১৩ মে। ১৯৪৭ সাল। কলকাতার ১১৯ লাউডন স্ট্রিটের ‘রেড অ্যান্ড কিওর হোম’। মাত্র একুশ বছর বয়সের এক যুবক যিনি লিখেছেন ৭-৮ বছর। এরপর দেহ রাখলেন, অর্থাৎ অগস্ত্যযাত্রা। মৃত্যুর কারণ মূলত অনিয়ম। লালঝাণ্ডার সমতার পৃথিবীর স্বপ্নে শরীরের প্রতি বেদম অত্যাচার। প্রথমে ম্যালেরিয়ার ধাক্কায় দুর্বল শরীর, তারপর ক্ষয়রোগে চিরক্ষয়ের দিকে যাত্রা।
বাংলা সাহিত্যের জন্য অন্তত অমোঘ কিছু কবিতা লিখে গেছেন তিনি। যার আবেদন কখনো শেষ হবে না, অন্তত পৃথিবীতে শোষণ-বঞ্চনা যতদিন থাকবে ততদিন প্রাসঙ্গিক থাকবেন সুকান্ত ভট্টাচার্য।
বাংলাদেশের শিক্ষাক্রমের নানা শ্রেণিতে তার লেখা একাধিক কবিতা পাঠ্য। দুর্মর, আঠারো বছর বয়স, ছাড়পত্র, একটি মোরগের কাহিনীর মতো কবিতা পাঠক একবার পড়লে তা কখনো ভোলার নয়, তা শুধু তার রাজনীতিসচেতনতা নয়, আদি ও আসল কবিতার শক্তিতেই।
‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ বাংলাদেশ/কেঁপে কেঁপে ওঠে পদ্মার উচ্ছ্বাসে,/সে কোলাহলে রুদ্ধস্বরের আমি পাই উদ্দেশ/জলে ও মাটিতে ভাঙনের বেগ আসে।//হঠাৎ নিরীহ মাটিতে কখন/জন্ম নিয়েছে সচেতনতার ধান,/গত আকালের মৃত্যুকে মুছে/আবার এসেছে বাংলাদেশের প্রাণ।// ‘‘হয় ধান নয় প্রাণ” এ শব্দে/সারা দেশ দিশাহারা,/একবার মরে ভুলে গেছে আজ/ মৃত্যুর ভয় তারা।//সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী/অবাক তাকিয়ে রয়/জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার/তবু মাথা নোয়াবার নয়।// (অংশবিশেষ)
স্মর্তব্য, ১৯৪৭ সালে দেশভাগও হয়নি, স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন তখনো সুদূরপরাহত, কলকাতায় বসে কবি সুকান্ত লিখছেন, সাবাস বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়ৃ বাঙালিকে বলছেন, জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়।
বাংলাদেশের যেকোনো অর্জনে এখনো ব্যবহার করা হয় সুকান্তর এই পঙ্ক্তি। ৬-৭ বছরের সাহিত্যজীবনে মাত্র হাতেগোনা কিছু কবিতায় বিস্ময়কর সব পঙ্ক্তি আর দৃশ্য রচনা করেছেন সুকান্ত। রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কবিতার বৈপ্লবিক ভাবধারাটি যাদের সৃষ্টিশীল রচনায় সমৃদ্ধ হয়েছে, সুকান্ত তাদের অন্যতম। তার কবিতার ছন্দ, ভাষা, রচনাশৈলী এত স্বচ্ছন্দ, বলিষ্ঠ ও নিখুঁত যে, তার বয়সের বিবেচনায় এরূপ রচনা বিস্ময়কর ও অসাধারণ বলে মনে হয়। মাত্র তিনটি কাব্যগ্রন্থ ছাড়পত্র (১৯৪৭), পূর্বাভাস (১৯৫০), মিঠে-কড়া (১৯৫১)। যার দুটিই প্রকাশিত হয় মৃত্যুর পর। কি আর কোন বাংলা সাহিত্যের কবির কথা মনে পড়ে যাচ্ছে, হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন, আবুল হাসানের সঙ্গেই সুকান্তর এমন অদ্ভুত কাকতালীয় মিল।
বাংলা সাহিত্যের মার্কসবাদী ভাবধারায় বিশ্বাসী এবং প্রগতিশীল চেতনার অধিকারী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্ম ১৫ আগস্ট ১৯২৬ সালে, কলকাতার কালীঘাট অঞ্চলের অন্তর্গত ৪৩নং মহিম হালদার স্ট্রিটে তার মামাবাড়িতে। তার পৈতৃক বাড়ি সে সময়ের ফরিদপুর জেলার উনশিয়া গ্রামে, যা এখন গোপালগঞ্জের অন্তর্গত। সুকান্তের বাবা নিবারণ ভট্টাচার্য ছিলেন এক গ্রন্থাগারের মালিক, মা সুনীতি দেবী ছিলেন একজন সাধারণ গৃহবধূ। নিবারণ-সুনীতি দম্পতির ছয় ছেলের নাম যথাক্রমে মনমোহন, সুশীল, প্রশান্ত, বিভাষ, অশোক এবং অমীয়। সুকান্ত তার বড় দাদা মনমোহন এবং বউদি সরজু দেবীর খুবই আদরের ছিলেন। তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ ছিলেন এই সরজু দেবী বা রানীদি। সেই সময়ের বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক মনিন্দ্রলাল বসুর “সুকান্ত” গল্পটি পড়ে সরজু দেবীই তার নাম রেখেছিলেন সুকান্ত।
বেলেঘাটা দেশবন্ধু স্কুল থেকে ১৯৪৫ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে অকৃতকার্য হলেন সুকান্ত। এ সময় ছাত্র আন্দোলন ও বামপন্থি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ায় তার আনুষ্ঠানিক শিক্ষারও বারোটা বেজে গেল। সুকান্তের বাল্যবন্ধু ছিলেন কবি অরুণাচল বসু। সুকান্ত সমগ্রতে লেখা সুকান্তের চিঠিগুলোর বেশিরভাগই অরুণাচল বসুকে লেখা। অরুণাচল বসুর মাতা কবি সরলা বসু সুকান্তকে পুত্র¯েœহে দেখতেন। সুকান্ত ছেলেবেলায় মাতৃহারা হলেও সরলা বসু তাকে সেই অভাব কিছুটা পূরণ করে দিতেন। কবির জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছিল কলকাতার বেলেঘাটার ৩৪ হরমোহন ঘোষ লেনের বাড়িতে। সেই বাড়িটি এখনো অক্ষত আছে। পাশের বাড়িটিতে এখনো বসবাস করেন সুকান্তের একমাত্র জীবিত ভাই বিভাষ ভট্টাচার্য। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সুকান্তের নিজের ভ্রাতুষ্পুত্র।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, তেতাল্লিশের মন্বন্তর, ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রভৃতির বিরুদ্ধে কলম ধরলেন সুকান্ত। ১৯৪৪ সালে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। একাধারে বিপ্লবী ও স্বাধীনতার আপসহীন সংগ্রামী কবি সুকান্ত ছিলেন কম্যুনিস্ট পার্টির সারাক্ষণের কর্মী। পার্টি ও সংগঠনের কাজে অত্যধিক পরিশ্রমের ফলে নিজের শরীরের ওপর যে অত্যাচার তিনি করেছিলেন সাহিত্য সমালোচকরা এখনো এটিকেই তার অকালমৃত্যুর কারণ বলে মনে করেন। ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও অনৈতিক ব্রিটিশ শাসন প্রভৃতির বিরুদ্ধে তিনি ও তার দল ভীষণভাবে সোচ্চার হন সেসময়ে। এ ব্যাপারগুলো প্রভাবিত করে তার কবিতাকেও।
১৯৪৪ সালে “আকাল” নামক একটি সংকলনগ্রন্থ তিনি সম্পাদনাও করেন এবং সেখানেই শোষিত মানুষের কর্মজীবন, ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য সংগ্রাম, সমাজের দুর্দশাজনিত বেদনা এবং শোষণমুক্ত স্বাধীন সমাজের স্বপ্ন প্রভৃতি বিষয় নিয়ে কবিতা লিখতে থাকেন। তার সেই কবিতা সংকলন মানুষকে ভীষণভাবে সাহস ও অনুপ্রেরণা জোগায় রাজনৈতিক কর্মকান্ডে সক্রিয় হতে। সুকান্ত কবিতা লেখার সঙ্গেই সঙ্গেই বিভিন্ন গান, গল্প, নাটক এবং প্রবন্ধও রচনা করেছিলেন। দুই বাংলা থেকেই প্রকাশিত হয়েছে সুকান্ত ভট্টাচার্যের রচনাসমগ্র। আঠারো বছর বয়স কবিতায় তারুণ্যকে দুঃসাহসের সারথি, যেকোনো কাজ চাইলেই করে ফেলতে পারার সক্ষমতা তাদের আছে এই প্রত্যয় প্রাণে ঢুকিয়ে দেওয়া কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। প্রয়াণ দিবসে তাকে স্মরণ শ্রদ্ধা জানাই। তিনিই তো যুগে যুগে প্রাণে জ্বালিয়ে রেখেছেন দেশলাইয়ের কাঠি। লিখেছিলেন আমি একটা ছোট্ট দেশলাইয়ের কাঠি/এত নগণ্য, হয়তো চোখেও পড়ি না/তবু জেনো/মুখে আমার উসখুস করছে বারুদ /বুকে আমার জ্বলে উঠবার দুরন্ত উচ্ছ্বাস;/আমি একটা দেশলাইয়ের কাঠি।//
দেশলাইয়ের কাঠি শান্ত তারুণ্য জেগে উঠে একদিন নিশ্চয়ই এ জাতির সকল কালিমা করবে দূর, সত্যিকার অর্থেই হৃদয়ে ধারণ করবে প্রয়াণের ৭৬ বছর পর, আজও তরুণ কবি সুকান্তকে।
