মাটির টবের জায়গা দখল নিচ্ছে প্লাস্টিক

আপডেট : ২৮ মে ২০২৩, ০৬:৫১ পিএম

রাজধানীর পরিবাগে রাস্তার দু পাশে ফুল, ফল ও নানা জাতের গাছের চারা সাজিয়ে রাখার দৃশ্য মন কাড়বে যে কারও। ফুটপাত কিন্তু দেখে মনে হবে সাজানো-গোছানো এক বাগান। বাহারি রঙের এসব ফুল আর সবুজের সমারোহে সাজিয়েছেন দোকানিরা। এসব নার্সারিগুলোতে দেশি-বিদেশি উন্নত ফলজ, বনজ, শোভাবর্ধনকারী ফুল ও ফল এবং ওষুধি গাছ পাওয়া যায়। এ ছাড়া ফুল-ফলের বীজ ও কীটনাশক, মাটি, সার ও টবও পাওয়া যাচ্ছে।

গত দশ বছর ধরে পরিবাগে ফুটপাতে বিভিন্ন জাতের গাছের চারা বিক্রি করেন মাসুদ রানা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের নার্সারিতে প্রায় ৩০-৪০ প্রজাতির চারা পাওয়া যায়। দশ টকা থেকে শুরু করে দেড়-দুই হাজার টাকারও গাছ রয়েছে নার্সারিতে। যারা একটু শৌখিন মানুষ তারাই মূলত এখানকার ক্রেতা।

সব গাছ কেন প্লাস্টিকের টবে এমন প্রশ্নের জবাবে মাসুদ বলেন, আমরা আগে মাটির টবেই বিক্রি করতাম। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে প্লাস্টিকের টবে বিক্রি করছি। মাটির টব কেউ নিতে চায় না। কারণ প্লাস্টিকের টব সহজে নিয়ে যাওয়া যায়। এসব টব বাসায় নিয়ে আলাদা রশি দিয়ে বারান্দায় টাঙানো যায়। তা ছাড়া পড়ে গেলেও ভাঙার সম্ভাবনা কম। কিন্তু মাটির টব ঝোলানো যায় না। দামও বেশি। তবে আমাদের এখানে মাটির টব না থাকলেও কেউ অর্ডার দিলে নিয়ে আসি।

ওই দোকানে পছন্দের গাছ বাছাই করছিলেন আরমিম আক্তার নামে এক ক্রেতা। তিনি যেসব ফুলের গাছ কিনেছেন তার সবগুলোরই ছিল প্লাস্টিকের টব। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, অ্যালোভেরা, ক্যাকটাস ও লেডি পামসহ বেশ কিছু প্রজাতির গাছ নিয়েছি। এসব গাছ মূলত অল্প আলোতেই বাঁচতে পারে। প্লাস্টিকের টবে গাছগুলো সুন্দর লাগে। তাই ঘরের কালারের সঙ্গে মিল রেখে প্লাস্টিকের টব নিয়েছি। মাটির টবের সব একই কালার। আর এখন মাটির টব পাওয়াও যায় না।

শুধু পরিবাগ নয় রাজধানীর রাজধানীর ধানমণ্ডি, আগারগাঁও, দোয়েল চত্বরসহ বিভিন্ন স্থানে একই চিত্র দেখা গেছে। বিভিন্ন নার্সারিতে এখন সারি সারি প্লাস্টিকের টব দেখা যায়। বিভিন্ন কোম্পানির এসব টবের রয়েছে বাহারি ডিজাইন। ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে দাম রাখা হয় নাগালের মধ্যে। তবে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অসচেতনতার কারণেই মানুষ মাটির টবের পরিবর্তে প্লাস্টিকের টব ব্যবহার করছে।

রাজধানীর আগারগাঁও জহির উদ্দিন নামে এক ক্রেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখানে ৮-১০টি নার্সারি রয়েছে। আমি কোনো দোকানে মাটির টব পেলাম না। আমি প্লাস্টিকের টবে গাছ লাগানোর পক্ষে না। আমার বাসায় অসংখ্য গাছ রয়েছে সবগুলোই মাটির টবে।

তিনি বলেন, টবের মাটি তুলনামূলকভাবে ঠাণ্ডা থাকে। প্লাস্টিকের টবের ক্ষেত্রে খুব তাড়াতাড়ি গরম হয়ে যায়। ফলে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি নষ্ট হয়। আবার যখন গাছ একটু বড় হয় তখন তার চারদিকে শিকড় ছড়িয়ে যাওয়ায় টবের গায়ে গাছের শিকড় ধাক্কা খায়। প্লাস্টিকের টব সূর্যালোকে প্রচণ্ড উত্তপ্ত হওয়ার ফলে এই শিকড় শুকিয়ে যায় এবং গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি নষ্ট হয়।

এদিকে প্লাস্টিকের এমন ব্যবহার পরিবেশর জন্য যেমন ঝুঁকি তেমনি স্বাস্থ্য ঝুঁকিও রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, অসচেতনতার কারণেই মানুষ মাটির টবের পরিবর্তে প্লাস্টিকের টব ব্যবহার করছে। এভাবে পরিবেশ রক্ষার জন্য ঘরে গাছ রাখতে গিয়ে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ প্লাস্টিক পণ্যও। এভাবে প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়লে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

পরিবেশ বার্তার সম্পাদক ফেরদৌস আহমেদ উজ্জ্বল দেশ রূপান্তরকে বলেন, পরিবেশ বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ আমাদের রাষ্ট্রীয় আইনগুলোর বাস্তবায়ন না হওয়া। যার কারণে সর্বত্র দূষণকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হচ্ছে। পলিথিন রাষ্ট্রীয় আইন দ্বারা নিষিদ্ধ হলেও ব্যবহার বন্ধ হয়নি বরং নানান মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে, একই কথা প্লাস্টিকের ক্ষেত্রেও। আজকে ঢাকা শহরের যত নার্সারি রয়েছে সেখানে মাটির টব পাওয়া বিরল কিন্তু প্লাস্টিক টবে সয়লাব। অথচ এই প্লাস্টিকে যত্রতত্র ব্যবহার প্রতিদিন আমাদের পরিবেশ প্রতিবেশকে দূষিত করেই চলেছে। এখন সময় পলিথিন ও প্লাস্টিকে ব্যবহার বন্ধ করে বিকল্প পাটজাত সামগ্রীর দিকে নজর দেওয়া। আরেকটি বিষয় হলো প্লাস্টিক ব্যবসায়ীদের স্পষ্ট জবাবদিহিতার মধ্যে নিয়ে আসা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত