লাইক, কমেন্ট আর ভিউয়ের মোহে বধির হয়ে আছে মানুষ। যার নিমিত্তে মানুষের অন্তর থেকে চলে গেছে পরকালের ভয়। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে মানুষের ভিড় হয় ঠিকই ‘উদ্ধার করতে নয়, লাইভ টেলিকাস্ট ও ভিডিও করতে।’ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে মানুষটি ব্যথায় ছটফট করছে, হাসপাতালে নেওয়ার কেউ নেই। মৃত্যুর যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, পানি পান করানোর কেউ নেই। সবাই ব্যস্ত লাইভ, ভিডিও ও ছবি তোলা নিয়ে।
আমার এক সহপাঠীর আব্বার জানাজায় উপস্থিত ছিলাম। ওই জানাজায় দেখলাম, সবাই মোবাইল দিয়ে চারপাশ থেকে ভিডিও ধারণে ব্যস্ত। রাস্তায়, মৃতের সামনে, ডানপাশে, বামপাশে সবাই প্রচ- ব্যস্ত ছবি আর ভিডিও ধারণে। এমনকি কাতারে দাঁড়িয়েও অনেকে ছবি ও ভিডিও করছে।
আচ্ছা, এই ছবি বা ভিডিওগুলো নিয়ে তারা কী করবে? হয়তো দু-তিনটি ছবি ফেসবুকে আপলোড করবে। ক্যাপশনে লিখবে, অমুকের আব্বার বিদায়ের হৃদয়বিদারক মুহূর্ত, অমুকের আব্বার জানাজার কিছু মুহূর্ত, অমুকের আব্বাকে বিদায় দিতে উপস্থিত বিশাল এক বহর ইত্যাদি! এটা কী সওয়াব পাওয়া যাবে এমন বিষয়? মোটেও না। এর উদ্দেশ্য কেবল কিছু লাইক ও কমেন্ট পাওয়া, আইডির কিছু রিচ বাড়ানো। যারা ভিডিও ধারণ করে, তারা ভিডিওতে আবেগমাখা সুর ব্যবহার করবে, যাতে সবাই সেই ভিডিওর প্রতি আকৃষ্ট হয়। এতে তাদের কিছু ভিউ হবে। উল্লিখিত কারণ ছাড়া আমি আর কোনো কারণ দেখি না।
জানাজায় মানুষের শরিক হওয়ার উদ্দেশ্য হলো, তাদের অন্তরে যেন মৃত্যুর ভয় প্রবেশ করে, পরকালের কথা স্মরণ হয়। এ জন্যই হাদিসে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে ও পুণ্যের আশায় কোনো মুসলমানের জানাজায় শরিক হয় এবং তার জানাজা আদায় করে ও দাফন সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত সঙ্গে থাকে, সে দুই কিরাত সওয়াব নিয়ে ফিরবে। প্রতিটি কিরাত হলো উহুদ পর্বতের মতো। আর যে ব্যক্তি শুধু তার জানাজা আদায় করে, তারপর দাফন সম্পন্ন হওয়ার পূর্বেই চলে আসে, সে এক কিরাত সওয়াব নিয়ে ফিরবে। সহিহ বোখারি : ৪৭
জানাজায় অংশগ্রহণের এমন প্রতিদান আল্লাহ রেখেছেন, যাতে বান্দা জানাজার নামাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ হয়, জানাজায় শরিক হয়। কবরস্থানে যাওয়ার ফলে যেন মানুষের অন্তরে পরকালের ভয় আসে। যেন ভাবে, ‘এই কবের শায়িত আছেন আমার চেয়ে অধিক ক্ষমতাশালী, ধনবান ব্যক্তি, গণ্যমান্য ও কত বাহাদুর! আজ সবাই ক্ষমতাহীন, নিরুপায়! চাইলেই কিছু বলতে পারছেন না, করতে পারছেন না। আমিও একদিন এই জগতের বাসিন্দা হবো। নিজেকে শুধরে নিই।’
কিন্তু আমরা? আমরা কেন উপস্থিত হই? ছবি তোলার জন্য নাকি ভিডিও করার জন্য? নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে? নাকি আত্মীয়তা রক্ষার জন্য? আপনি যেই উদ্দেশ্যে যান সেই উদ্দেশ্য হাসিল হবে কিন্তু কোনো সওয়াব পাবেন না। আপনার মতো আরও একজন গেল তার উদ্দেশ্য পুণ্য লাভের, ফলে সে সওয়াব পেল আর আপনি খালি হাতে ফিরে এলেন। আপনি তো এখন বড় হয়েছেন, আপনাকে লাভ-লোকসানের হিসাব-নিকাশ শেখাতে হচ্ছে না। নিজেই তো বুঝেন, জানেন। এটা কেন বুঝছেন না বা বুঝে আসছে না?
আরেকটা বিষয় ইদানীং বেশি দেখা যাচ্ছে, তা হলো জানাজার মাঠকে রাজনীতির মঞ্চ বানিয়ে ফেলা। মৃত ব্যক্তি খাটিয়ায় ও মুসল্লিরা কাতারে দাঁড়িয়ে রোদে পুড়ছে, ওদিকে নেতৃত্বস্থানীয়রা ব্যস্ত ভাষণ নিয়ে। কী একটা অবস্থা আমাদের দেশের!
