আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ (আইএমএফ) বিভিন্ন ঋণদানকারী সংস্থার দেওয়া সংস্কার প্রস্তাবের যেগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক, যাচাই-বাছাই করে সেগুলো গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগামী অর্থবছরেই এসব সংস্কারের সবটা গ্রহণ না করে, পর্যায়ক্রমে পরের তিন অর্থবছরে গ্রহণ করতে বলেছেন তিনি। বৈশ্বিক মন্দার কারণে বিপাকে থাকা শিল্প খাত এবং চাপে থাকা সাধারণ মানুষের ওপর রাজস্ব সংস্কারে নেওয়া পদক্ষেপ যেন কোনোভাবেই নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে তা নিয়েও সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
গতকাল রবিবার গণভবনে দিনব্যাপী আগামী অর্থবছরের বাজেট নিয়ে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। গোপনীয় এ বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার, বাজেট প্রস্তুতির সঙ্গে জড়িত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে রাজস্ব আদায়ের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সক্ষমতা বাড়াতে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বৈধপথে প্রবাসী আয় দেশে আনা ও আয়কর আইন বাস্তবায়নে আগামী বাজেটে পদক্ষেপ নিতে বলেছেন।
বৈঠকে উপস্থিত এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিমের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঋণদানকারী সংস্থার অর্থ দেশের অর্থনীতিতে আপাতত স্বস্তি আনলেও তা স্থায়ী সমাধান না। প্রতি অর্থবছরেই রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি থাকছে। এতে বাজেট বাস্তবায়নে অর্থায়নের সংকট দেখা দিচ্ছে। এ ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার আরও ছোট করা যেত। কম প্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে ধরতে হবে।
বৈঠকে আইএমএফের রাজস্ব সংস্কারের কতটা আগামী বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে তা নিয়ে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হয়, আগামী অর্থবছরের বাজেটে সিগারেট, মুঠোফোন, ওষুধ, ব্যাংক, গ্যাস, বিদ্যুৎ বিতরণ, কোমলপানীয়, সাবান, সিমেন্ট ও পানি সরবরাহকারী খাতের ওপর নির্ভর করে রাজস্ব আদায়ের ছক করা হয়েছে।
এনবিআরের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হয়েছে, স্বল্প করহার, কর অব্যাহতি এবং কর অবকাশ সুবিধাগুলোর কারণে দেশে কর-জিডিপির বর্তমান অনুপাত সম্ভাব্য প্রকৃত অনুপাতের তুলনায় ২ দশমিক ২৮ শতাংশ কম হচ্ছে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। এলডিসি থেকে বের হওয়ার পর উঁচু হারে শুল্ক রেখে বাণিজ্য সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে না। অন্যদিকে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে হবে। বর্তমানে শুল্ক সুরক্ষার হার গড়ে ২৯ শতাংশ। বৈশি^ক মন্দা ও ডলার সংকট ঠিক কত সময় স্থায়ী হয় তা এখনো অনিশ্চিত। এ ক্ষেত্রে এ হার কমে যেতে পারে। তাই শুল্ক খাতে আদায় বাড়ানো এনবিআরের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। শুল্ক খাতে অব্যাহতি কমানো সম্ভব হলে আদায় বাড়বে।
বৈঠকে জানানো হয়েছে, চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের এ পর্যন্ত আমদানি পর্যায়ে শুল্ক করের ছাড়ের পরিমাণ আট হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর আগে গত ২০২১-২২ অর্থবছরের এ হিসাব ছিল প্রায় একই। আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে এই বিশেষ শুল্ক সুবিধা কমিয়ে আনা হচ্ছে।
গত প্রায় ৫০ বছরের বিভিন্ন সময় প্রজ্ঞাপন জারি করে রাজস্ব অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আইএমএফের সংস্কার প্রস্তাবের অংশ হিসেবে আসছে বাজেটে অনেক পণ্যের অব্যাহতি তুলে নেওয়া হচ্ছে। ঋণদানকারী সংস্থার পক্ষ থেকে সরকারের আয় বাড়াতে নতুন খাতে শুল্ক-কর-ভ্যাট আরোপ, বিদ্যমান হার বাড়ানো এবং মওকুফ সুবিধা বাতিলের চাপ আছে। এর অনেকগুলো বাস্তবায়ন করা হলেও সবটা আগামীবারেই মানা হচ্ছে না। দেশি শিল্পে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে অধিক ব্যবহৃত কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে রাজস্ব ছাড় ও রেয়াতি সুবিধা থাকছে। পণ্যের নতুন বাজার সম্প্রসারণে রাজস্ব সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। কর অবকাশ সুবিধা বাতিলে আইএমএফের চাপ থাকলে সব খাতে বাতিল হচ্ছে না। উৎসে কর ও অগ্রিম করে কিছুটা ছাড় দেওয়া হবে। আবাসন খাত ও এর ওপর নির্ভরশীল শিল্পের শতাধিক খাতে রাজস্ব ছাড় থাকছে। মোটরসাইকেল ও গাড়ির যন্ত্রাংশ, নির্মাণসামগ্রী, টেক্সটাইল, চামড়া খাত, পাটশিল্প, দেশি টেলিভিশন, ফ্রিজ, এসি, মোবাইল, ওষুধ ও অটোমোবাইল শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান সুবিধা বহাল থাকছে। সম্পূর্ণ আমদানি করা মোটরসাইকেলের চেয়ে দেশে সংযোজিত বা দেশে উৎপাদিত মোটরসাইকেল শিল্পে বেশি সুবিধা থাকছে।
বৈঠকে জানানো হয়েছে, মোবাইল উৎপাদনকারী ও পোলট্রি খামারের বিকাশে আগামী বাজেটেও বিভিন্ন সুবিধা বহাল থাকছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে মোবাইল ফোনের উৎপাদনের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ এবং ব্যবসায়ী পর্যায়ে ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ আছে। আগামী বাজেটে মোবাইল ফোনের ব্যবসায়িক পর্যায়ে ভ্যাট বাড়ানো হলে রাজস্ব আদায় বাড়বে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিল জমা দিলে রেয়াত পায় প্রতিষ্ঠানগুলো। আগামী অর্থবছরের বাজেটে এই সুবিধা প্রত্যাহার করে নেওয়ার প্রস্তাব থাকছে। ভ্যাট জালের আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি আদায়ে স্বচ্ছতা এনে ভ্যাট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা হবে। এজন্য ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) সরবরাহে জোর দেওয়া হচ্ছে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, বড় বাজেটে এনবিআরের রাজস্ব আহরণের উপায়গুলোতে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে।
বৈঠকে আরও জানানো হয়েছে, আগামী অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আহরণে ভ্যাট প্রধান খাত। এরপর আয়কর। সবচেয়ে কম ধরা হয়েছে শুল্ক খাতে। এনবিআর স্বাভাবিকভাবে যে পরিমাণ শুল্ক-কর আদায় করে, আগামী অর্থবছরে (২০২৩-২৪) তার অতিরিক্ত ৬৫ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে। সম্পদশালীদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হবে। শুধু বেশি সম্পদ থাকার কারণে অতিরিক্ত কর সারচার্জ বহাল থাকছে। আগামীতেও সুপার ট্যাক্স গ্রুপকে উচ্চ হারে গুনতে হবে কর। অর্থ পাচার থেকে রাজস্ব আদায়ে কঠোর আইনি শাসন থাকবে। অর্থ পাচার আটকাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হবে। করপোরেট কর কমানোর দাবি থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। আগামীতে নতুন করদাতা সংগ্রহে জোর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নতুন করদাতা সংগ্রহে রাজস্ব কর্মকর্তাদের শহরের পাশাপাশি উপজেলাপর্যায়েও জোর বাড়াতে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে করদাতাদের হয়রানি না করা এবং সততায় জোর দিতে বলেন।
বৈঠকে জানানো হয়, ডলারের ওপর চাপ কমাতে বিলাসবহুল পণ্য আমদানি কমাতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। তৈরি পোশাক খাতের সব সুবিধা বহাল থাকছে।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীকে আইএমএফের অন্যান্য সংস্কার প্রস্তাবের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বিষয়ে জানানো হয়। এর মধ্যে রয়েছে, আগামী বাজেটে জ্বালানি মূল্যের ব্যাপারে সময়ভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করা, ঋণের সুদহার বাজারভিত্তিক করা, প্রচলিত বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে মুদ্রাবিনিময় হার নির্ধারণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা কাঠামো শক্তিশালী করা, রিজার্ভের পরিমাণ বাড়ানো।
বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার বলেন, বাস্তবায়নের সুবিধায় নতুন মুদ্রানীতির বেশিরভাগ আগামী বাজেটে সমন্বয় করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
