চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি বেসরকারি অক্সিজেন প্ল্যান্টে বিস্ফোরণের রেশ কাটতে না কাটতে ঢাকার সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে একটি ভবনে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে প্রাণ হারান তিনজন। এর দুদিন পর মঙ্গলবার বিকেলে পুরান ঢাকার সিদ্দিকবাজারে বহুতল ভবনে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে তিনটি বিস্ফোরণের ঘটনায় সারা দেশেই এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। সন্দেহের দানা বাঁধছে জনমনে।
এমনকি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আশঙ্কা করছে ‘অন্য কিছুর’। প্রাথমিকভাবে গ্যাস বিস্ফোরণের কথা বললেও এর পেছনে অন্য কিছু আছে কি না সেটাও সন্দেহের মধ্যে আনা হচ্ছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরাও অন্য কিছু অর্থাৎ নাশকতার বিষয়টি উড়িয়ে দিচ্ছেন না। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপি নেতারাও বিস্ফোরণগুলো নাশকতা কি না তদন্ত করতে বলেছেন। এ নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছে পুলিশ-র্যাবসহ সবকটি গোয়েন্দা সংস্থা।
এদিকে ঢাকাসহ সারা দেশে পুরনো ভবনের তালিকা করার নির্দেশ দিয়েছে সরকারের হাইকমান্ড। ম্যানহোল ও গ্যাসের পাইপগুলো সঠিক সময়ে যাচাই-বাছাই করা হয় কি না সেই বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। যারা দায়িত্বে অবহেলা করেছেন বা করছেন তাদের আইনের আওতায় আনতে বলা হয়েছে। নির্দেশনা পেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাজউক ও সিটি করপোরেশন কাজ শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে বিস্ফোরণের পর সারা দেশে এসি সার্ভিসিং করার হিড়িক পড়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, শীত মৌসুমে অনেকে এসি বন্ধ রাখেন, আবার গরম পড়া শুরু করলে চালু করেন। এতে হঠাৎ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এ জন্য সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশীদ গতকাল বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিস্ফোরণের পেছনে আরও অন্য কিছু আছে কি না তা গভীরে গিয়ে তদন্ত করতে হবে। ঘটনাস্থলে কোনো ধরনের উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক মজুদ ছিল কি না তাও খতিয়ে দেখা উচিত। কোনো জিনিসই হালকাভাবে দেখলে হবে না। মিথেন গ্যাস জমে এত বড় বিস্ফোরণ ঘটেছে তা মানতেও পারছি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে ৮-৯ মাস পর কিন্তু সংসদ নির্বাচন। এ সময়টিকে সামনে রেখে কোনো অপশক্তি এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে কি না তাও খতিয়ে দেখা উচিত। বিস্ফোরণের বিষয়টি সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত জনমনে আতঙ্ক থাকবেই। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আছে।’
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিনটি বিস্ফোরণের ধরন একই। হঠাৎ বিস্ফোরণ হওয়ার পর ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। একই ধরনের বিস্ফোরণ হওয়ায় সবাই সন্দেহের চোখে দেখছে। বিশেষ করে পুরান ঢাকার সিদ্দিকবাজারে বিস্ফোরণের পর টনক নড়ে প্রশাসনের। এ নিয়ে গতকাল পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠক করেছেন। তারা বিস্ফোরণের ঘটনাগুলোকে ‘অন্য কিছ’ু মনে করছেন। সে কারণে ঘটনাগুলোর আরও গভীরে গিয়ে তদন্ত করার সিদ্ধান্ত হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একই ধরনের বিস্ফোরণ ঘটায় বেশি সন্দেহ হচ্ছে। আমরা প্রাথমিক অবস্থায় মনে করছি গ্যাস জমাট বাঁধার কারণে বিস্ফোরণ হয়েছে। আসলেই বিস্ফোরণগুলো “অন্য কিছু” মনে হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘সরকারের হাইকমান্ড থেকেও আমাদের কাছে নির্দেশনা এসেছে, অন্য কোনো কারণে বিস্ফোরণ হয়েছে কি না খুঁজে দেখতে। আবার এও বলা হয়েছে, যদি গ্যাস থেকে বিস্ফোরণ হয়ে থাকে তাহলে রাজউক ও সিটি করপোরেশন এতদিন কী করেছে? তাদের বিষয়টিও খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের নিয়ে পুরনো ভবনগুলোর তালিকা করতে বলা হয়েছে। হাইকমান্ডের নির্দেশনা পেয়ে পুলিশের সব ইউনিট প্রধানদের বার্তা দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া সবকটি গোয়েন্দা সংস্থাও বিস্ফোরণ নিয়ে তদন্ত করছে।’
ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সায়েন্স ল্যাবরেটরি ও সিদ্দিক বাজারের ঘটনা আমরা গভীরে গিয়ে তদন্ত করছি। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে গ্যাস থেকে বিস্ফোরণ হয়েছে। তারপরও অন্য কোনো ঘটনা আছে কি না তাও উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।’
একই ধরনের কথা বলেছেন র্যাব মহাপরিচালক এম খুরশীদ হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিস্ফোরণের প্রতিটি বিষয় তন্নতন্ন করে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে কোনো ধরনের বিষয়টি বাদ দেওয়া হবে না।’
দুটি গোয়েন্দা সংস্থার দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, চট্টগ্রাম ও ঢাকায় বিস্ফোরণের ঘটনা শুধু গ্যাসের কারণে হয়েছে তা মানতে পারছেন না তারা। এর পেছনে অন্য কিছু আছে বলে তারা মনে করছেন। কয়েকটি বিষয় মাথায় রেখে তারা তদন্ত শুরু করেছেন। পাশাপাশি পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসও কাজ করছে।
উত্তরা, মগবাজার, বাংলা মোটরসহ কয়েকটি এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা দেশ রূপান্তরকে জানান, বিস্ফোরণের ঘটনায় তারা আতঙ্ক বোধ করছেন। সরকারের উচিত বিষয়গুলো মনিটরিং করা। যদি গ্যাসের কারণে এত বড় বিস্ফোরণ হয়ে থাকে তাহলে এতদিন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও সিটি করপোরেশন কী করেছে? ম্যানহোল বা পুরনো ভবনগুলোর কী অবস্থা তার কোনো মনিটরিং করে না এ দুটি সংস্থা। আগে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি অন্য কোনো কারণে বিস্ফোরণ ঘটেছে কি না তাও তদন্ত করতে হবে।