বাঙালির উত্তরাধিকারে সম্পত্তির লালসা

আপডেট : ২৩ মে ২০২৩, ০৯:৫৮ পিএম

সম্ভোগের ভেতর এই যে মুক্তিলাভের কুহক, তা থেকে বাঙালি আজও মুক্তি পায়নি। আত্মবৈরাগ্য বিলাসী এই জাতি কিন্তু সংসারবৈরাগ্য গ্রহণে অনিচ্ছুক। যে ধর্ম-দর্শন মানবজীবনকে সর্বদুঃখের হেতু এবং অন্ধমায়া মনে করে সংসার জীবনকে ঘৃণা এবং অস্বীকার করে পরিত্যাগ করেছে, সেই আত্মনিগ্রহের জৈন এবং বৌদ্ধধর্ম কিন্তু গ্রহণ করল না বাঙালি। গৌতম বুদ্ধের মহানির্বাণ তাই বাঙালি চিত্তে কৌতূহল সৃষ্টি করলেও গ্রহণে আগ্রহ জাগায়নি।

প্রচণ্ড হৃদয়াবেগ এবং ইন্দ্রিয় আসক্তিতে ডুবন্ত এই জাতি ব্রাহ্মণ্যবাদের নির্দয় বর্ণবাদী অপমানকর জীবনে প্রশান্তির আশ্রয় খুঁজেছে ইন্দ্রিয়ভোগের সামাজিক আর পারিবারিক অধিকারে। ব্রাহ্মণ্যবাদী মনুষ্যত্ববিরোধী বর্ণাশ্রমশ্রেণির ঘৃণ্য জীবন থেকে মুক্তির জন্য বাঙালিরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে, তা একটি মাত্র সত্য। অপর সত্যটি হচ্ছে ইসলামের বৈরাগ্যবিরোধিতা এবং পরকালের পাশাপাশি ইহকালের স্বীকৃতি। ইসলামের ইহকালবাদ, তথাকথিত মুক্তির নামে আত্মনিগ্রহের বৈরাগ্যের প্রতি অনাস্থা, সংসার বন্ধন এবং ইন্দ্রিয় পরিতৃপ্তির মধ্য দিয়ে ধর্মসাধন পদ্ধতি বর্ণবাদে নিষ্পেষিত বাঙালির একাংশকে আকৃষ্ট করেছে। ওদিকে বৈষ্ণবের রাধাকৃষ্ণের দেহলীলা, বাউলের দেহাশ্রয়ী সাধন পদ্ধতি আজও বাঙালিকে আকর্ষণ করে। এসব তো এমন এক ধর্ম পদ্ধতি যা জীবনকে দেয় ইন্দ্রিয় সুখভোগের অধিকার, কিন্তু উদাসীন করে রাখে এবং অমনোযোগী হতে উৎসাহ জোগায় সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কর্তব্যে।

উনিশ শতকে কলকাতা-কেন্দ্রিক বাঙালির জ্ঞান-বিজ্ঞান তথা বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা মূলত কেন্দ্রীভূত ছিল উচ্চবর্গের হিন্দুশ্রেণির ভেতর। এক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ নিচু বা মধ্যমবর্গ হিন্দুরা যেমন, তেমনি বঞ্চিত ছিল মুসলমান সমাজ, বিশেষ করে পূর্ববঙ্গের মুসলমান। অর্থনৈতিক কারণ তো বটেই, তার ওপর আশরাফ মুসলিমের ইংরেজি ভাষাবিদ্বেষও এর জন্য দায়ী। আরও একটি বাস্তব সত্য হচ্ছে জাতিবৈরী হিন্দু মানসিকতা। উচ্চবর্গের হিন্দু সম্প্রদায় দখল করেছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। সেই সমাজ নিচুবর্ণের হিন্দু এবং মুসলমানদের শিক্ষার অধিকারকে অস্বীকার করে। তাদের বিদ্রুপ করে তৎকালে উচুবর্ণের শিক্ষিত হিন্দুরা যেসব প্রবচন ও ছড়া তৈরি করেছিল, তা আজও প্রবীণদের অনেকেরই স্মরণে আছে। এমন একটি প্রবচন ‘হ্যাক আর চাড়ালের পুতে শিলট হাতে ইসকুলে যায়/ বামুন আর কায়েতের ক্ষেতের ধান ছাগলে খায়।’

মূলত পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরই এই অঞ্চলে আধুনিক শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হয়। কিন্তু এই শিক্ষার চালিকাশক্তি সম্পূর্ণই দখলে ছিল বিভাগপূর্ব মুসলমান শিক্ষিত বিত্তবান গোষ্ঠীর হাতে। প্রকৃত অর্থে পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি শিক্ষা এগিয়ে আসে একাত্তরের পর। একাত্তরের যুদ্ধটা শিক্ষার পুরাতন বৃত্তকে ভেঙে দেয়। স্বাধীনতার পরপর রাতারাতি যত্রতত্র অবিশ্বাস্য গতিতে স্কুল-কলেজ গড়ে উঠতে থাকে। কিন্তু অচিরেই স্বাধীনতার স্বপ্নভঙ্গের ভেতর দিয়ে চরায় এসে আটকে যায় স্বপ্নের ভাঙা তরী। সেই শূন্যতা ঝড়োগতিতে পূর্ণ করে মাদ্রাসা শিক্ষা। শিক্ষা দখলে চলে যায় ধর্মের। স্বাধীনতার  ভেতর দিয়ে যতটা এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল বাঙালির, তা আর হলো না। প্রাচীন বাঙালি রাষ্ট্র আর সমাজ সম্পর্কে যে দায়িত্বজ্ঞানহীন, উদাসীন বৈরাগ্য মনের চর্চা করত, আজকের বাঙালিও তাই করে। বাঙালির রাজনীতিচর্চা মোটেই রাষ্ট্রকেন্দ্রিক নয়, বরং আত্মকেন্দ্রিক অর্থাৎ আত্মপ্রতিষ্ঠামুখী। যে প্রাণধর্ম জাতিটির শক্তির উর্বর ভূমি হওয়ার কথা ছিল, তা আদর্শিক দুর্বলতায় মুখ থুবড়ে পড়ে।

শত শত বছরের উত্থান-পতন, অর্জন-বিসর্জনের ভেতর দিয়ে যে জাতির নব রূপান্তর ঘটে, বাঙালির তা ঘটল না। তাদের পূর্বপুরুষ যেমনি জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সুখ-দুঃখ আর অনুভবকে, হৃদয়াবেগকে প্রতিস্থাপন করত পদাবলী গানে, ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালীর মায়াবী সুর ও কথায়, কিংবা গীতি কবিতায় এবং রূপকথার কুহকে, তেমনি অনার্জিতই থেকে গেল উত্তরপুরুষের হাতে মহাকাব্য আর বিশ্বমানের সাহিত্য। সাংসারিক জীবনের সংকীর্ণ সুড়ঙ্গের পথে নেমে যাওয়ার দরুন পারল না মননের গভীরতায় পৌঁছাতে। দু’চোখে শস্যের স্বপ্ন নিয়ে ঋতুর আবর্তে বিমোহিত হয়ে রইল যে, সে তো ভীরু মন নিয়ে গেল না রাজ্যবিজয়ে, ভাবল না দিগি¦জয়ের কথা। যে জাতি শাসক হিসেবে বরণ করে নেয় বারেবারে বহিরাগত রাজ্যলিপ্সুকে, তার কাছে তো মহাকাব্য-মহাকবি স্বপ্নেরও অতীত। সে কেবল সংকীর্ণ সংসারের সুখ-দুঃখের গান গাইল। যে জাতি মহাকাব্য রচনা করতে পারল না, সে জাতিই কিন্তু হাস্যরস কৌতুক, রঙ্গরস, রগড় করে সৃষ্টি করল হাজার লক্ষ অশ্লীল ছড়া, প্রবাদ, গান এবং কাহিনি। হাজার বছরের প্রাচীন সেসব সৃষ্টি বাঙালি আজও স্মৃতি এবং জনশ্রুতিতে টিকিয়ে রেখেছে। সংগ্রহ করে বই আকারে প্রকাশ করলে লাখ লাখ পৃষ্ঠা ভরে যাবে। সে সৃষ্টি আজও চলছে প্রকাশ্যে, অপ্রকাশ্যে। আড্ডায়, পারিবারিক-গার্হস্থ্য পরিবেশে সেসবের চর্চা চলে শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবার মধ্যেই। বাঙালির অপভাষা, অশ্লীল শব্দ সংগ্রহ করলে হাজার বিশ্বকোষ পূর্ণ হয়ে যাবে। এতে বিস্ময়ের কিছু আছে কি?

একথা ঠিক নয় যে, প্রাকৃতিক পরিবেশ, জলবায়ু, পললভূমির সহজ কৃষি-উৎপাদন বাঙালিকে অলস আত্মকেন্দ্রিক করে রেখেছে। পৃথিবীর বহু দেশ আছে যেখানে পলল ভূমির অভাব নেই, কৃষিও ক্লেশকর নয়। জলবায়ুও অপূর্ব, চিরবসন্ত। সেসব দেশের জনগোষ্ঠী তো বাঙালির মতো অলস কামকাতর নয়? তাদের উদ্ভাবনী শক্তি এবং রাষ্ট্রভাবনা ব্যক্তিসংকীর্ণতায় আচ্ছন্ন নয়। অথচ বাঙালির রাষ্ট্রভাবনা তার সংকীর্ণ ব্যক্তিভাবনাকে ডিঙিয়ে যেতে পারে না। যুদ্ধবিগ্রহের প্রতি অনীহা অনিচ্ছুক এই জাতিকে ইতিহাসের ক্রান্তিলগ্ন কোনো কোনো সময় বাধ্য করেছে অস্ত্র হাতে তুলে নিতে। অবশ্যই সেসব অগ্নিবলয়ের সঙ্গে তুলনীয় নয়, তারা বরং ক্ষুদ্র ক্ষণস্থায়ী স্ফুলিঙ্গ-ফুলকির মতো।

পলাশীর যুদ্ধে ক্লাইভের বাহিনীতে কেবল ইংরেজ সৈন্যই ছিল না, কিছুসংখ্যক অবাঙালি ভারতীয় বিভিন্ন যোদ্ধাজাতির ভাড়াটে সৈন্যও ছিল। ওরা ধর্মে হিন্দু-মুসলমান উভয়ই ছিল একথা মিথ্যে নয়। আশ্চর্য এই, বাংলার নবাবের বাহিনীতে কোনো বাঙালি সিপাই ছিল না। অধিক বিস্ময় এই, নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ-দেখা কিংবা কামানের শব্দে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে-যাওয়া, স্মৃতি ও শ্রুতিতে ধারণ করা অলস ভীতু ইন্দ্রিয়পরবশ অথচ করুণরসের মহারসিক বাঙালি নবাব সিরাজের বীরত্ব-সাহস নিয়ে লিখল না ইতিহাস, নাটক কিংবা মহাকাব্য–বীররসের। বাঙালি লিখল নবাবের পতনের কল্পকথার করুণ রসের সাহিত্য এবং যুগ যুগ ধরে পলাশীর করুণরসে সিক্ত করল নিজেদের অন্তর।  অথচ যুদ্ধশেষে পলাতক নবাব এবং তার অনুগত সৈন্যদের ইংরেজের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে গুপ্তচরের মতো বাঙালিরাই। কী ভয়ংকর দ্বিচারিতা!

এই বাংলায় প্রথম যিনি নবাব সিরাজের শৌর্যে-বীর্যে, পতনে, দেশপ্রেমে অনুপ্রাণিত হয়ে ইংরেজের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিলেন, সেই সুভাষচন্দ্রকে ‘নেতাজী’ পদবি দিয়ে যেন ইয়ার্কি করল বাঙালি। সুভাষ প্রবর্তিত ২৩ জুন ‘পলাশী দিবস’কেও জাতীয় দিবস হিসেবে তারা গ্রহণ করল না। বাঙালির কলঙ্ক এই যে, যেদিন ইংরেজশাসিত ভারতবর্ষে নেতাজী সুভাষচন্দ্র মিছিল নিয়ে ইংরেজ বিজয়ের স্মারক কলকাতার মনুমেন্ট ভাঙতে গেলেন কুড়াল কাঁধে তুলে, সেদিন বাংলার প্রাদেশিক সরকারের পুলিশ দেশপ্রেমিক জনতার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তখন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন ফজলুল হক, বাংলার কি হিন্দু কি মুসলমান, কেউ আস্থা স্থাপন করতে পারেনি তার নেতৃত্বে। গান্ধীমুগ্ধ আর মোহাচ্ছন্ন বাঙালি হিন্দুর কেউ সুভাষচন্দ্রের সার্বক্ষণিক যুদ্ধসঙ্গী হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি, তাই সুভাষকে যুদ্ধসঙ্গী করতে হয় অবাঙালি মুসলমানকে। তার ফৌজে কত শতাংশ বাঙালি সৈন্য ছিল?

বাঙালির সবচেয়ে বড় কীর্তি হলো তার উত্তরাধিকারবোধ। সেই প্রাচীনকালেই সে ভূমির উত্তরাধিকারকে নিশ্চিত করে নিয়েছে। উত্তরাধিকার সম্পত্তিকে ধর্মের সঙ্গে যুক্ত করতে পেরে বাঙালির বড় স্বস্তি। মৃতের পরিত্যক্ত সম্পত্তিপ্রাপ্তির প্রত্যাশা রক্তে যেন প্রশান্তির জোয়ার আনে। এই জনজাতি মূলত কৃষিনির্ভর, সে তো বাড়িঘর আর ফসলভূমি লাভ করে উত্তরাধিকার সূত্রে। তাই এই প্রাপ্তির ঐতিহ্যের প্রতি এত দুর্বল সে। বাঙালির সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতি অনাগ্রহ মূলত এই ভূমির উত্তরাধিকারপ্রাপ্তির সম্ভাবনা না-থাকার কারণে। সমাজতন্ত্র প্রতিহতের জন্য সুকৌশলে ধর্মকে সে সামনে আনে, আড়াল করে সম্পত্তির লালসাকে।

রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও এই জনজাতির বড় পছন্দ সেই উত্তরাধিকার। এই আধুনিক যুগে স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিক হয়েও বাঙালির উত্তরাধিকারী শাসকের প্রতি রয়েছে অগাধ শ্রদ্ধা, বিশ্বাস এবং আনুগত্য। মৃত কিংবা নিহত রাষ্ট্র শাসকের উত্তরাধিকারী যোগ্য কি অযোগ্য তা তাদের বিবেচ্য নয়, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ভূমির উর্বরতা কিংবা অনুর্বরতা যেমনটা বিবেচনায় আসে না। জাতিটির এই দুর্বলতা সাম্রাজ্যবাদীরা জানে বলেই এ ধরনের নেতৃত্বের প্রতি তাদের সমর্থন থাকে। এই উত্তরাধিকারের মায়াবী বন্ধন, তা ছিন্ন হলেই বুঝি বাঙালি হয়ে পড়ে ছিন্নমূল কিংবা সর্বহারা। প্রগতিশীলতার প্রতি অনীহা তথা প্রতিক্রিয়াশীলতা, ধর্মভীরুতা, ধর্মান্ধতা, বিজ্ঞানের প্রতি অনাগ্রহ, বৈজ্ঞানিক মূল্যবোধের প্রতি অমনোযোগিতার মনোভূমি তো বাঙালি লাভ করেছে উত্তরাধিকার সূত্রের সেই কৃষিব্যবস্থা থেকেই।

বাংলাদেশের রাষ্ট্র সীমানার ভেতর বাঙালি আজ তার জাতীয় ঐক্যকেও করেছে লণ্ডভণ্ড। তার রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতির কাঠামোও ভেঙে পড়েছে। সে ভাবিত নয় কোন কোন দুর্বলতার কারণে পলাশীর পরাজয়টা অনিবার্য হয়ে পড়ে তা নিয়ে। নিজেদের অপদার্থতা এবং সাম্রাজ্যবাদকে সুকৌশলে আড়াল করার জন্য সব দোষ ষড়যন্ত্রের ঘাড়ে চাপিয়ে ইতিহাস বিকৃতি করা যায়, কিন্তু তাতে রাষ্ট্র ও জনগণের মঙ্গল হয় না। তাই তো দুইশত পঁয়ষট্টি বছরের পুরাতন স্মৃতির ভেতর ডুবে গেলে চোখের ভেতর স্পষ্ট ভাসে একাত্তরের স্বাধীনতার ভেতর দিয়ে বিগত পাঁচ দশক ধরে বাঙালির রাজপাটে যারা বসে আছে তাদের ছবি! ওই তো মীর জাফর, ওপাশে কে? জগৎ শেঠ নয় কি? ওদের পায়ের তলায় একাত্তরের সিরাজ-উদ-দৌলার রক্তস্রোত। ওপাশে মোহাম্মদী বেগ। আড়ালে হাসছে সাম্রাজ্যবাদ। ওই নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে কে গাইছে আত্মভোলা বাউলের সংসার নিরাসক্তের গান? হ্যাঁ, সে-ই তো উদাসী বাউল। বাঙালি পুরুষ, কাম আর নারী যার ধর্ম এবং সংসারের সাধনসঙ্গী।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত