প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী প্রায় বারো কোটি মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে, অস্বাস্থ্যকর পয়ঃনিষ্কাশন এবং অপরিষ্কার পানির কারণে। পঞ্চাশ হাজার অকালে প্রাণ হারায়। বলা হয়, তাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার। এর সঙ্গে যোগ হবে স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশনের ফলে পানি দূষিত হওয়ার জন্য অতিরিক্ত ক্ষতি দেড় বিলিয়ন ডলার। অস্বাস্থ্যকর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি হচ্ছে পানি, পয়ঃনিষ্কাশন এবং স্বাস্থ্যগত সুবিধায় প্রবেশগম্যতা বা সুযোগ না থাকার অভাবে, প্রতিদিন পৃথিবীতে পাঁচ বছরের নিচে বয়স এমন আটশো শিশু মারা যায় প্রতিরোধ্য ডায়রিয়া সম্পর্কিত রোগে। সুতরাং, নগণ্য একটা শৌচাগার বা টয়লেট আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে অনেক প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্র জানায়, ভারতের মোট খানার প্রায় অর্ধেকের জন্য শৌচাগার সুবিধা নেই এবং তারা খোলা জায়গায় মলমূত্র ত্যাগ করে। এর বিপরীতে পরিসংখ্যান হচ্ছে, চীনে এক শতাংশ এবং বাংলাদেশে দশ শতাংশ খোলা জায়গায় মলমূত্র ত্যাগ করে। খোদ দিল্লি শহরে ফ্ল্যাট বা এপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের অনেক পরিকল্পনা করা হয়, কিন্তু এগুলোর কোনোটাই কাজের লোকদের জন্য পায়খানা নিয়ে নয়। পুরুষের কথা থাক, সারা দিন চেপে রেখে একমাত্র রাতের অন্ধকারে, সব নিরাপত্তাহীনতা সঙ্গে নিয়ে নারীদের নিজেকে ভারমুক্ত করতে হয়।
দুই
স্বভাবতই ভারতে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতিকরণকল্পে সরকারি প্রচারের অন্যতম অংশীদার হচ্ছে ২০১৭ সালে হিন্দি ভাষায় নির্মিত একটা হাসির সিনেমা ‘টয়লেট : এক প্রেম কথা’। সংক্ষেপে এর বক্তব্য নিম্নরূপ :
ভারতের উত্তর প্রদেশের নন্দগাঁও নামে এক গ্রামের একদল নারী খুব ভোরে গ্রাম থেকে দূরে ঝোপজঙ্গল ঘেরা উন্মুক্ত জায়গায় গিয়ে পায়খানার কাজটি করে। কেসভ (অক্ষয় কুমার) নামে এক যুবক দেখা পায়, জয়া (ভুমি পেদনেকার) নামে কলেজে পড়ুয়া ছাত্রীর। অবশেষে প্রেমে পড়ে সে এবং তাকে বিয়ে করার জন্য মেয়েটির মধ্যে বিশ্বাস সৃষ্টি করে। শেষমেশ বিয়ে হয়। কিন্তু কেসভের বাড়িতে, প্রথম সকালে মেয়েটি অনিচ্ছাকৃতভাবে মাঠে যায় মলত্যাগ করতে! কিন্তু কাজ না সেরেই উত্তেজিত অবস্থায়, বাড়ি এসে বরের ওপর অভিযোগ নিয়ে চড়াও হয়। কেসভ মেয়েটিকে যতই বুঝায়, টয়লেটের সংকল্পবদ্ধ দাবি থেকে সরে আসতে- মেয়েটি ততই টয়লেটের দাবিতে অবিচল থাকে। ইতিমধ্যে নানা কৌশলে জয়ার দাবি মেটানোর চেষ্টা চালায় নায়ক। কিন্তু বাড়িতে টয়লেট নির্মাণের বাস্তব পদক্ষেপ দেখা যায় না। একদিন ট্রেনের টয়লেটে আটকে পড়ে জয়া। তখন ট্রেনটি স্টেশন ছেড়ে দেয়। উত্তেজিত এবং ক্ষুব্ধ জয়া, কেসভকে ছেড়ে পিতামাতার বাড়িতে ফিরে আসে।
এবার জয়া কেসভের বাড়িতে টয়লেট না থাকাটা প্রধান কারণ হিসেবে দেখিয়ে, আদালতে তালাক নেওয়ার আবেদন জানায়। এমন অদ্ভুত পিটিশন খুব তাড়াতাড়ি খবরের কাগজে শিরোনাম হয়ে ওঠে। রাজনীতিবিদ এবং সরকারি কর্মকর্তারা উঠেপড়ে লেগে যান, কেসভের গ্রামে টয়লেট নির্মাণের জন্য। কিন্তু কেসভের বাবা কিছুতেই বাড়িতে টয়লেট না বসানোর ব্যাপারে অবিচল থাকলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।
তবে একদিন তিনি টয়লেট নির্মাণে রাজি হলেন, যখন তার স্ত্রী (অর্থাৎ কেসভের মা) উন্মুক্ত জায়গায় পায়খানা করতে যাওয়ার প্রাক্কালে, দোরগোড়ায় পড়ে কোমরে আঘাতের কারণে চিৎকার করে বলতে থাকেন যে- খোলা জায়গায় যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয় এবং বাড়ির সামনে কেসভ যে টয়লেট বানিয়েছে, সেটা তিনি ব্যবহার করতে চান। অবশেষে, কেসভের বাবা অনুভব করলেন একটা বাড়িতে বা খানায় টয়লেট থাকা কত গুরুত্বপূর্ণ এবং কেসভের মাকে ধরে ধরে টয়লেটে পৌঁছে দিলেন।
জয়া, কেসভের তালাক কেসের শুনানির দিন- বিচারক মুখ্যমন্ত্রীর অফিস থেকে আসা একটা চিঠি মারফত জানতে পারেন, তালাকের মামলা যেন খারিজ করা হয়। কারণ আগামীকাল থেকে ওই গ্রামে টয়লেট নির্মাণ শুরু হবে। আদালত থেকে কেসভ এবং জয়া একসঙ্গে আনন্দে বেরিয়ে আসে, কেসভের বাবা নিজের গোঁয়ার্তুমির জন্য জয়ার কাছে ক্ষমা চান।
তিন
অমর্ত্য সেন স্বয়ং স্বীকার করেছেন, স্যানিটেশন দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে ভালো অবস্থানে আছে। ‘ভারতের তুলনায় বাংলাদেশ অনেক গরিব এবং তা সত্ত্বেও মাত্র আট শতাংশের টয়লেটের সুযোগ নেই। এটা ভারতের ভুল উন্নয়ন। একটা ডেভেলপমেন্ট মডেলের কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে যা, লাখ লাখ সুস্থ জীবন নিশ্চিত করে এমন স্যানিটেশন সিস্টেম না করে, বিলাসবহুল শপিং মল বানায়। ভারত অদ্ভুত এক প্যারাডক্সের জালে আটকা। মানুষের মোবাইল ফোন আছে, কিন্তু টয়লেট নেই!’ কোনো সন্দেহ নেই যে- গ্রামে টয়লেটের ব্যবস্থা এবং স্যানিটেশন সিস্টেম নিয়ে, ভারত আজ যা চিন্তা করছে, বাংলাদেশ করেছে গতকাল- ব্রাভো বাংলাদেশ।
কিন্তু, ইউনিসেফ মনে করে, খোলা স্থানে মলমূত্র ত্যাগের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটলেও ‘স্যানিটেশন মই’ বেয়ে ওপরে ওঠা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ : (ক) গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মাত্র প্রায় ষাট ভাগ মানুষ সাবান এবং পানি দিয়ে হাত ধোয়; (খ) প্রতি পাঁচটি খানার মধ্যে মাত্র দুটি খানা শিশুদের মল স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে পরিত্যাগ করে যেখানে এর তাৎপর্য হতে পারে পীড়া এবং শিশুমৃত্যু; (গ) যদিও প্রায় মোট স্কুলের চার-পঞ্চমাংশে টয়লেট আছে, মাত্র ২৪ ভাগ উন্নত এবং পরিষ্কার এবং মাত্র ৪৫ শতাংশের তালা খোলা; (ঘ) শারীরিক প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়েদের জন্য স্যানিটেশন সুযোগের অভাব এবং ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে পয়ঃনিষ্কাশন সুযোগে ব্যাপক বৈষম্য বিদ্যমান; যেমন বৈষম্য ভূ-অবস্থান ও লিঙ্গভেদে।
চার
অখিল চন্দ্র সেন নামে এক ট্রেনের যাত্রী ১৯০২ সালের জুলাই মাসে- প্রায় ১২০ বছর আগে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের কাছে একটা চিঠি লিখেছিলেন। চিঠির মূল বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল, ট্রেন ভ্রমণের সময় স্বাস্থ্য এবং স্যানিটেশন দুর্ভোগ। পাঠকের জন্য তা হুবহু তুলে ধরা হলো। ভাষার উৎকর্ষ না দেখে, চিঠিটির চেতনা লক্ষ করার জন্য-
Respected Sirs,
I am arrive by passenger train Ahmedpur station and my belly is too much swelling with jackfruit. I am therefore went to privy. Just I doing the nuisance that guard making whistle blow for train to go off and I am running with lotaah in one hand and dhoti in the next when I am fall over and expose all my shocking to man and female women on platform. I am got leaved at Ahmedpur station. This too much bad, if passenger go to make dung that dam guard not wait train five minutes for him. I am therefore pray your honour to make big fine on that guard for public sake. Otherwise I am making big report to papers.
Your faithful Servant,
Okhil Chandra
পাঁচ
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা দরকার যে, অখিল চন্দ্রের চিঠিটি ফার ইস্টার্ন রিভিউ পত্রিকা ছেপেছিল এবং এখনো দিল্লিতে রেলওয়ে জাদুঘরে তা রক্ষিত আছে। বলা হয়ে থাকে যে, ট্রেনে টয়লেটের ব্যবস্থা ওই চিঠির পর থেকে। অখিল চন্দ্রের এই চিঠি লেখা হয়েছিল, ১২০ বছর আগে। কিন্তু তারপর প্রশংসনীয় অর্থনৈতিক অগ্রগতি সত্ত্বেও ভারতের শৌচাগার ব্যবস্থা খুব একটা বদলায়নি। অবস্থা এমন নাজুক যে, অমর্ত্য সেন ভারতের বাম দলগুলোকে সবচেয়ে দরিদ্রের স্যানিটেশন এবং অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজনের দাবি তুলতে বলেছেন, খাদ্য নিরাপত্তা ও এলপিজির দাম বৃদ্ধির ব্যাপার তো আছেই।
লেখক: অর্থনীতিবিদ। সাবেক উপাচার্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
