২৫ মার্চ কালরাত

রওশন আরার ১৩টি গুলি লেগেছিল

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০২৩, ১১:৩৬ পিএম

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অপারেশন সার্চলাইটের নির্ধারিত লক্ষ্যস্থলগুলোর মধ্যে প্রধানতম ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ভয়াল রাতে তৎকালীন ইকবাল হল (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল), জগন্নাথ হলসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে আক্রমণ করে নির্বিচারে গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায় তারা। হানাদার বাহিনী বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার একমাত্র ছাত্রীনিবাস রোকেয়া হলের স্টাফ কোয়ার্টারেও গণহত্যা চালায়। অত্যন্ত নৃশংস এই আক্রমণে হলের ৭ জন কর্মচারী ও তাদের আত্মীয়স্বজনসহ মোট ৪৫ জন শহীদ হন। তবে হলের হাউজ টিউটরের সহযোগিতায় ওই রাতে হলে থাকা ৭ জন ছাত্রী ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান।

কালরাতে রোকেয়া হলে গণহত্যার শিকার হন তৎকালীন কিশোরী রওশন আরার পরিবার। ১৯৭১ সালে রওশন আরার বাবা নেওয়াজ আলী ছিলেন রোকেয়া হলের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী (পিয়ন)। ২৫ মার্চ রাতে বাবা নেওয়াজ আলী, মা ছামিরুন্নেসা, ভাই তোফায়েল আহম্মেদ ও সাদেক আলী এবং বড় বোন হাসিনা হাফিজের সঙ্গে হলের স্টাফ কোয়ার্টারের বাসায় ছিলেন কিশোরী রওশন আরা। রাত ১২টার দিকে স্টাফ কোয়ার্টারে ঘরের দরজা ভেঙে এলোপাতাড়ি গুলি চালায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। ঘটনাস্থলেই শহীদ হন রওশন আরার মা এবং দুই ভাই। রওশন আরার শরীরের বিভিন্ন অংশে ১৩টি গুলি লাগে। শরীরে এত গুলি লাগার পরও অবিশ্বাস্যভাবে বেঁচে যান তিনি। তার বড় বোন হাসিনা এবং বাবা নেওয়াজ আলীও গুলিবিদ্ধ হন। তারা দুজনও ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান।

স্বাধীনতার পর আহত রওশন আরার বিয়ে হয় নারায়ণঞ্জের বক্তাবলী গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশীদের সঙ্গে। সেখানে তার ৩ ছেলে ও এক মেয়ে হয়। ২৫ মার্চ রাতে আহত বাবা নেওয়াজ আলী ও বড় বোন হাসিনা হাফিজ স্বাধীনতার অনেক পরে মারা যান, রওশন আরাও আর নেই। ২০১৯ সালের ২ জুলাই তিনি স্বামীর বাড়ি নারায়ণগঞ্জের বক্তাবলীতে মারা যান। রওশন আরার স্বামী মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশীদ মারা যান ১৯৯৮ সালে। এরপর তার ছেলেমেয়েরা রওশন আরাকে দেখভাল করতেন।  রওশন আরার মৃত্যুর আড়াই মাস আগে ১৯ এপ্রিল ২০১৯, নারাণগঞ্জের বক্তাবলীতে গিয়ে লেখক কর্তৃক তার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দ্বারা শরীরে বিদ্ধ ১৩টি গুলির ক্ষতের প্রভাব তখনো এত তীব্র ছিল যে– এ নিয়ে তিনি কথা বলতে প্রথমে রাজি হননি। পরে লেখকের অনুরোধ এবং তার দুই ছেলের প্রচেষ্টায় স্মৃতিচারণ করেন রওশন আরা।

২৫ মার্চে রাতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জিজ্ঞেস করলে রওশন আরা কিছুক্ষণ চুপ থাকেন। দুই/এক লাইন বলেন। আবার চুপ হন। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকান। চোখ ভিজে ওঠে তার। তারপর বড় নিঃশ্বাস ফেলেন। বলতে থাকেন, ভয়াবহ সেই অভিজ্ঞতার কথা। কাঁপা গলায় রওশন আরা বলেন, ‘১৯৭১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে নীলক্ষেত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫ম শ্রেণিতে পড়তাম। বড় বোন হাসিনা পড়ত দশম শ্রেণিতে। ২৫ মার্চ রাতে আমরা দুই বোন একসঙ্গে ঘুমাই। রাত ১২টার দিকে চারদিকে গুলির শব্দ, চিৎকার শুনি। আমরা ভয়ে ঘুম থেকে উঠে যাই। হঠাৎ আর্মি বাসার দরজা লাথি দিয়ে ভেঙে ফেলে। এরপর খালি গুলি আর গুলি। বাবা-মাকে ডাক দেওয়ারও সময় পাই নাই। শরীরে এমনভাবে গুলি পড়ল, মনে হয় ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছি। বাবার শরীরে দুইটা গুলি লাগে। বড় বোন হাসিনার দুইটা। মায়ের বুকে গুলি লেগে পেছন দিয়ে মাংস বেরিয়ে যায়। দুই ভাইয়েরও গুলি লাগে। পুরো বাসায় রক্ত আর রক্ত। আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। এরপর রাতে কী হয়েছে– কিছুই কইতে পারি না।’

জ্ঞান ফিরে কখন? জানতে চাইলে রওশন আরা আবার চুপ হন। এরপর চোখের জল গাল বেয়ে নামতে থাকে তার। প্রশ্নটি কয়েকবার করার পর বলেন, ‘জ্ঞান ফিরে পরের দিন শুক্রবার। চোখ খুলে খালি কই মা, পানি দাও। মা, পানি দাও। কিন্তু মা তো পানি দেয় না। দেখি কি– মা ও দুই ভাই শেষ। নড়েচড়ে না, মইরা গেছে। আমি তো পা নড়াইতে পারি না। পরে কে যেন এসে আমাকে পানি খাওয়ায়। আমাদের বাসার পেছন দিয়া পুকুর ছিল। বাবা কীভাবে যেন বের হয়ে পুকুরের পাড় দিয়ে হলের প্রভোস্ট আখতার ইমামের বাসায় যান। আমরা কোয়ার্টারের বাসায়ই পড়ে থাকি।’

২৭ মার্চ ১৯৭১ সকালে কয়েক ঘণ্টার জন্য কারফিউ শিথিল করে হানাদার বাহিনী। কিছু মনে পড়ে? এই প্রশ্নের পর বলতে শুরু করেন আবার, ‘হ্যাঁ, এরপর কিছু লোক আসে। এসে বলে, ভেতরে কেউ বেঁচে আছেন, ভেতরে কেউ বেঁচে আছেন? বলে ডাকে। আমাকে ও হাসিনাকে বাঁশের মাচায় ওঠায় তারা। এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজে নিয়ে ভর্তি করে। এর আগে মা ও দুই ভাইয়ের লাশ আর্মিরা নিয়ে যাইতে দেখছি। আর কিছু জানি না।’

রোকেয়া হলে গণহত্যার শিকার ৪৫ নারী-পুরুষকে ২৬ মার্চ তৎকালীন হল অফিসের সামনে (বর্তমানে শামসুন্নাহার হলে গেটসংলগ্ন স্থান) মাটি চাপা দেয় হানাদার সেনারা। রওশন আরা ও তার বড় বোন হাসিনা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন অনেকদিন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যখন তার বাবা নেওয়াজ আলীকে চিঠি দেন যে, কাজে যোগ না দিলে চাকরি থাকবে না– তখন দুইবোনকে নারায়ণগঞ্জে খালার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন বাবা। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জেই ছিলেন মারাত্মকভাবে আহত রওশন আরা ও হাসিনা। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, শেষ হয় যুদ্ধ। ত্রিশ লাখ শহীদের প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। কিন্তু রওশন আরার যুদ্ধ শেষ হয়নি। শরীরের ১৩টি গুলির ক্ষত ও এর প্রভাবে ২ জুলাই ২০১৯, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ব্যথা-যন্ত্রণা নিয়ে কাটত তার প্রতিদিন, প্রতি রাত। শরীরের সঙ্গে তিনি যুদ্ধ করেছেন ৪৮ বছর। গুলির তোপে ডান হাতের একটি আঙুল কোনো রকমে ঝুলে ছিল। বাকি আঙুলগুলোও ছিল বাঁকা। গুলির দাগ ছিল উরুতে, কোমর ও তলপেটে।  মৃত্যুর আগের কয়েক বছর রওশন আরা একা একা চলাফেরা করতে পারতেন না। উঠে দাঁড়াতে-বসতে-শুতে অন্য কারও সাহায্য লাগত। সাক্ষাৎকার গ্রহণকালে একাত্তরের দুঃসহ নির্মমতার শিকার রওশন আরাকে যখন সবশেষ প্রশ্ন করা হয়, আপনার কোনো চাওয়া আছে? উত্তরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘না, কিছুর দরকার নাই।’

লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত