হাফেজ গড়ার সুনিপুণ কারিগর

আপডেট : ২৯ মে ২০২৩, ১০:৪২ পিএম

হাজারো হাফেজের উস্তাদ হাফেজ মোহাম্মদ নূরুজ্জামান। ব্রাহ্মণবাড়ীয়া, হবিগঞ্জ, সিলেট ও তৎপার্শ্ববর্তী এলাকায় তিনি ‘হরষপুরের হাফেজ সাহেব হুজুর’ নামে বেশি পরিচিত। হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার হরষপুর রেলস্টেশনের পশ্চিম পাশে অবস্থিত দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম হরষপুর। হাফেজ নূরুজ্জামান এই প্রতিষ্ঠানে অর্ধ শতাব্দীকাল কোরআনে কারিমের অসামান্য খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। তার হাতেগড়া কোরআনের বাহকরা দেশের গ-ি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বনামধন্য। দেশ-বিদেশের নানাবিধ দ্বীনি খেদমতে নিয়োজিত।

তিনি হবিগঞ্জের মাধবপুর থানাধীন সীমান্তবর্তী ধর্মঘর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামে আনুমানিক ১৯৪৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা কারি আজিজুর রহমান (রহ.) এলাকায় ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার ফজরের জামাতে ইমামতি করার সময় অপরাপর দশজন মুসল্লিসহ নামাজরত অবস্থায় উপর্যুপুরি ব্রাশফায়ারে শাহাদাতবরণ করেন তিনি।

হাফেজ নূরুজ্জামান তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত স্থানীয় গোবিন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। পরে তার বাবা তাকে হাফেজে কোরআন বানানোর জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের হাফেজ তাফাজ্জুল হুসাইন (রহ.)-এর কাছে নিয়ে যান। কোরআন মাজিদের সান্নিধ্যে শুরু হয় তার পথচলা। পরবর্তী সময়ে তিনি আরও কয়েকজন ওস্তাদের সান্নিধ্যে কোরআনের শিক্ষা নেন হাতেকলমে। তাদের অন্যতম হলেন হেফজে কোরআনের অন্যতম শিক্ষক হাফেজ ফয়জুর রহমান (রহ.) ও হাফেজ তাজুল ইসলাম (রহ.)।

হাফেজ নূরুজ্জামান মৃত্যুর আগে ধর্মঘর মাদ্রাসা তাহফিজুল কোরআনের প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষকতা জীবনের প্রায় পুরো সময় তিনি দারুল উলুম হরষপুর হেফজ বিভাগের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন।

হাফেজ নূরুজ্জামান (রহ.) যখন হরষপুর মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন, তখন সেখানে নিয়মতান্ত্রিক হেফজ বিভাগ ছিল না। তার মাধ্যমেই সর্বপ্রথম আধুনিক পদ্ধতিতে ২৪ ঘণ্টার রুটিনে হেফজ বিভাগ চালু হয়। পরবর্তী সময়ে এই হেফজ বিভাগের সুনাম-সুখ্যাতি, দাওরায়ে হাদিসের ক্লাসসমৃদ্ধ মাদ্রাসার পরিচয় ছাপিয়ে যায়।

আক্ষরিক অর্থেই হাফেজ সাহেব হুজুর (রহ.) তার জীবনকে কর্মময় করে তুলেছিলেন। তিনি বলতেন, ‘কাজের নামই জীবন।’ বলতেন, ‘আমি কোনো দায়িত্ব নেব, আর ওই দায়িত্ব যথাযথ পালন হবে না তা হতে পারে না।’ তিনি অসংখ্য ছাত্রকে রাস্তা থেকে তুলে এনে হেফজে কোরআনের সুধায় অবগাহন করিয়েছেন। কিন্তু তিনি নিজে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সনদপ্রাপ্ত আলেম ছিলেন না। কিন্তু এমন অনেক আলেম আছেন যাদের তিনি সন্তানের মতো করে বরং তারচেয়েও বেশি স্নেহ-মমতায় আলেম হওয়ার পথে অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেছেন।

কর্মবীর এই হাফেজ গত শনিবার (২৭ মে) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার ধর্মঘর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর খবরে আলেম সমাজে শোকের ছায়া নেমে আসে। তার জানাজায় দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম, অসংখ্য ছাত্র, গুণগ্রাহী ভক্তরা অংশগ্রহণ করেন।

হাফেজ নূরুজ্জামান (রহ.) জীবনের শেষ কয়েক বছর অসুস্থ ছিলেন। ২০২১ সালে হঠাৎ করেই তার স্মৃতিভ্রম ঘটে। এর মধ্যে বিছানা থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন। আগে থেকেই ডায়াবেটিসজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ছিলেন। এই দুর্ঘটনার পর তিনি আরও দুর্বল হয়ে যান। বন্ধ হয়ে যায় হাঁটাচলা, ওঠাবসা। বাড়িতে রেখেই তারা চিকিৎসা চলছিল।

ইসলামে নিষ্ঠুরতা, কঠোরতা ও রাগান্বিত অবস্থায় শাসনের বিধান নেই। হাফেজ সাহেব হুজুরও ছাত্রদের শাসনের ক্ষেত্রে কঠোর আচরণের পক্ষপাতী ছিলেন না। বরং এমন কাজকে তিনি অজ্ঞতার পরিচায়ক বলে প্রকাশ করতেন। জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা, ব্যক্তিত্ব ও অভিজ্ঞতার আলোকে কোরআন শিক্ষা দেওয়ার আদর্শই তিনি প্রচার করেছেন। তিনি ছিলেন একজন নিরহংকারী ও সদালাপী মানুষ। যার কথার ছন্দে আকৃষ্ট হতো মানুষ দারুণভাবে। বিশেষত সমবয়সীদের আড্ডায় মাতিয়ে তুলতে পারতেন দারুণভাবে।

শুধু কোরআনের হাফেজ গড়ার কারিগরই ছিলেন না, ছিলেন একজন বোদ্ধা পাঠকও। সাহিত্যের প্রতি তার ঝোঁক ছিল স্বভাবজাত। প্রচুর পড়তেন, স্পষ্ট ও শুদ্ধ উচ্চারণে পড়া এবং আবৃত্তির জন্য তিনি ছাত্রদের সুযোগ ‍সৃষ্টি করে দিতেন পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে। এক সময় লিখেছেন দৈনিক আজাদীর সম্পাদকীয় পাতায় ‘দেশের কথা দশের কথা’য়। লিখেছেন বহু প্রবন্ধ-নিবন্ধ। অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হওয়ার মাস কয়েক আগেও মাসিক মদীনায় মাওলানা মহিউদ্দিন খাঁন (রহ.)-এর সঙ্গে তার স্মৃতিচারণমূলক একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্র্তৃক প্রকাশিত ‘ফখরে বাঙ্গাল আল্লামা তাজুল ইসলাম রহ. ও সাথিবর্গ’ গ্রন্থটির ইতিমধ্যে অনেকগুলো সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।

ব্যক্তিজীবনে হাফেজ নূরুজ্জামান এক স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জনক। দয়াময় আল্লাহ মহাগ্রন্থ আল কোরআনের এই খাদেমকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকামে জায়গা দিন। আমিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত