সুষ্ঠু নির্বাচনের আকাক্সক্ষা পর্যবেক্ষকে সন্তোষ

আপডেট : ০৫ মে ২০২৩, ০২:১৮ এএম

বাংলাদেশের আসন্ন সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করার আকাক্সক্ষা পুনর্ব্যক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর পাশাপাশি মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সমুন্নত রাখার পক্ষে তাদের অবস্থান জানিয়েছে দেশটি। সেই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করার জন্য নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে ওয়াশিংটনকে অবহিত করেছে ঢাকা। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নির্বাচন পর্যবেক্ষণের পথ উন্মুক্ত করে দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতিরও প্রশংসা করেছে ওয়াশিংটন।

গত বুধবার ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নবম অংশীদারত্ব সংলাপে দেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি, রোহিঙ্গা ইস্যু ও দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো স্থান পায়। আলোচনায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন ও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড নিজ নিজ পক্ষে নেতৃত্ব দেন।

এ সংলাপ সম্পর্কে গতকাল বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের বরাত দিয়ে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস থেকে আলাদা বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। এ ছাড়া সংলাপের পর গতকাল ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড এক টুইট বার্তায় বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্ক গভীর করার বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব মোমেনের সঙ্গে বৈঠক হলো। আমরা অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনসহ মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রচারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছি। সেই সঙ্গে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য আমরা বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানিয়েছি।’ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সংলাপে মাসুদ বিন মোমেন স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করার জন্য নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রকে অবহিত করেছেন। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন এবং বিদেশি পর্যবেক্ষকদের অংশগ্রহণ নিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির কথা জানান পররাষ্ট্র সচিব। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নির্বাচন পর্যবেক্ষণের পথ উন্মুক্ত করার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া প্রতিশ্রুতির প্রশংসা করেন নুল্যান্ড।

পররাষ্ট্র সচিব বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাংকের মধ্যে অংশীদারত্বের ৫০ বছর পূর্তি উৎসব উদযাপন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর এবং পরে ওয়াশিংটন ডিসি সফর সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষকে অবহিত করেন। এ সময় তিনি বাংলাদেশের সম্প্রতি প্রকাশিত ইন্দো-প্যাসিফিক দৃষ্টিভঙ্গির রূপরেখা নিয়েও কথা বলেন। নুল্যান্ড নিজ নিজ ইন্দো-প্যাসিফিক নথিতে দুই দেশের মধ্যে অভিন্নতার ক্ষেত্র উল্লেখ করেছেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে ইন্দো-প্যাসিফিক বিষয়ে বলা হয়, নুল্যান্ড বলেছেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দলিলের অনেক বিষয়ে দুই দেশের অবস্থান অভিন্ন। সংলাপে মাসুদ বিন মোমেন বাংলাদেশের সদ্য প্রকাশিত ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের (ইন্দো-প্যাসিফিক) রূপরেখা নুল্যান্ডের কাছে তুলে ধরেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের রূপরেখার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভারত ও ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলের মিলের বিষয়ে এমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন নুল্যান্ড।

বাংলাদেশের ইন্দো-প্যাসিফিক রূপরেখা ঘোষণার পর প্রথমবারের মতো ঢাকার সঙ্গে ওয়াশিংটনের আনুষ্ঠানিক আলোচনা হলো। অনেক বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রূপরেখার সঙ্গে অভিন্ন অবস্থান প্রকাশের মধ্য দিয়ে ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা পেল বাংলাদেশ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফরের ঠিক আগের দিন গত ২৪ এপ্রিল ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে বাংলাদেশের ১৫ দফার রূপরেখা প্রকাশ করা হয়। ওই রূপরেখায় মূলত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্বার্থে নিরাপত্তার পূর্বশর্তের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ তাদের পররাষ্ট্র নীতির ধারা বজায় রেখে এ অঞ্চল ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় কোনো পক্ষে ঝুঁকে না পড়ার বিষয়ও এতে স্পষ্ট করেছে। ২৫-২৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফরের সময় দুই দেশের সম্পর্ক কৌশলগত অংশীদারত্বে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

পররাষ্ট্র সচিব বাংলাদেশের সাম্প্রতিক মানবাধিকার কর্মকাণ্ডের কিছু ইতিবাচক অগ্রগতিও শেয়ার করেছেন। মোমেন র‌্যাবের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। তিনি এ সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মস্বীকৃত ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত খুনি রাশেদ চৌধুরীকে হস্তান্তরেরও আহ্বান জানান।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নুল্যান্ড বাংলাদেশ সরকারের এ বছরের মধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পর্যালোচনা করার ঘোষণার প্রশংসা করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে শ্রম খাতের সংস্কারের পাশাপাশি অব্যাহত অগ্রগতির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। এ বিষয়ে আলোচনায় দুই দেশ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে ক্রমবর্ধমান ও গতিশীল ব্যবসায়িক সহযোগিতায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে। তারা বাংলাদেশে মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টদের ব্যবসায়িক ব্যস্ততা বাড়াতে সাইবার নিরাপত্তা এবং ডেটা সুরক্ষার বিষয়ে আরও কাজ চালিয়ে যেতে একমত হয়েছে।

মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অসাধারণ উদারতার প্রশংসা করেন ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড। তিনি এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের মানবিক সহায়তার আশ্বাস দেন। সংলাপে পররাষ্ট্র সচিব রোহিঙ্গাদের সহায়তায় পরিচালিত তহবিলের সর্বশেষ পরিস্থিতি এবং সীমিতসংখ্যক রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের জন্য পাইলট প্রকল্প চালুর বিষয়টি জানান। উভয়পক্ষই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কিছু রোহিঙ্গাকে পুনর্বাসন কার্যক্রম আরও বাড়াতে সম্মত হয়েছে। এ ছাড়া উভয়পক্ষ জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত বিষয়ে তাদের মতামত বিনিময় এবং এ বিষয়ে সহযোগিতার ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা করেছে। মাসুদ বিন মোমেন আগামী বছর ঢাকায় অনুষ্ঠেয় অংশীদারত্ব সংলাপের দশম রাউন্ডে আন্ডার সেক্রেটারি নুল্যান্ডকে আমন্ত্রণ জানান।

ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের বিজ্ঞপ্তি : এ সংলাপ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথু মিলার এক বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার নবম অংশীদারত্ব সংলাপে উভয়পক্ষই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে ক্রমবর্ধমান অংশীদারত্বের প্রতি তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।

বিবৃতিতে বলা হয়, ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যকার শক্তিশালী সম্পর্কের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ওপর গুরুত্ব এবং বাংলাদেশে মানবাধিকার, শ্রম অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রচারে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন নুল্যান্ড। সেই সঙ্গে দুই দেশের জনগণের সুদৃঢ় বন্ধনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বাংলাদেশের অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আরও উজ্জ্বল অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য তিনি এর ইতিবাচক পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মুহাম্মদ ইমরানসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাস, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী সচিব ডোনাল্ড লু এবং দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর, হোয়াইট হাউজ এবং ইউএসএআইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সংলাপে উপস্থিত ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত