ট্রাফিক পুলিশের নামে মাসে ২২ লাখ টাকা চাঁদাবাজি!

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১১:৫৭ পিএম

ট্রাফিক পুলিশের নামে গোপন ‘কোড নম্বর’ দিয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রায় চার হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও অন্যান্য গাড়ি থেকে মাসে সাড়ে ২২ লাখ টাকা চাঁদাবাজি করা হচ্ছে। এর নেপথ্যে রয়েছে ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শকসহ পরিবহন সংগঠনের নেতা ও ক্ষমতাসীন দলের কেউ কেউ। কথিত লাইনম্যানদের মাধ্যমে এ চাঁদা তোলা হয়। আর এসব লাইনম্যানকে নিয়ন্ত্রণ করেন মোতাহেরুল ইসলাম নামে একজন।

জানা যায়, দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম প্রবেশদ্বার আনোয়ারা উপজেলার চাতরী চৌমুহনী বাজার থেকে এসব গাড়ি আনোয়ারাসহ চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, লোহাগড়া, বাঁশখালী, চকরিয়া, পেকুয়া ও মহেশখালী উপজেলার বিভিন্ন স্থানে যাত্রী নিয়ে আসা-যাওয়া করে। মূলত এই চাতরী চৌমুহনী পর্যন্ত অটোরিকশা আনতে মাসে ৫০০ টাকা চাঁদা দিয়ে একটি কোড নম্বর নিতে হয় চালকদের। ওই পথ দিয়ে চলাচলকারী ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান থেকেও মাসে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা চাঁদা নেওয়া হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চাতরী চৌমুহনী ট্রাফিক পুলিশের হয়ে মোতাহের নামের এক ব্যক্তি ৬ থেকে ৭ জন লাইনম্যানের মাধ্যমে মাসিক চাঁদার বিনিময়ে গোপন ‘কোড নম্বর’ বিক্রি করেন। চালকরা ওই লাইনম্যানদের কাছ থেকে প্রতি মাসের ১ থেকে ১০ তারিখের মধ্যে টাকা দিয়ে ‘কোড নম্বর’ সংগ্রহ করেন। নির্ধারিত এই সময়ের মধ্যে যারা কোড নম্বর কেনেন না, তাদের গাড়ি আটকাতে রীতিমতো অভিযান চালান ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা। ওই সময় কোড নম্বর দেখাতে না পারলে নানা অজুহাতে চালককে মামলা ধরিয়ে দেওয়া হয়।

চালকদের দেওয়া তথ্যমতে, চাতরী চৌমুহনী বাজার হয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামের তিন হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা যাত্রী নিয়ে আসা-যাওয়া করে। সে হিসাবে তিন হাজার অটোরিকশা থেকে মাসে ৫০০ টাকা করে ১৫ লাখ টাকা। ৫০০টি মিনিট্রাক থেকে মাসে ৫০০ টাকা করে দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা। আর ৩০০টি ড্রাম ট্রাক ও ২০০টি কাভার্ডভ্যান থেকে মাসে এক হাজার টাকা করে ৫ লাখ টাকা। সবমিলিয়ে মাসে সাড়ে ২২ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়।

জানা যায়, এই চাঁদার টাকায় গোপনে পকেট ভারী হয় পুলিশ, কথিত লাইনম্যান ও শ্রমিক সংগঠনের প্রভাবশালী নেতাদের। ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতাও এর ভাগ পান। পরিবহন শ্রমিক-মালিকদের অনেকেই বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে তারা এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করে ঝামেলায় পড়তে চাননি।

একাধিক অটোরিকশা চালকের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, মাসিক চাঁদার বিনিময়ে ‘কোড নম্বর’ নিলে পুরো মাস চলে।

জানতে চাইলে চাঁদা তোলার সঙ্গে জড়িত মোতাহেরুল ইসলাম জানান, ‘তিনি গত এক মাস ধরে চাঁদা আদায়ের কাজে জড়িত নেই। এখন কারা চাঁদা তুলছে সে বিষয়ে জানাতেও রাজি হননি।’

দুইজন কথিত লাইনম্যানের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘প্রতিটি অটোরিকশা থেকে মাসিক ৫০০ টাকা চাঁদা নেওয়া হয়। চাঁদার টাকা পুলিশের লোককে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। যেহেতু বেশিরভাগ গাড়ির কাগজপত্র ঠিক থাকে না। এমনকি অনেক চালকের লাইসেন্সও নেই। ট্রাফিক পুলিশের আইনি জটিলতা থেকে রেহাই পেতে চালকরা এই চাঁদা দেন।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চাতরী চৌমুহনী ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক (টিআই) হাফিজুল ইসলাম চাঁদার বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে তিনি চন্দনাইশে বদলি হয়ে যাওয়ার কথা জানান। চাতরী চৌমুহনী ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট নুর আলম বলেন, ‘এখানে আমার পোস্টিং হয়েছে কয়েকদিন হয়। চাঁদা আদায়ের বিষয়ে আমার জানা নেই।’

চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) এ এন এম ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, ‘চাঁদা তোলার বিষয়ে আমি অবগত নই। বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তবে তিনি নিউজটি না করার অনুরোধ করেন। কিছুক্ষণ পরে এ প্রতিবেদককে ফোন করে নিউজটি না করার জন্য আবারও অনুরোধ জানিয়ে অফিসে যেতে বলেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত