বুলেট ক্ষেপে গিয়ে বলল, ‘ওকে দাওয়াত করে বাড়ি নিয়ে যাই। তারপর এমন খাবার খাওয়াব যে বিছানা টু বাথরুম। বাথরুম টু বিছানা।’
সোহান বাথরুম থেকে ফিরেছে এবং ফিরতে গিয়ে আবার বাথরুমের ফিরতি পথ ধরতে হচ্ছে দৃশ্য হিসেবে দারুণ। কিন্তু বিষয়টা ঠিক রুচিকর নয়। অন্যদের ঠিক বলা যাবে না। আর অন্যদের ঢোল পিটিয়ে না জানাতে পারলে কৃতিত্ব থাকে কোথায়?
আমরা স্কুলের সামনের গাছতলায় দাঁড়িয়ে আরও ভাবি। গালে হাত দেই। পায়চারি করি। সিনেমা-নাটকে দেখেছি ভাবার সময় এসব করতে হয়। কিন্তু আমরা তো আর সিনেমার নায়ক না যে, এমন করলেই কিছু একটা পেয়ে যাব। এদিকে পায়চারি করতে গিয়ে শফিক একটা পাথরে ধাক্কা খেয়ে পা ছিলে ফেলে। আমি গালে হাত দিয়ে বসে থাকতে থাকতে একসময় দেখি আমার হাতে ব্যথা করছে।
আমাদের এই সমস্যার মূলে সোহান নামের একটি ছেলে। ছেলেই কারণ শফিক বলেছে ভুলেও যদি আমরা কেউ তাকে বন্ধু বলি তাহলে সে গলা কেটে ফেলবে। গলা কেটে ফেললে খাওয়া যাবে না, না খাওয়া গেলে বড় হওয়া যাবে না এবং বড় না হওয়া গেলে বিয়ে করা যাবে না এসব ভেবে আমরা ওকে ছেলেই বলি।
গত মাসে সোহান আমাদের স্কুলে ভর্তির পর থেকে খুব যন্ত্রণায় আছি। সোহান আগে ঢাকার বড় স্কুলে পড়ত, ওর বাবার ট্রান্সফারের কুফল হিসেবে সে এখন আমাদের ক্লাসমেট। প্রথম দিন এসেই এমন ইংরেজি বলতে শুরু করল যে, আমাদের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। আমাদের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, ‘হাই আই অ্যাম ইয়োর নিউ ফ্রেন্ড।’
ক্লাস সিক্সের ছাত্র হিসেবে আমাদের এই কথার অর্থ জানা উচিত, আমরা জানিও, কিন্তু সে আমাদের সামনে ইংরেজি ফোটাতে যাবে কেন? তা ছাড়া এমন ঝকঝকে প্যান্ট-শার্টইবা পরবে কেন? পরের অঙ্ক ক্লাসেও সে এক কথাতেই অঙ্ক পেরে গেল। স্যার ওর খাতা হাতে নিয়ে বললেন, ‘এই শাখামৃগের দল দেখ, এই দেখ! সব ক্লাসের পর ওর পা ধুয়ে সালাম করিস!’
কী অপমানের কথা! শফিক আমাদের ফার্স্ট বয়। সে লজ্জায় পরের এক ঘণ্টা কারও সঙ্গে কথাই বলেনি। একেকটা ক্লাস যায়। ও আরও বেশি বেশি করে পারে। আর আমাদের লজ্জা বাড়ে। কাজেই আজ এর একটা বিহিত করতেই হবে। সে জন্যই আমরা স্কুলের শেষে এই গাছের নিচে বসেছি। কিন্তু বুলেটের ডায়রিয়া পদ্ধতি ছাড়া কিছু বের করতে পারছি না।
এ সময়ই দেখি সোহান আসছে। এখন কী করব? ভাবব নাকি ভাবনা থামিয়ে দেব? বুলেট দৌড়ে এগিয়ে গেল ওর দিকে। আমরা প্রমাদ গুনলাম। সোহান ঢাকার ছেলে, হরলিকস-টরলিকস খায় বোধ হয়, ফটাফট ইংরেজির মতো মারামারির ঢাকাইয়া বিশেষ কৌশলও জেনে থাকতে পারে, কাজেই...। দৌড়ে গেলাম বুলেটকে আটকাতে। বুলেট বলল, ‘আমাকে ছেড়ে দে!’
সোহান অবাক হয়ে বলল, ‘এই শফিক ছেড়ে দাও না। ওকে ছাড়ো।’
ওর কথা শোনা উচিত নয়। কিন্তু শফিক দেখি বুলেটকে ছেড়ে দিল। এখন বুলেট পড়ে গেছে বিপদে। ছাড়ার কথা সে বলছিল বটে, কিন্তু ছাড়া পাওয়ার পর এখন কী করবে ঠিক বুঝতে পারছে না। শেষে দোষটা আমাদের ওপরই চাপিয়ে দিল, ‘আজ তোকে এরা বাঁচিয়ে দিল!’
সোহান অবাক হয়ে বলল, ‘আমাকে বাঁচিয়ে দিল মানে! আমার কী হয়েছে?’
বুলেট বলল, ‘এখনো ভেবে তোর শাস্তি ঠিক করতে পারিনি। নইলে... ’
সোহান বলল, ‘ইন্টারেস্টিং! ভেরি ইন্টারেস্টিং!’
বুলেটের যে কী হলো সে গড়গড় করে সব বলে দিল। একেবারে ডায়রিয়া বাধানোর প্ল্যান পর্যন্ত।
সোহান সব শুনে বলল, ‘তোমরা যখন ভেবে বের করতে পারছ না তখন চলো সবাই মিলে ভাবি।’
আমরা বুঝলাম না কী করা উচিত। কাজেই চুপ।
সোহান বলল, ‘এভাবে তো হয় না। চলো আমরা বাসায় গিয়ে রাতে কাগজ-কলম নিয়ে বসে যাই। তারপর যার যা ভাবনা সেটা লিখে ফেলি। তারপর সেটার ইংরেজি অনুবাদও করে ফেলব। সেই লেখাগুলো নিয়ে কাল এখানে বসে যারটা ভালো হবে তার প্রস্তাব মতো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।’
কী আর করা যাবে। এর চেয়ে যেহেতু ভালো কোনো প্রস্তাব আমাদের নেই কাজেই সোহানের কথা শুনতে হয়। তা ছাড়া লোভও আছে একটু। সোহান ঢাকা থেকে এসেছে, ওর বাবা নিশ্চয়ই অনেক ধনী, ওদের বাসায় গেলে খাওয়া-দাওয়াও বোধহয় ভালোই হবে।
মায়েরা এত সুন্দর হতে পারে! এত সুন্দর করে কথা বলতে পারে। কাউকে ‘তুই’ বললেন না, সবাই ‘তুমি’। এটাও আমাদের অভিজ্ঞতায় নতুন। নাম জিজ্ঞেস করলেন। আর জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের কার কী করতে ভালো লাগে! বুলেট সাহস করে বলে ফেলল, ওর শুধু দুষ্টুমি করতে ইচ্ছে করে। পড়াশোনা করতে একটুও ভালো লাগে না। সোহানের আম্মা রেগে না গিয়ে বললেন, ‘বেশ তো করবে। এটাই তো দুষ্টুমির বয়স। দুষ্টুমি তো আর আমাদের মতো বুড়োরা করবে না, তোমরাই করবে।’
শফিক বলল, ‘ওর খেলাধুলার খুব নেশা।’ উনি শুনে জানতে চাইলেন, ‘ও কী খেলে? ক্রিকেট না ফুটবল কোনটা বেশি ভালো লাগে? সর্বোচ্চ কত রান করেছে?’
ইশ! আমাদের বাবা-মা যদি এমন হতেন! আমাদের এমনিতে একজন আরেকজনের বাসায় যেতে হয় প্রায় লুকিয়ে। দেখলে বাবা-মা’রা ধরে নেন আমরা কোনো একটা গোলমাল পাকানোর তালে আছি। আর চেঁচিয়ে বলেন, পড়াশোনার নাম নেই খালি বাঁদরামি। একেবারে মেরে...। গত পরীক্ষায় কত পেয়েছিস?
গত সপ্তাহে বুলেটের বাসায় গিয়ে শফিক ধরা পড়ে গিয়েছিল। বুলেটের বাবা ওকে কয়েকটা ট্রান্সলেশন ধরেন। না পারায় কান ধরিয়ে ওঠবস করিয়েছেন তিনবার।
সেখানে সোহানের বাসায় কী স্বর্গীয় পরিবেশ! ইশ, আমাদের বাসাও যদি ঢাকায় হতো! তাহলে আমাদের খেলতে কেউ বাধা দিত না! উঠতে-বসতে ধমকাত না!
সোহান ওর মাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘আম্মু, আমরা একটু কাজ করব। তুমি যাও।’
এভাবে মায়ের সঙ্গে কথা বলা যায় এটাও আমাদের জানা ছিল না ।
ওর আম্মা হেসে বললেন, ‘ঠিক আছে কাজ করো। কাজ শেষে খেয়ে তারপর সবাই যাবে। আজ প্রথম দিন এসেছ। সবাই খাবে আমাদের সঙ্গে।’
উফ্! কী আনন্দ! নিশ্চয়ই দারুণ সব খাবার তৈরি হবে।
বুলেট আমার কানে ফিসফিস করে বলল, ‘আমার না খুব খিদা পেয়েছে। খাওয়াটা যদি এখনই হয়ে যেত!’ সোহানের আম্মা শুনে ফেললে খুব লজ্জার ব্যাপার হবে বলে আমি কড়া চোখে বললাম, ‘চুপ। একেবারে চুপ।’
আম্মা বিদায় নেওয়ার পর সোহান কয়েকটা সুন্দর কাগজ বের করে সবার হাতে একেকটা দিয়ে বলল, ‘এখানে আমরা সবাই নিজেদের প্রস্তাবগুলো লিখব। তারপর সবাই মিলে বসে সিদ্ধান্ত নেব কারটা সবচেয়ে ভালো হয়েছে।’
লিখতে শুরু করলাম। আর কী আশ্চর্য সেটা শুরুর পর খাবারের কথা মনে থাকল না। শুধু মনে হলো, আমারটা সবচেয়ে ভালো হতে হবে। লিখলাম, কাটলাম। সোহান পাশে একটা বাংলা অভিধান রেখে বলেছিল, কেউ কোনো শব্দের অর্থ না জানলে বা লেখায় নতুন কোনো শব্দ ব্যবহার করতে চাইলে এই অভিধান দেখতে পারবে।
লেখা ভালো করার জন্য অভিধান দেখলাম। নতুন কিছু শব্দ ব্যবহার করলাম। কয়েকটি শব্দের অর্থ শিখলাম। আরে! এমন নিজের মতো লিখতেও তো দারুণ লাগে! খেলার মতোই তো মজার। সবাইকে হারানোর একটা আনন্দ আছে এতে। খেয়াল করে দেখলাম সবাই লেখায় ব্যস্ত। মজা পেয়েছে প্রত্যেকেই। সোহানের আম্মা একসময় এসে বললেন, ‘কী তোমরা খাবে না? খাবার রেডি।’
দেখি আমি একা না, কেউই তার কথায় খুব মনোযোগ দিচ্ছে না। খাওয়া সবার কাছে এখন গুরুত্বহীন হয়ে গেছে। গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সবার চেয়ে ভালো একটা প্রস্তাব তৈরি করা। সবচেয়ে ভালো লেখা।
পরের মাসে প্রকাশিত স্কুল ম্যাগাজিনে বুলেটের একটা রচনা জায়গা পেল। নামটা সোহানই দিয়েছিল, ‘বন্ধু আবিষ্কার’।
বাংলা স্যার বেত ঘুরিয়ে বললেন, ‘নিশ্চয়ই নকল করেছিস? কার বই থেকে? বল। আমার কিন্তু বাংলা সাহিত্যের সবার সব রচনা মুখস্থ। পার পাবি না।’
সোহান প্রতিবাদ করে বলল, ‘স্যার, আমার বন্ধুরা নকল করে না!’
বাংলা স্যার তবু বেত ঘোরালেন। তর্জন-গর্জন করলেন। কিন্তু নকল ধরতে পারলেন না।
পারবেন কী করে! এখন তো আমাদের কারও লেখা নকল করতে হয় না। আমরা নিজেরাই লিখতে শিখে গেছি।