন্মকে নিজস্ব ধর্মীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতি শিখতে সহায়তা করে। এসব সাধারণ সিলেবাসের সঙ্গে ইসলামিক কারিকুলাম সংযুক্ত করার পাশাপাশি হিফজুল কোরআনের ব্যবস্থা রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত