পাঠকের মুখোমুখি মোস্তফা মামুন

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১০:৪৪ পিএম

সাংবাদিক নাকি লেখক? মোস্তফা মামুনের এক পরিচয়কে আরেক পরিচয় বিঘ্নিত করে নানাভাবে। তবে সব ছাপিয়ে একজন মোস্তফা মামুন নিখাদ আড্ডাবাজ। গল্প বলে সবাইকে মাতিয়ে রাখতে পারেন তিনি। বন্ধু, সাংবাদিক, লেখক মহলে তার উপস্থিতি মানে জমাট আড্ডা।

পাঠকদের সামনে লেখক রূপে সেই আড্ডাবাজ মামুন ভাইকে পেলাম অনেকদিন পর। শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর হাতিরপুলের ‘ক্যাফে ফাইভ এলিফ্যান্ট’ রেস্টুরেন্টে পাঠকের মুখোমুখি হন সময়ের জনপ্রিয় লেখক, দেশ রূপান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোস্তফা মামুন। তবে তার উপস্থিতি আনুষ্ঠানিকতাকে ভন্ডুল করে তৈরি করে ঘরোয়া আবহ। যেকোনো জায়গাকে নিজের ড্রয়িংরুম বানিয়ে আড্ডায় মেতে উঠতে তার জুড়ি মেলা ভার।

সেই আড্ডায় মোস্তফা মামুনের পাঠকদের উপস্থিতি যেমন ছিল, তেমনই ছিলেন তার ক্যাডেট কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু, প্রাক্তন-বর্তমান সহকর্মীরা। তারাও নিজেদের আলোচনায় তুলে আনলেন চেনা-অচেনা মোস্তফা মামুনকে।

লেখকের তৈরি বিভিন্ন চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন রাখলেন অনেকে। লেখক তার উত্তর দিয়ে গেলেন। পাঠক বলে গেলেন লেখককে নিয়ে তাদের মুগ্ধতার কথা। আক্ষেপের কথা বলতেও দ্বিধা করলেন না অনেকে।

image

মাহফুজ রহমান নামের এক তরুণ ২০১০ সাল থেকে মোস্তফা মামুনের বই নিয়মিত পড়ছেন। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত লেখকের সব বই তার সংগ্রহে আছে বলে জানালেন। তিনি বলছিলেন, ‘আমি আসলে শুধু ফ্যান বললে ভুল হবে, আমি ফ্যান বয়ের মতো। আমার ভাইয়ার মাধ্যমে ‘ক্যাডেট নাম্বার ৫৯৫’ বই দিয়ে মোস্তফা মামুন নামের সঙ্গে পরিচয়। বইটা মুগ্ধ হয়ে পড়েছিলাম। এমনিতে হ্যারি পটার দিয়ে বই পড়া শুরু আমার। ২০১০ সালে বই মেলায় ‘ফ্রেন্ডস ক্লাব টু’ নামের বই আমার হাতে আসে। এরপর ‘ফ্রেন্ডস ক্লাব ওয়ান’ পড়ার পর ধীরে ধীরে মোস্তফা মামুনের সব বই কিনে পড়েছি।’

তার কথার ফাঁকে ফাঁকে বলে উঠছিলেন লেখকও। দুজনের আলাপে জানা গেল, এক পর্যায়ে লেখকের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ হয় এ তরুণের। অটোগ্রাফ নিতে সংগ্রহে থাকা সব বই নিয়ে তিনি হাজির হন লেখকের বাসায়। যা অবাক করেছিল লেখকেও।

মাহফুজ রহমানের মতো মোস্তফা মামুনের সব বই সংগ্রহে রেখেছেন তৌসিয়া ইসলামও। লেখক একবার নিজের একটি উপন্যাস সমগ্র বের করতে গিয়ে দেখলেন, (ওই সমগ্রের) একটা বই তার নিজের কাছেই নেই। পরে সেটি তিনি চেয়ে নেন তৌসিয়া ইসলামের কাছ থেকে।

image

ক্যাডেট কলেজের জীবনের নিয়ে রচিত লেখকের অন্যতম পাঠকপ্রিয় বই- ‘ক্যাডেট নাম্বার ৫৯৫’। যে বইটির পাণ্ডুলিপি প্রথম পড়েন তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু জামাল হোসাইন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তিনিও।

লেখককে নিয়ে জামাল হোসাইন বলেন, ‘মামুন এমনিতে বহুমাত্রিক প্রতিভা। যেটা হয়, বহুমাত্রিক হলে মানুষ সব জায়গায় একটু একটু থাকে। কিন্তু ও যেখানে গেছে, সেখানে নিজের অবস্থান তৈরি করেছে। ক্রীড়া সাংবাদিকতা যখন করত, তখন ক্রীড়া সম্পাদক হয়েছে। এরপর ক্রীড়া সাংবাদিকতা থেকে আরও বিস্তৃতিভাবে শুরু করল। সেই জায়গায় এখন সম্পাদক। আবার যখন লেখক, তখনও সে অসাধারণ।’

লেখকের আরেক ঘনিষ্ঠ বন্ধু জিয়াউর রহমান। ক্যাডেট কলেজ জীবন থেকে এখন পর্যন্ত তাদের বন্ধন অটুট। জিয়াউর রহমান তার বক্তব্যে পাঠকদের সামনে অন্য এক মোস্তফা মামুনকে তুলে ধরেন। যে মোস্তফা মামুন দুরন্ত।

image

ক্যাডেট কলেজে লেখকের দুই ব্যাচ জুনিয়র এহসান হকের বক্তব্যেও মোস্তফা মামুনের দুরন্ত কৈশোরের গল্প উঠে আসে, ‘মামুন ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৮৯ সালে। তখন মামুন ভাই ক্লাস নাইনে পড়তেন। আমি সেভেনে পড়তাম। মামুন ছিলেন খুব দুষ্টু টাইপের ক্যাডেট। যে ক্যাডেটরা নিয়ম-কানুন খুব কম মানে। প্রিফেক্টদের কাছ থেকে শাস্তি বেশি খায় যারা, সেই টাইপের ক্যাডেট ছিলেন মামুন ভাই। দুপুর বেলায় যখন রেস্ট নিতাম, তখন দেখতাম তিনি আমাদের রুমের সামনে দিয়ে শাস্তি খেতে খেতে যাচ্ছেন। প্রচুর শাস্তি খেতেন। শাস্তি খাওয়া লোক হিসেবে চিনতাম তাকে। প্রিফেক্টদের সঙ্গে মাস্তানিও করতেন। এসব আমাদের কাছে হিরোইক মনে হতো।’

সাংবাদিক ফাহিম সাদিকিন বলেন, ‘মোস্তফা মামুন একজন ভালো সাংবাদিক জানতাম। কিন্তু উনি যে এতো ভালো গল্প লেখেন এটা জানি ২০০৬ সালে। মামুন ভাই প্রতি বছর লিখছেন। উনি ‘আনন্দনগর এক্সপ্রেস’ নামে একটি বই লিখেছেন। আমার মনে হয় এটা বাংলাদেশের অন্যতম একটা সেরা বই। প্রতিটা লাইন উনি এত রস দিয়ে লিখতে পারেন। এই জায়গায় এখন বাংলাদেশে তার মতো কেউ আছে বলে আমার মনে হয় না।’

সঙ্গে ফাহিম সাদিকিন আক্ষেপ জুড়ে দেন, ‘উনার বইগুলো এত ভালো বই, এগুলো পাঠকের কাছে সে রকম যাচ্ছে না। আমি মনে করি কথাসাহিত্যিক হিসেবে উনার জনপ্রিয়তা আরও অনেক দূর যাওয়া উচিত।’

লেখকের বন্ধু জামাল হোসাইনও তার সঙ্গে একমত হন, ‘ওর লেখক পরিচয়টাই বেশি বিকাশ হওয়াটা উচিত ছিল।’

image

প্রচ্ছদ শিল্পী মামুন হোসাইনও বলেন একই কথা, ‘এটা আমিও মনে করি। তার লেখক সত্তা সাংবাদিক পরিচয়ের আড়ালে পড়ে গেছে। এত বড় একজন লেখক, কিন্তু ওই অর্থে পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারেননি।’

তবে মোস্তফা মামুন বলেন, ‘এটা নিয়ে আমার খুব বেশি আফসোস নাই। এটা আমি এভাবে দেখি- ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে যে খ্যাতি পেয়েছি, সেটার যোগ্য আমি না। অনেক বেশি খ্যাতি আমি পেয়েছি বলে মনে করি। ওইখানে অনেক বেশি পাওয়ায় মনে হয় লেখালেখিতে কম পেয়েছি। দুইটা বিষয় এখন ব্যালান্স করছে (হেসে)। আমি যেটা মনে করি, আরও বেশি খ্যাতি না, আমার গল্পগুলো আরও বাচ্চাদের কাছে গেলে তারা অনেক বেশি মজা পেত। এটা আমার দুঃখ।’

সাংবাদিক আশরাফুল হক লেখকের কাছে প্রশ্ন রাখেন, ‘আপনি লেখক হিসেবে বেশি তৃপ্তি পান না সাংবাদিক হিসেবে?’ মোস্তফা মামুন উত্তরে বলেন, ‘খুবই কঠিন প্রশ্ন। আমি বলব ৫০-৫০। শেষ পর্যন্ত লেখক হিসেবে লেখার সময়টা খুব ভালো লাগে। তবে সাংবাদিকতা অনেক বেশি মজার। আর নিজে সাংবাদিকতা করা নয়, আমি সবচেয়ে বেশি মজা পাই সাংবাদিকতা করানোয়।’

image

মোস্তফা মামুন কীভাবে তার গল্পের প্লট বা চরিত্রগুলো তৈরি করেন। এসব কৌতূহল ছিল উপস্থিত পাঠকদের। লেখক সেই কৌতূহলও মেটান, ‘আমার কোনো গল্পই আমি আসলে শেষ ভেবে শুরু করি না। আমি প্রথম অধ্যায়টা একদম ফ্রি লিখি। প্রথমে একটা লাইন লিখি। এরপর সেটার সঙ্গে রিলেটেড গল্প বলতে থাকি।’

মোস্তফা মামুন বলেন, ‘আমি মনে করি, আমি গল্প বলতে পারি। মূলত আমি যে গল্পটা সবাইকে বলতে চাই সামনা-সামনি, সেগুলো আমি লিখে প্রকাশ করি। এর চেয়ে বেশি লেখালেখি নিয়ে স্বপ্ন আমার নেই। আমি মনে করি বললে হয়তো পাঁচটা লোক শুনবে। কিন্তু লিখলে হাজার হাজার লোক পড়তে পারবে।’

কবি জুয়েল মোস্তাফিজ বলেন, ‘মামুন ভাইয়ের ন্যারেটিভ এতো দারুণ! বিষয় যাই হোক না কেন, গ্রুমিং করে পাঠকের মগজে তিনি ঢোকাবেনই। তার যে গল্প বলার ভঙ্গি, সেটা তিনি যেভাবে কথা বলেন সেটার মতোই সাবলীল।’

image

সাংবাদিক আনিসুর বুলবুল লেখকের স্ত্রী হুমায়রা ফেরদৌস তানিয়ার কাছে প্রশ্ন রাখেন, লেখক মোস্তফা মামুন ও সাংবাদিক মোস্তফা মামুনকে কীভাবে দেখেন? উত্তরে তানিয়া বলেন, ‘দুইটা পেশাই সমান্তরাল। দুইটা পেশাতেই লিখতে হয়। তবে সাহিত্য লেখার বিষয়টা একদম বিপরীতধর্মী। দুইটা ডোমেন আলাদা। আমার অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয় একটা আরেকটা কমপ্লিমেন্ট করে। কিছু কিছু পেশা আছে যেগুলোতে নিয়মিত অনেক ধরনের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। সমাজের পরিবর্তনগুলো দেখতে হলে সাংবাদিকতাটা দরকার। এটা মনে হয় লেখককে সাহায্য করে।’

তার কথায় লেখকের পরিচয় সংকটের বিষয়টিও উঠে আসে, ‘যে সাংবাদিক হিসেবে চেনে আর যে সাহিত্যিক হিসেবে চেনে, সেখানে একটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়। সাংবাদিকতার পাঠক ও সাহিত্যের পাঠক হয়তো এ ক্ষেত্রে আলাদা হয়ে যায়।’

আড্ডার শুরুতে সঞ্চালকের ভূমিকায় ছিলেন সামীউর রহমান। দেশ রূপান্তরের সাহিত্য সম্পাদক শিমুল সালাউদ্দিনও লেখককে নিয়ে কথা বলেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত