উপভোগ করেছি ছয় দশকের জয়-পরাজয়

আপডেট : ১৭ মে ২০২৩, ১১:১৬ পিএম

বাংলাদেশের বাম রাজনীতির অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব রাশেদ খান মেনন। ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি। পাঁচবারের সংসদ সদস্য। ছিলেন আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য। তার ৮০তম জন্মদিন সামনে রেখে রাজনীতি, বামপন্থা, জোট রাজনীতি, আগামী নির্বাচন, বর্তমান সরকারসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরকে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী

দেশ রূপান্তর : প্রায় ছয় দশকের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন আপনার। পেছন ফিরে তাকালে এই অভিজ্ঞতাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

রাশেদ খান মেনন : দেখেন এই ছয় দশক বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছি। সময়টা আমার সংগ্রাম, আন্দোলন, সংগঠনের সময়; এর মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক বিজয় অর্জিত হয়েছে আবার বিজয় হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে। একজন অত্যন্ত উৎসুক রাজনীতিবিদ হিসেবে এই দুটি বিষয়ই আমি উপভোগ করেছি। এই সমস্ত সময়কালের যতই বাধা থাক না কেন, সেগুলোকে আমি অতিক্রম করেই এসেছি। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে আমি কয়েকটি বড় আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। তারমধ্যে একটা হলো ষাটের দশকের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, যেটা আরও বিস্তৃত রূপ নেয় ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলনে। এর মধ্য দিয়েই কার্যত আমি রাজনীতির সামনের কাতারে চলে আসি। এবং সমস্ত ষাটের দশক জুড়েই ছাত্র আন্দোলনের যে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রয়েছে তার সঙ্গে আমি যুক্ত ছিলাম। দ্বিতীয়ত, আমি এদেশের মানুষের স্বাধীনতা এবং মুক্তির যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। একজন মানুষের জীবনে হাজার বছরে এ ধরনের একটা সুযোগ বিরল। সেই মুক্তিযুদ্ধের মতোন একটি মহান ঘটনার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে পেরেছি। এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে ছিলাম এবং আছি। তৃতীয়ত, বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে দেড় দশকব্যাপী যে সামরিক শাসনের দাপট এদেশের মানুষকে দেখতে হয়েছে, তার বিরুদ্ধে যে লড়াই, বলতে পারেন যে আশির দশকজুড়ে যে লড়াই সেই লড়াইয়ের সামনের কাতারে আমি ছিলাম। এবং তিন জোটের রূপরেখায় নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের যে ঐতিহাসিক পরিবর্তন সূচিত হয় তার সঙ্গে আমার সরাসরি সম্পর্ক ছিল। তিন জোটের ঘোষণা রচনা, আন্দোলন রচনা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন এর সবটার সঙ্গেই আমি যুক্ত ছিলাম। তারই পরিণতিতে আমরা সংসদে দ্বাদশ সংশোধনী পাস করি। যেখানে আমি সেই কমিটির সদস্য ছিলাম। এই দ্বাদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আবার সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারায় প্রত্যাবর্তন করে।  সুতরাং এই ছয় দশকের আমার রাজনৈতিক পরিক্রমা জয়-পরাজয়সহ আমি উপভোগ করেছি। কেবল উপভোগ করেছি তা-ই নয়; বরং আমি মনে করি আমার যতখানি দেওয়ার আমি ততখানিই দিতে চেষ্টা করেছি।

দেশ রূপান্তর : রাজনীতির প্রতি আকর্ষণ কীভাবে জন্মালো?

রাশেদ খান মেনন : দেখেন আমাদের পরিবার..., আমার আব্বা বিচারক ছিলেন, তিনি জজ ছিলেন। কিন্তু আমার বড় তিন ভাই সাদেক খান, ওবায়দুল্লাহ খান, এনায়েতুল্লা খান। সেই সময়কার সাম্যবাদের যে দর্শন এদেশের তরুণদের আবেগে আপ্লুত করত, তাদের টেনে নিত তারা তিনজন তারই সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এবং তারা তিনজনই ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সাদেক খান ভাষা আন্দোলনের সংগঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। আর ওবায়দুল্লা খান তিনি সেই প্রথম ১০ জনের মধ্যে ছিলেন, যারা ১৪৪ ধারা ভেঙেছিলেন। কেবল তা-ই নয় তিনি ’৫২-এর সেই গুলির পর যে কবিতা লেখেন সেই কবিতা আজ পর্যন্ত প্রতিটি একুশে ফেব্রুয়ারিতে উচ্চারিত হয়। তিন নম্বর ভাই এনায়েতুল্লা খান, তিনিও ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে, ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং আনন্দমোহন কলেজ, হরগঙ্গা কলেজের ভিপি, পরে ঢাকা হলের ভিপি ছিলেন। এই প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি তার ভূমিকা রেখেছেন। এই যে পারিবারিক আবহ, এই আবহই আমাকে কার্যত রাজনীতিতে নিয়ে আসে। এটা ঠিক যে আমি রাজনীতি করব এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনীতিতে আসিনি। বরঞ্চ ওবায়দুল্লা খানের মতো আমলা হব এ ধরনের একটা চিন্তা মাথায় কাজ করত। কিন্তু ’৬১-এর সেই দমবন্ধ করা পরিবেশে যখন আমরা প্রথম রবীন্দ্র শতবার্ষিকী পালনের মধ্য দিয়ে সামরিক শাসনের বাঁধ ভাঙলাম তার পর থেকে একটির পর একটি রাজনৈতিক ঘটনায় আমি জড়িয়ে পড়েছি। এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক কর্মীতে রূপান্তরিত হয়েছি। আর সেই সময় তো বাঙালি জাতীয়তার চেতনার বিস্তৃতি ঘটছিল। তার যে প্রতিক্রিয়া, সেটার প্রতিফলনও আমার চিন্তা-চেতনার ওপর পড়েছিল।

দেশ রূপান্তর : ষাটের দশকে ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আপনাদের রাজনীতি চলে গেল আওয়ামী লীগের হাতে, আবার একাত্তরের পরে বিপ্লবী তরুণরা আপনাদের দিকে না এসে চলে গেল জাসদের হাতে বিষয়টাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

রাশেদ খান মেনন : প্রথম কথা হচ্ছে যে, ষাটের দশকে আমরা সর্বজনগ্রাহ্য একটা ছাত্র আন্দোলন গড়ে তুলেছিলাম। আমরা কিন্তু কেবল ছাত্র সংগঠনের নেতা ছিলাম না। আমরা ছাত্র আন্দোলনের নেতা ছিলাম। ছাত্রদের নেতা ছিলাম। ফলে যে যেই দলই করুক তারা কিন্তু আমাদের সম্মানের সঙ্গে, শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখতেন, অনুসরণ করতেন। আমি বামধারার সঙ্গে, কমিউনিস্ট ধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ষাটের দশকের মধ্যভাগে এসে এই বামধারার মধ্যে বিভক্তি দেখা দেয়। জাতীয় প্রশ্নের  চেয়ে বেশি করে আন্তর্জাতিক প্রশ্নকে কেন্দ্র করে। চীন-রাশিয়ার যে মহাবিতর্ক হয়, সেটাকে কেন্দ্র করে। এর প্রভাব আমাদের ওপর পড়েছে। পরবর্তী সময়ে ভারতের নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রভাব আমাদের ওপর পড়েছে। এবং এর ফলে বামধারার রাজনীতি খন্ড-বিখন্ড হয়ে যায়। ধারা-উপধারায় বিভক্ত হয়ে গেছে। এই যে বিভক্তির এই সময়কালেই এখানে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল। সেই চেতনা স্থানটি দখল করে নেয় আর বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির প্রাধান্য সেখানে চলে আসে।

একইভাবে আমরা যদি ’৭১ পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহকে দেখি, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা এই বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলাম। একটা বিশালসংখ্যক যুবশক্তির জন্ম হয়েছিল এই বাংলাদেশে। সেই যুবশক্তিকে সঠিক পথে পরিচালনা করার জন্য যে কমিউনিস্ট পার্টি থাকার প্রয়োজন ছিল, সেটার অনুপস্থিতি ছিল। ফলে ওই যুবশক্তি বৈপ্লবিক সমাজতন্ত্রের বিপ্লবী বুলিতে বিভ্রান্ত হয়ে জাসদের সঙ্গে যায়। এবং খেয়াল করে দেখবেন যে একের পর এক হঠকারী রাজনীতির আশ্রয় নেয়। তারা সেদিনকার রাজনীতির স্থিতিশীলতাকে যেমন নষ্ট করেছে, একইভাবে তারা নিজেরাও ধ্বংস হয়েছে। এই হলো বাস্তবতা।

দেশ রূপান্তর : আমরা জানি চীন-রাশিয়া মহাবিতর্কের ফলেই তো মেনন-মতিয়া গ্রুপ হলো। আপনাদের সম্পর্কটা কেমন ছিল?

রাশেদ খান মেনন : সম্পর্ক সবসময়ই ভালো ছিল। মতিয়া চৌধুরীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক কখনই খারাপ হয়নি। এমনকি যখন আমি মেনন গ্রুপের প্রেসিডেন্ট সে সময়ও আমার স্ত্রীর সঙ্গে প্রেম করার জায়গা ছিল মতিয়ার বাসা। তিনি আমাদের রান্না করে খাইয়েছেন। তখন কিন্তু আমরা পরস্পরবিরোধী অবস্থানে রয়েছি।

দেশ রূপান্তর : মতিয়া চৌধুরীর এখনকার রাজনীতিকে কীভাবে দেখেন? 

রাশেদ খান মেনন : মতিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক এখনো ভালো। তবে মতিয়া তার রাজনীতি থেকে এখন একেবারেই ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছেন। তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনে বিশ্বাস করতেন বলে জানতাম, জানি না সেটা এখনো তিনি করেন কি না। এখন পুরোপুরি কেবল জাতীয়তাবাদী নয়, জাতীয়তাবাদের যে ডান ধারা তার সঙ্গে তিনি যুক্ত হয়ে গেছেন।

দেশ রূপান্তর : ভিয়েতনাম যুদ্ধ বিরোধিতা আপনার রাজনৈতিক জীবনে একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বর্তমান বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদিতা আরও নতুন রূপে ও শক্তিতে ভয়াবহভাবে বিরাজ করছে। এখনকার বিশ্ব পরিস্থিতিতে সাম্রাজ্যবাদ ও তার বিরোধিতাকে কীভাবে দেখেন?

রাশেদ খান মেনন : ভিয়েতনাম যুদ্ধ আমাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। বলতে পারেন আমাদের সেই সময়ের যুব সমাজ তারা যে বিদ্রোহাত্মক হয়ে উঠেছিল তার একটা বড় কারণ ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধ। এবং একই সঙ্গে লাতিন আমেরিকার দেশে দেশে জাতীয় মুক্তির যে সংগ্রাম কিউবা, নিকারাগুয়ায়; অন্যদিকে, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলোর সে সময়কার লড়াই সবই আমাদের উদ্বেলিত করেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে নব্বইয়ের দশকের প্রথমার্ধে এসেই সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব ভেঙে পড়ে। সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্ত হয়ে যায়। এর ফলে একটা বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। আমাদের ভাবনা-চিন্তায়, চলনে-বলনে সব ক্ষেত্রেই। যেখানে দ্বিমেরু পৃথিবী ছিল, সেটা এক মেরুর পৃথিবী হয়ে যায়। এবং সাম্রাজ্যবাদ খুব ভয়ানকভাবেই বিশ্বটাকে তার অধীনস্ত করে নেয়। কিন্তু আজকের বিশ্বে সেই অবস্থাটা নেই। নতুন করে, নতুন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে কভিড উত্তরকালে এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটা নতুন বিশ্বব্যবস্থা জন্ম নিচ্ছে। এখন আবার বহুমাত্রিক মেরুকরণের জায়গায় এসেছে পৃথিবী। সেখানে এমনকি জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলোও অবস্থান গ্রহণ করা শুরু করেছে।

দেশ রূপান্তর : যেমন?

রাশেদ খান মেনন : যেমন বাংলাদেশ। বাংলাদেশ কিন্তু এখন আর একদিকে হেলে পড়ছে না। সে একটা ভারসাম্য বজায় রেখে তার পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। তো এর মধ্য দিয়ে নিজের উন্নয়ন, নিজের অগ্রগতির পাশাপাশি নিজের আকাক্সক্ষার প্রকাশ ঘটানো হচ্ছে। আমি বলব যে সাম্রাজ্যবাদ নিজেই বরং এখন অনেক বড় বিপদের মুখে। এবং ডলারের আধিপত্য, বিশ্বব্যাংকের আধিপত্য, আইএমএফের আধিপত্য ক্ষুন্ন হতে চলেছে।

দেশ রূপান্তর : কিন্তু আমাদের তো আইএমএফের ঋণ নিতে হয়েছে এবং সেটা তাদেরই শর্তে?

রাশেদ খান মেনন : এটা তো আমাদের ডলারের সংকটের কারণে নিতে হয়েছে। কিন্তু আমি মনে করি এটা কোনো সুখকর সিদ্ধান্ত না। এবং এটার মধ্য দিয়ে সরকার নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অনেকটা হারিয়ে ফেলেছে। যার ফলে বিভিন্ন জায়গায় ভর্তুকি প্রত্যাহার, মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদি ঘটছে। যে প্রশ্নগুলো এতদিন আলোচনার মধ্যে ছিল, সেগুলোকে এখন বাধ্যবাধকতার মধ্যে নিয়ে এসেছে আইএমএফ। শোনেন আইএমএফ যেসব দেশে গেছে সে দেশ কখনই খুব একটা উপকৃত হয়নি। আমি মনে করি বাংলাদেশও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

দেশ রূপান্তর : এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আপনি অন্যতম নেতা ছিলেন, তারপর তিন জোটের রূপরেখায় আপনার ভূমিকার কথা বললেন। এরশাদের পতন হলো কিন্তু আপনাদের জোট ব্যর্থ হলো কেন, আপনারা কী চেয়েছিলেন?

রাশেদ খান মেনন : তিন জোটের রূপরেখা আহামরি কোনো বিপ্লবী কর্মসূচি না। এটা ছিল সংসদীয় গণতন্ত্রে উত্তরণের এবং মুক্তিযুদ্ধের পথে দেশ পরিচালনার কর্মসূচি। কিন্তু নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পরেই বিএনপি রাজনৈতিকভাবে জামায়াতকে পুনর্বাসিত করার ফলে রাজনীতিতে একটা বড় ধরনের পরিবর্তন সূচিত হয়। ২০০১ সালে এসে তারা একেবারে রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার হয়ে যায়। এই সমস্ত ঘটনায় সমস্ত রাজনীতিটাই একটা জটিল ও কুটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ে গেছে। ফলে তিন জোটের রূপরেখায় যে আশা-আকাক্সক্ষা ছিল সেটা বাস্তবায়িত হয়নি। 

দেশ রূপান্তর : ১৪ দলীয় জোটের শুরুর সঙ্গে তুলনা করলে জোট এখন কোথায় দাঁড়িয়ে?

রাশেদ খান মেনন : দেখেন আমরা বিজয় লাভ করি, সাফল্য অর্জন করি, কিন্তু আমরা তা ধরে রাখতে পারি না। এখানেও তাই হয়েছে। আমরা বিজয় লাভ করেছি, মধ্যখানে দুই বছরের সেনাশাসন থাকার পরও আমরা গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন করতে পেরেছি। কিন্তু রাজনীতির যে কুটিল আবর্ত তৈরি হয়েছিল এবং যে পলিটিক্যাল বিভক্তি তৈরি হয়েছে আমাদের সমাজে সেটা আমাদের রাজনীতিকে কঠিন জায়গায় নিয়ে ফেলেছে।

দেশ রূপান্তর : শিক্ষা আন্দোলন আপনার রাজনৈতিক জীবনে বিশাল একটা ঘটনা। দেশ স্বাধীন হলো ৫২ বছর, কিন্তু শিক্ষানীতি বাস্তবায়িত হলো না কেন?

রাশেদ খান মেনন : আমরা ২০১০ সালে যে শিক্ষানীতি দিয়েছি, কেবল দিই-ই নি, আমরা পার্লামেন্টে সেটি পাসও করিয়েছি। সেখানে কোনো বিরোধিতা আসেনি। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে এটাকে বাস্তবায়ন করার বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। কারণ, সে পদক্ষেপ নিতে গেলে যে জায়গায় যেতে হবে তাতে মৌলবাদীদের বা উগ্রবাদীদের সঙ্গে  যে সংঘাত সৃষ্টি হবে সেটা করতে বোধ হয় তারা রাজি না। এই দুর্বলতা আমাদের একেবারে প্রথম থেকেই, সেই ’৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর আমল থেকে এখন তো আরও বেশি।

দেশ রূপান্তর : সেই পাকিস্তান পিরিয়ড থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের নানা পর্যায়ে সামরিকসহ নানা ধরনের শাসনব্যবস্থার মধ্যে আপনি রাজনীতি করে আসছেন। বর্তমানে বাংলাদেশে বাকস্বাধীনতা কি ঝুঁকিতে?

রাশেদ খান মেনন : মানে, এক্ষেত্রে ‘যায় দিন ভালো দিন। আসে দিন খারাপ দিন।’ আমাদের হয়েছে সেই অবস্থা। আমরা বাকস্বাধীনতা নিয়ে কথা বলেছি, প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশনস অ্যাক্টের বিরুদ্ধে কথা বলেছি। কিন্তু এখন যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করা হয়েছে সেটা প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশনস অ্যাক্টেরও ঊর্ধ্বে চলে গেছে। ফলে আমি মনে করি না যে, যেই স্পেসটা থাকা প্রয়োজন ছিল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে সেটা আছে।

দেশ রূপান্তর : মন্ত্রিসভার অনেক সদস্যের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। সর্বত্র দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ। আপনি সরকারের অবস্থান কোথায় রাখছেন?

রাশেদ খান মেনন : বাংলাদেশের রাজনীতি এখন মূলগতভাবে একটা ক্ষুদ্র অতি ধনী গোষ্ঠী, সামরিক-বেসামরিক আমলার হাতে বন্দি হয়ে গেছে। এটাকে এক কথায় বলতে পারেন অলিগার্কিক। বাংলাদেশে অলিগার্কিক শাসন চলছে আর কি।

দেশ রূপান্তর : গত ৫২ বছরে বাংলাদেশের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যগুলোর কী অবস্থা এবং আগামীর রাজনীতি কোনদিকে যাচ্ছে?

রাশেদ খান মেনন : আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণায় বলা হয়েছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদাবোধ এবং ন্যায়বিচারের কথা। এই মূল কথার পর ছিল অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কথা ছিল। আমরা এই জায়গা থেকে অনেক দূরে পিছিয়ে গিয়েছি। যদিও অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের উত্তরণ ঘটেছে। কিন্তু, সমাজের মৌল চরিত্র, অর্থনীতির মৌল চরিত্রগুলো পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে একেবারেই ভিন্নভাবে। 

দেশ রূপান্তর : খুব সম্প্রতি নাট্যজন মামুনুর রশীদ বলেছেন ‘বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একটা প্রতিবিপ্লব হয়ে গেছে’। আপনার মন্তব্য কী?

রাশেদ খান মেনন : এটা সম্পূর্ণত হয়েছে, এটা আমি বলব না। তবে অবশ্যই একটা প্রতিবিপ্লব তো হয়েছে বটেই। সমাজটা এখন চলে গেছে সাম্প্রদায়িক শক্তির হাতে, মৌলবাদী শক্তির হাতে। প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর হাতে সমাজটা চলে গিয়েছে। আমাদের ঐতিহ্যগত সংস্কৃতিটা প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। তো উনি যেটা বলেছেন যে প্রতিবিপ্লব ঘটে গেছে, আমরা সে পথেই এগিয়েছি।

দেশ রূপান্তর : আপনার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বড় উল্লেখযোগ্য ঘটনা কী?

রাশেদ খান মেনন : বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধে আমার অংশ নেওয়া। আমি মুক্তিযুদ্ধের অংশীদার, আমি এতে অংশ নিয়েছি। এই মুক্তিযুদ্ধে আমি বিজয় দেখেছি। এর চেয়ে বড় ঘটনা তো আর হতে পারে না।

দেশ রূপান্তর : বঙ্গবন্ধু এবং ভাসানী প্রসঙ্গে বলেন।

রাশেদ খান মেনন : বঙ্গবন্ধু আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। তার কারাগারের রোজনামচা বইতেও আমার কথা আছে। তিনি জেলে থাকার সময় আমিও জেলে গিয়েছি। আমি স্পিকারের ছেলে, ডাকসুর ভিপি হলেও জেলখানায় আমাকে ক্লাস দেয়নি মোনায়েম খান। বঙ্গবন্ধু আমাকে কম্বল দিয়েছেন, ঠা-ার মধ্যে লেপ দিয়েছেন যাতে আমি কষ্ট না পাই। প্রতিদিন সকালবেলা আমাকে চা পাঠাতেন। উনি তো ছিলেন জেলের রাজা। সব না হলেও কিছু কিছু খবরাখবর আমি বাইরে নিয়ে আসতাম আবার বাইরে থেকেও কিছু খবর ওনাকে পৌঁছে দিতাম। যখন বাকশাল করলেন, আমরা তো তার বিরোধিতা করেছি। উনি আমাদের ডেকেছেন, বলেছেন তোরা বাকশালে আমার সঙ্গে আয়। আমরা তাকে বলেছি আপনি সমাজতন্ত্র করেন, তাহলে দেখা যাবে। আমরা বাকশালে যাইনি। উনি কিন্তু আমাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি। আমাদের বলেছেন ‘ওয়েট অ্যান্ড সি, দেখ আমি কী করি।’

দেশ রূপান্তর : এখন বিভিন্ন মহলে নতুন করে বাকশালের কথা শোনা যাচ্ছে, হলে কি যাবেন?

রাশেদ খান মেনন : এটা তো বাড়াবাড়িমূলক কথা, রাজনীতির কথা।

দেশ রূপান্তর : ভাসানীর দল তো আপনি করেছেন, তার বিভিন্ন পদক্ষেপের মধ্যে কন্ট্রাভার্সি দেখে থাকেন অনেকে...?

রাশেদ খান মেনন : ভাসানীর সঙ্গে আমি দীর্ঘদিন কাজ করেছি। আমি ভাসানীর সঙ্গে ন্যাপ করেছি, কৃষক সম্মেলন করেছি। দিনের পর দিন মওলানা ভাসানীর সন্তোষের বাড়িতে তার সঙ্গে থেকেছি। তাকে দেখেছি খুব কাছ থেকে। আমাকে যদি জিজ্ঞেস করেন, তাহলে আমি বলব আমার নেতা হলেন ভাসানী। হ্যাঁ, ওনার অনেক কন্ট্রাডিকটরি আছে। অনেকে ওনার অনেক সিদ্ধান্ত ও কর্মকা-কে উল্টাপাল্টাও বলেন। কিন্তু সে সবেরও প্রেক্ষিত আছে। আমরা ব্যর্থ হয়েছি বলেই তার ওইসব কন্ট্রাডিকটরির পথে যেতে হয়েছে। আপনাদের কাছে যেগুলো কন্ট্রাডিকশন আমি তার সেগুলো বুঝতে পারি।

দেশ রূপান্তর: যেমন?

রাশেদ খান মেনন : ধরেন, শেষ বয়সে গিয়ে তিনি ইসলামি হুকুমত, রবুবিয়াত কায়েম করতে গেলেন। কেন? কারণ, কমিউনিস্টরা তার কাছ থেকে সরে গেছে। তিনি তখন কার ওপর ভরসা করবেন, তিনি তার মুরিদদের ওপর ভরসা করেছেন। এটা তো সোজা হিসাব।

দেশ রূপান্তর : আপনার সব থেকে বড় রাজনৈতিক ব্যর্থতা বা দুঃখের ঘটনা কী?

রাশেদ খান মেনন : ছাত্র ইউনিয়নের বিভক্তি। যদিও পরবর্তী সময়ে খেটেখুটে ছাত্র ইউনিয়নকে বৃহত্তর সংগঠন হিসেবে দাঁড় করিয়েছি, কিন্তু আগের যে সেটিসফেকশন সেটা আর পাইনি।

দেশ রূপান্তর : দেশের বাম রাজনীতির পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ কী দেখছেন? এখনকার বিভক্তিময় বাম রাজনীতির জন্য তো আপনিও দায়ী...।

রাশেদ খান মেনন : নিশ্চয়। আমরা সবাই দায়ী। আমি তো মনে করি ছাত্র ইউনিয়ন যদি বিভক্ত না হতো, মানে ছাত্র ইউনিয়নই এদেশের বৃহত্তম প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে, ছাত্র যুবকদের রাজনীতির মঞ্চে নিয়ে আসতে পারত। ছাত্র ইউনিয়নের বিভক্তি আমাদের সেই শক্তিকে ক্ষুন্ন করেছে। পরবর্তী সময়ে যে বিভিন্ন ধারা-উপধারায় বিভক্তি, তা এদেশের বাম রাজনীতির ধারাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আর এখন তো আমরা, আমি নিজে রাজনীতির অবসরকালীন অবস্থায় চলে গেছি প্রায়। ভাবছি অবসর নেব। এখন নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে। এখন চ্যাট জিপিটির সময়, এআইয়ের সময়, এই সময়ে আমরা কিছুটা মানিয়ে চলতে পারলেও একে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব না। এ জন্য নতুনদের দরকার।

দেশ রূপান্তর : তরুণরা তো আরব বসন্ত, তারপর আমাদের সড়ক আন্দোলন যেভাবে হয়েছিল সেভাবে সংগঠিত হচ্ছে...

রাশেদ খান মেনন : দেখেন এগুলো হলো রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘স্ফুলিঙ্গ তার পাখায় পেল ক্ষণকালের ছন্দ/ উড়ে গিয়ে ফুরিয়ে গেল সেই তার আনন্দ’। আমরাও তো ষাটের দশকে, ঊনসত্তরে এর চেয়েও বড় গণঅভ্যুত্থান করেছি। তো তাকে একটা জেনারালাইজড করা, তাকে একটা কার্যকর রূপ দেওয়া দরকার। সড়ক আন্দোলন হয়েছে, কিন্তু তারপরে আমরা নিরাপদ সড়কের জন্য একটা আইন পর্যন্ত করতে পারিনি। তো এসবকে একটা সুনির্দিষ্ট পথে রাজনৈতিক ধারায় নিয়ে আসতে তারা পারেনি। তবে আমি আশাবাদী, আমি বিশ্বাস করি যে আমরা চলে যাব, নতুন প্রজন্ম নিশ্চয়ই দায়িত্ব হাতে নেবে।

দেশ রূপান্তর : ৮০তম জন্মদিনে আপনি কি কোনো বার্তা দিতে চান?

রাশেদ খান মেনন : একটা কথাই বলতে চাই। আমাদের এক কবি ছিল মাহবুব, সে একটা কথা বলত ‘হে অস্থির যুবকেরা শোনো, হতাশাই শেষ কথা নয়/ যন্ত্রণার গান একদিন শেষ হবে/ তারপর জন্ম হোক আশার আশ্বাসে নতুন শিশুর।’ আমি সেই দিনের জন্য বসে আছি।

দেশ রূপান্তর : আপনাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা এবং সময় দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ।

রাশেদ খান মেনন : আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত