রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘১৪০০ সাল’ কবিতায় শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন একশ বছর পরে তার কবিতার আবেদন থাকবে কি না পাঠকের কাছে। কেমন ছিল বাংলা দিনপঞ্জির নতুন শতাব্দীতে পদার্পণের সেই ক্ষণ, কেমন ছিল রবীন্দ্রনাথের ‘১৪০০ সাল’-এর বর্ষবরণ। সেই মাহেন্দ্রক্ষণের একজন সাক্ষী শাকুর মজিদ। তিনি তখন বুয়েটের শিক্ষার্থী। ক্লাসরুমের বাইরে তখন তিনি সাংবাদিক, লেখক, আলোকচিত্রী। ত্রিশ বছর আগের ‘১৪০০ সাল’-এর বর্ষবরণ নিয়ে লিখেছেন এই গুণী লেখক।
তখন বাংলা ১৪০০ সাল, খ্রিস্টীয় ১৯৯৩। পহেলা বৈশাখ নানা কারণে খুব আলোচনায়। তার তৃতীয় কারণ ছিল দেশ স্বৈরশাসনমুক্ত হয়েছে মাত্র আড়াই বছর আগে। দ্বিতীয় কারণ ছিল, আগের বছর জাহানারা ইমাম শাহবাগে গণরায়ে যুদ্ধাপরাধীদের সাজার কথা উল্লেখ করেছেন আর প্রথম কারণ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও তার ‘১৪০০ সাল’ কবিতা। কারণ একশ বছর আগে তিনি আক্ষেপ করে কবিতা লিখেছিলেন এই মর্মে যে, সেদিন হতে শতবর্ষ পরে কোনো নতুন কবি আদৌ তার কবিতা পড়বে কি না, এই।
রবীন্দ্রনাথের এই কবিতার ফল এখন কেমন আছে তার সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য খোদ কলকাতা থেকে উড়ে এসেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তাকে নিয়েও তখন অনেক কৌতূহল।
আমি তখন ফিফথ ইয়ার আর্কিটেকচারের ছাত্র। তখনো আমি দুই ক্যামেরা নিয়ে ছবি তুলতে বের হই। একটায় থাকে রঙিন ফিল্ম, আরেকটায় সাদাকালো। ঠিক কী কারণে আমি সাদাকালো ফিল্মে যে ছবি তুলতে বেশি মজা পেতাম এখন খুব মনে নেই। দ্বিতীয় কারণ, খরচ কম। কারণ বুয়েটের ফটোল্যাবের চাবি থাকত আমার কাছে, শুধু কাগজ আর কেমিক্যাল কিনে এনে নিজেই ছবি প্রিন্ট করতে পারি। প্রিন্ট করা ছবি মানুষের বাড়ি গিয়ে পৌঁছে দেওয়াও ছিল আরেক কাজ।
বুয়েটের তিতুমীর হল থেকে বাংলা একাডেমি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, টিএসসি, শাহবাগ, রমনা সবই হাঁটা পথ। বইমেলায় হেঁটে বেড়ানো বা একুশে ফেব্রুয়ারিতে রাত জেগে মানুষের পদযাত্রা দেখা, এসবের সঙ্গে আমাদের নতুন উদ্দীপনা যুক্ত হয়েছে এবারের পহেলা বৈশাখ নিয়ে। বাংলা নতুন শতাব্দীর সূচনাকাল আর রবীন্দ্রনাথের ১৪০০ সাল।
আমরা আগের রাতে চারুকলায় যাই। চারুকলার ছাত্রছাত্রীরা শোলা দিয়ে, বোর্ড দিয়ে নানা রকম জন্তুর অবয়ব বানায়। কোনোটি হাতি, কোনোটি বাঘ, কোনোটি বকপাখি, কোনোটি হাঁস। আছে নানা রকমের ফুলের অবয়বও।
শুনি, এবার বাংলা একাডেমিতে বক্তৃতা দিতে আসছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও। আমার কাজ হচ্ছে ছবি তোলা। এ কাজ আমাকে কেউ দেয়নি, আমি নিজে নিজেই নিয়েছি। কেন নিয়েছি জানি না। আমার মতো আর যারা ক্যামেরা নিয়ে ঘুরেন তাদের দু-চারজন শখের ফটোগ্রাফার, বাকিরা কোনো না কোনো পত্রিকার। আমার হাতে দু-দুইটি ক্যামেরা দেখার পর দেখি আমার জন্য কেউ কেউ রাস্তা ছেড়ে দেন। আমি একেবারে ভেতরে ঢুকে গিয়ে ছবি তুলতে পারি। আমার আনন্দ ছবি তোলায়।

সকাল ৮টার দিকে চারুকলা থেকে মিছিল বেরোয়। আমি মিছিলের সামনে থাকি। একটা উঁচু জায়গা খুঁজি ছবি তোলার জন্য। কোথাও কোথাও দেখি বড় বড় ফটোগ্রাফাররা মাচা বানিয়ে রেখেছেন। আমি চেষ্টা করি সেই মাচায় উঠতে। সেখান থেকে কিছু ছবি তুলি।
শোভাযাত্রা চারুকলা থেকে শুরু হয়ে হাইকোর্টের সামনে দিয়ে ঘুরে দোয়াল চত্বর মাড়িয়ে আবার টিএসসিতে এসে শেষ হয়। এই যাত্রায় একসময় দেখি হাইকোর্টের সামনে একটা সাদা মাইক্রোবাসে কিছু তরুণের ভিড়। গাড়ির জানালার সামনে দু-তিনজন দাঁড়িয়ে। ভালো করে চেয়ে দেখি ভেতরে বসে আছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, তার পাশে শওকত ওসমান। কায়দা করে আমিও তাদের একটা ছবি তুলে ফেলি।
বেলা ১১টার দিকে বাংলা একাডেমিতে বসে আলোচনা সভা। সেখানে মঞ্চে কোনো চেয়ার-টেবিল নেই। পাটাতনে সাদা কাপড়ের ওপর বসে আছেন বাংলা সাহিত্যের তিন সম্রাট। পূর্ব বাংলার আকাশে জ¦লজ¦ল করা দুই সূর্য শামস (-উর) রাহমান আর সৈয়দ শামস (-উল) হক আর পশ্চিমের সুনীল আকাশ রাঙানো গঙ্গোপাধ্যায়।
সুনীলের কথাগুলো মন দিয়ে শুনি। তিনি বলেছিলেন যে, তিনি খুবই ভাগ্যবান এই অর্থে, একই বছরে অনুষ্ঠিত দুই বাংলার বর্ষবরণ, ১৪০০ সালের উদ্বোধনী তিনি দেখার এবং উপভোগ করার সুযোগ পেলেন। কারণ গতকালই (১৩ এপ্রিল ১৯৯৩) কলকাতায় এই উৎসব তিনি পালন করে এসেছিলেন।
বাংলাদেশে কয়েক বছর আগে ক্যালেন্ডার সংশোধনী করা হয় এমনভাবে যে, প্রতিবছর ৮ ফাল্গুল হবে ২১ ফেব্রুয়ারি, আর ১৪ এপ্রিলই হবে পহেলা বৈশাখ। যদিও আমাদের জীবনাচারের কোথাও এখন আর বৈশাখের বা বাংলা সালের কোনো লেনদেন নেই, আমরা তবুও এপ্রিল এলেই অপেক্ষায় থাকি কখন পহেলা বৈশাখ আসবে আর আমরা বাংলা নববর্ষের সূচনাকালের উদ্দীপনায় উদ্দীপ্ত হবো।
আলোকচিত্র : শাকুর মজিদ
