ওষুধ ও পরীক্ষা-নীরিক্ষায় ‘গিনিপিগ’

আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৪৭ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সূত্র মতে, শুধু ১৯৭৮ সালে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১৫ লাখ রোগী সুস্থ হওয়ার জন্য ওষুধ খেয়ে মৃত্যুবরণ করেন। সমীক্ষায় দেখা যায়, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৩০ শতাংশ রোগী ওষুধ খেয়ে আরও রোগাক্রান্ত হয়। ১৯৯০ সালে পরিচালিত এক জরিপে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর ওষুধের কারণে ১ লাখ ৮০ হাজার মানুষ মারা যায়। এসব মৃত্যুর কারণ, ‘প্রেসক্রিপশন ড্রাগ’ বলে জানা যায়। উপরে উল্লিখিত মৃত্যুর সংখ্যা বাদ দিলে, ওষুধের কারণে এমন লাখ লাখ লোক মৃত্যুবরণ করছেন- যার হিসাব রাখা হয় না। ওষুধের কারণে কেন মানুষ এত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বা মৃত্যুবরণ করছে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা চিন্তায় পড়েছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা মনে করেন, ওষুধের কারণে মৃত্যু বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পেছনে কাজ করছে চিকিৎসক ও রোগী কর্তৃক ভুল ওষুধ প্রয়োগ বা গ্রহণ। প্রশ্ন আসে, ক্ষতিকর ওষুধ কীভাবে বাজারে আসে? মনে রাখা দরকার, বিশ্বের বহুজাতিক কোম্পানিগুলো ভুয়া ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, ভুয়া বিজ্ঞাপন, অনিরাপদ উৎপাদন পদ্ধতি, কালোবাজারি এবং ঘুষের মাধ্যমে নিরাপত্তাজনিত আইন-কানুন অবজ্ঞা করে, ওষুধ উৎপাদন বা বাজারজাত করার সুযোগ পায়। ওষুধের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা অত্যাবশ্যকীয় ও বাধ্যতামূলক। কিন্তু দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে তারা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায়। ওষুধ কোম্পানিগুলো দুর্নীতিবাজ গবেষকদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে, ওষুধের কাক্সিক্ষত গুণাবলি উল্লেখ করে গবেষণা প্রবন্ধ লিখতে উদ্বুব্ধ করে। ওষুধের ওপর এ ধরনের গবেষণার মাধ্যমে, কোনো কোনো গবেষক বছরে মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত উপার্জন করেন। এ ধরনের গবেষণার কাজে, অত্যন্ত গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয় বলে বাইরের কেউ এসব অনৈতিক ও ভুয়া বা অপর্যাপ্ত ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের কথা জানে না। ওষুধ পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য, প্রাথমিক পর্যায়ে মানবদেহের পরিবর্তে জীবজন্তু ব্যবহার করা হয়। জীবজন্তুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও বিভিন্ন সিস্টেমের সঙ্গে মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও কার্যাবলি, অধিকাংশ মেটাবলিক ক্রিয়া-কর্মের সাদৃশ্য রয়েছে। ফলে প্রাথমিক পর্বের পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলো জীবজন্তুর ওপর চালানো হয়। মনে রাখা দরকার, এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সুস্থ স্বাভাবিক জীবজন্তু ব্যবহার করা হয় না। সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবজন্তুকে কৃত্রিম উপায়ে অসুস্থ করা হয় ওষুধ প্রয়োগের পূর্বে। সমস্যা হলো কৃত্রিম উপায়ে জীবদেহে রোগ তৈরি করে ওষুধ পরীক্ষা করা হলে মানবদেহে লাইফস্টাইল বা খাদ্যাভ্যাসের কারণে সৃষ্ট রোগে ব্যবহৃত ওষুধের সমতুল্য কার্যাবলি নাও দেখাতে পারে। অনেকক্ষেত্রেই মানবদেহে সৃষ্ট রোগ, জীবদেহে তৈরি বা নকল সম্ভব হয় না। যেমন ‘অস্টিওআর্থ্রাইটিস’ বা ‘গিঁটে বাত’। গবেষণায় রোগটি অবিকল নকল করে, ওষুধের পরীক্ষা চালানো সহজসাধ্য ব্যাপার নয়। অস্টিওআর্থ্রাইটিস মানবদেহে প্রাকৃতিক নিয়মে উৎপন্ন হয়। ওষুধের পরীক্ষা চালানোর জন্য অবিকল এমন রোগ সৃষ্টি করার জন্য, জীবদেহে নানা অসংগতিপূর্ণ পন্থা অবলম্বন করতে হয়। গিঁটে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে, ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে গিঁটে যন্ত্রণাদায়ক রাসায়নিক পদার্থ ঢুকিয়ে, আলোকরশ্মি প্রয়োগ করে, হাড় স্থানচ্যুত করে ‘অস্টিওআর্থ্রাইটিস’র মতো অবিকল অবস্থা তৈরির প্রয়াস চালানো হয়। কিন্তু কৃত্রিম উপায়ে তৈরি অস্থিভঙ্গ, রক্তক্ষরণ, রক্তজমাট, আহত অবস্থা বা প্রদাহ কোনোভাবেই মানবদেহের ‘অস্টিওআর্থ্রাইটিস’ রোগের সমতুল্য নয়। তাই কৃত্রিম উপায়ে তৈরি জীবদেহের রোগে প্রদত্ত ওষুধের কার্যকারিতা, মানবদেহে সৃষ্ট স্বতঃস্ফূর্ত ও প্রাকৃতিকভাবে তৈরি রোগের জন্য প্রদত্ত ওষুধের কার্যকারিতার প্রতিনিধিত্ব করে না। বহু ক্ষেত্রে বিভিন্ন মানুষের জীবনযাপনের মধ্যে, পারস্পরিক সমান সম্পর্ক থাকে না। তাই ওষুধের কার্যকারিতা ও ফলাফলে পরিলক্ষিত হয় গরমিল। যেমন আর্সেনিক মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। কিন্তু বানর, শূকরের ছানা, গিনিপিগের ক্ষেত্রে তা ক্ষতির কারণ নয়। ‘ডিজিটালিস’ মানুষের উচ্চ রক্তচাপ কমায়, কিন্তু কুকুরের ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক রক্তচাপ বৃদ্ধি করে। ‘পেনিসিলিন’ গিনিপিগের মৃত্যু ঘটায়। অথচ মানুষ পেনিসিলিন গ্রহণ করে রোগমুক্ত হয়। ‘ক্লোরামফেনিকল’ মানুষের শরীরে রক্তকণিকা উৎপাদন প্রতিহত করে। কিন্তু অন্য কোনো জীবে তার ক্ষতিকর প্রভাব নেই। ল্যাবরেটরিতে ব্যবহৃত কুকুর, বিড়াল, ইঁদুরজাতীয় জীবজন্তুকে খাদ্যের মাধ্যমে ভিটামিন সি গ্রহণের দরকার হয় না। এরা নিজেরাই শরীরে ভিটামিন ‘সি’ উৎপাদন করতে পারে। কিন্তু গিনিপিগ বা মানুষ খাদ্যের মাধ্যমে পর্যাপ্ত ভিটামিন ‘সি’ উৎপাদন না করলে, স্কার্ভি রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করতে পারে। এ প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলেন, কোনো বস্তুই বিষ নয়। জীবদেহ ভেদে কোনো বস্তু বিষ হতে পারে। শিশুর শরীরে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পরিপূর্ণভাবে গড়ে ওঠে না এবং শরীরে বিভিন্ন সিস্টেম ও মেটাবলিক প্রক্রিয়া পরিপূর্ণতা লাভ করে না বলে, তাদের ওপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালানো বিপজ্জনক। গর্ভবর্তী মহিলার ক্ষেত্রেও বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। পরীক্ষার নমুনা ওষুধটি যথেষ্ট নিরাপদ না হলে, গর্ভবতী মহিলাকে প্রয়োগ করে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালালে মা ও গর্ভজাত সন্তানের বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। তাই শিশু, মহিলা বা বয়স্কদের ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর ক্ষেত্রে, পশ্চিমা বিশে^ও চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা প্রায়ই প্রতারণার আশ্রয় নেয়। এরা দেশের মানুষকে বাদ দিয়ে সরলতা, অজ্ঞতা ও দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে কিছু আর্থিক সুবিধা দিয়ে, অনুন্নত ও গরিব দেশের অসহায় দরিদ্র মানুষ নির্বাচন করে নতুন ওষুধের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায়। জীবজস্তুর ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে শুরু করে মানবদেহে পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর্যন্ত অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ধাপ রয়েছে। এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রচুর সময়-অর্থের প্রয়োজন। এ কারণে প্রতিটি ধাপে রয়েছে, ম্যানিপুলেশন ও দুর্নীতির সুযোগ। অসাধু গবেষক ও চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের যোগসাজশে ওষুধ কোম্পানিগুলো, সময় ও অর্থ বাঁচানোর জন্য অপর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ওষুধ বাজারজাত করে। অনেক ক্ষেত্রে ওষুধ কোম্পানির ভাড়া করা গবেষকরা, মানবদেহে পর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন না করে শুধু জীবজন্তুর ওপর পরীক্ষা চালিয়ে ওষুধ বাজারজাত করে। এর ফলে বিপর্যয়ের সম্ভাবনা অপরিসীম। ২০০৪ সালে বিশে^র খ্যাতনামা ওষুধ কোম্পানি মার্ক, তাদের ব্লকবাস্টার ওষুধ ‘ভায়োক্স’ (জেনেরিক : রফেকক্সিব) হাজার হাজার হৃদরোগ ও স্ট্রোকজনিত মৃত্যুর কারণে বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। আরও একটি ওষুধ ‘থ্যালিডোমাইড’র কথা সর্বজনবিধিত। ১৯৫৬-১৯৬২ সাল পর্যন্ত ওষুধটি গর্ভবতী মহিলাদের প্রদানের কারণে বিশ্বব্যাপী হাজার হাজার শিশু অঙ্গ বিকৃতি বা অঙ্গহীন অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে। এরপর ওষুধটি বাজার থেকে তুলে নেয় ওষুধের আবিষ্কারক কোম্পানি গ্রুনেনথাল। এসব করুণ পরিণতির জন্য, জীবজন্তু ও মানুষের ওপর ওষুধগুলোর অপর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং গবেষকদের বিভ্রান্তিকর তথ্য ও দুর্নীতিকে দায়ী করা হয়।

ওষুধ উদ্ভাবনে জীবজন্তুর ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য নয়। কারণ এসব জীবজন্তুর ওপর পরীক্ষার ফলাফল মানুষের ক্ষেত্রে, ফলপ্রসূ নাও হতে পারে। অল্প সংখ্যক জীবজন্তু ও মানুষের ওপর কোনো ওষুধের পরীক্ষা চালানো হয় বলে, অনেক সময় এসব ওষুধের কার্যকারিতা বা বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পায় না। বাজারজাত হওয়ার পর লাখো-কোটি মানুষ এসব ভুল ওষুধ গ্রহণ করে বলে প্রকৃত কার্যকারিতা বা পাশর্^প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। মার্ক কোম্পানির ভায়োক্সের ট্রায়ালে তেমন কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে বলে কোম্পানি কোনো সময় স্বীকার করেনি। অথচ ২০০০ সালে বাজারজাত হওয়ার পর থেকে পরবর্তী চার বছরের মধ্যে, বিশ্বব্যাপী হাজার হাজার মানুষ এই ওষুধ গ্রহণ করে হৃদরোগ ও স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বা মৃত্যুবরণ করে। মার্ক কোম্পানি চার বছর ধরে, বিশে^র লাখ লাখ মানুষকে ‘গিনিপিগ’ হিসেবে ব্যবহার করে শেষ পর্যন্ত ওষুধটি তুলে নিতে বাধ্য হয়।

অনেক রোগী বিভিন্ন সময় কোনো ওষুধের নির্দিষ্ট মাত্রায় ভিন্নভাবে সংবেদনশীলতা প্রদর্শন করে। এমনও হতে পারে, কোনো ওষুধ বহু বছর ধরে ব্যাপকভাবে প্রেসক্রাইব ও ব্যবহার করলে তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দৃশ্যমান হতে পারে। যদি তাই হয়, অর্থাৎ কোনো বিশেষ ওষুধ কোনো বিশেষ রোগীর ক্ষেত্রে ভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া দেখালে, আলাদা জীবজন্তুর ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর যৌক্তিকতা থাকে কী? এ প্রসঙ্গে একজন বরেণ্য চিকিৎসক বলেন, জীবজন্তুর ওপর চালানো পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে কোনো ওষুধ মানবদেহে প্রয়োগ করলে, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানিগুলো চায় না, আমরা ওষুধ সম্পর্কে সত্য জানতে পারি। তারা এও চায় না, ওষুধের ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন বা উৎসুক্য প্রকাশ করি। যখন ওষুধ গ্রহণ করি, তখন যেন পরীক্ষা-নিরীক্ষার গিনিপিগ হই।

লেখক : জনস্বাস্থ্য ও ওষুধ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ও সাবেক ডিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক, ডেফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি 

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত