আল্লাহর মেহমান হজযাত্রীদের জন্য উপহার হিসেবে হজের মাসয়ালা, বিধিবিধান, দরকারি পরামর্শ ও হজপালনের উপকারিতা এবং আনুষঙ্গিক বিষয় নিয়ে বিশেষ আয়োজন—
হজের ফজিলত
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘কোন আমল সবচেয়ে উত্তম?’ তিনি বললেন, আল্লাহ ও তার রাসুলের প্রতি ইমান। আবার জিজ্ঞেস করা হলো, এরপর কোন কাজটি সবচেয়ে উত্তম? তিনি বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদ করা। আবার জিজ্ঞেস করা হলো, এরপর কোন কাজটি সবচেয়ে উত্তম? তিনি বললেন, হজে মাবরুর অর্থাৎ ত্রুটিমুক্ত হজ।’ সহিহ্ বোখারি ও মুসলিম
ইহরাম
তালবিয়া পাঠসহ হজ ওমরাহর নিয়ত করাকে ইহরাম বলা হয়। বাংলাদেশি হাজিদের মিকাত বা ইহরাম বাঁধার নির্ধারিত স্থান ‘ইয়ালামলাম।’ যারা প্রথমে মক্কা শরিফ যাবেন, তাদের উড়োজাহাজে আরোহণের আগেই ইহরাম বেঁধে নেওয়া ভালো। কারণ উড়োজাহাজ এ স্থানটি কখন অতিক্রম করে তা আপনার জন্য অনুধাবন করা কঠিন হতে পারে। মনে রাখতে হবে যে, ওমরাহ বা হজ আদায়কারীকে অবশ্যই জেদ্দা পৌঁছার আগেই ইহরাম বাঁধতে হবে। তবে যারা মদিনা শরিফে প্রথমে যাওয়ার ইচ্ছা করেন, তারা ইহরাম ছাড়া রওনা হবেন এবং জেদ্দা পৌঁছে সরাসরি মদিনা শরিফে চলে যাবেন। মদিনা শরিফ থেকে মক্কা শরিফে আসার পথে জুলহুলাইফা (বর্তমান ‘বীরে আলী’ নামে পরিচিত) থেকে ইহরাম বেঁধে মক্কা শরিফে পৌঁছবেন।
ইহরাম বাঁধার সময় লক্ষণীয় বিষয় হলো আপনি কোন ধরনের হজ করবেন। হজে তামাত্তু, নাকি কিরান নাকি ইফরাদ? বাংলাদেশ থেকে যারা যান, তারা সাধারণত তামাত্তু তথা প্রথমে ওমরাহ, তারপর হজ করেন। আপনিও যদি হজে তামাত্তু করতে চান, তাহলে আপনাকে ইহরাম বাঁধতে হবে ওমরাহর। মক্কায় পৌঁছে ওমরাহ পালন শেষে ৮ জিলহজ হারাম শরিফ থেকে ফের যে ইহরাম করবেন সেটি হবে আপনার হজের ইহরাম।
পুরুষের ইহরাম
১. ইহরাম বাঁধার আগে গোঁফ, চুল, নখ, ইত্যাদি কেটে যথারীতি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে সাবান দিয়ে খুব ভালোভাবে গোসল করে আতর-সুগন্ধি ব্যবহার করে তৈরি হয়ে থাকা উচিত।
২. ইহরাম বাঁধার সময় ইহরামের নিয়তে গোসল করা সুন্নত। অসুবিধা থাকলে অজু করলেও চলবে।
৩. সেলাই করা কাপড় খুলে একটি সাদা চাদর নাভির ওপর থেকে লুঙ্গির মতো পরে নিন। আর একখানা চাদর গায়ে জড়িয়ে নিন। যেন দুই কাঁধ ও পিঠ ঢাকা থাকে। ইহরামের পোশাক সাদা এবং নতুন হওয়া ভালো।
৪. নিয়তের সঙ্গে সঙ্গে তিনবার তালবিয়া (লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক ... ) উচ্চ স্বরে পড়ুন। যদি কেউ পড়তে না পারেন তবে অন্য কেউ তাকে পড়িয়ে দিন। তারপর দরুদ শরিফ পড়ুন এবং মোনাজাত করুন।
৫. দুই ফিতার স্যান্ডেল ব্যবহার করুন যেন পায়ের ওপরের মাঝখানের উঁচু হাড় এবং গোড়ালি খোলা থাকে।
মহিলার ইহরাম
১. মহিলাদের জন্য ইহরামের কোনো নির্দিষ্ট পোশাক নেই। মহিলারা সেলাইযুক্ত ওইসব কাপড়-চোপড় পরিধান করবেন, যেগুলো তারা স্বাভাবিকভাবে পরিধান করেন। যেমন : শাড়ি, সালোয়ার, কামিজ, ম্যাক্সি, বোরখা ইত্যাদি। যে কোনো ধরনের আরামদায়ক জুতাও ব্যবহার করতে পারবেন।
২. ইহরাম বাঁধার আগে গোসল করে নিন। গোসল করতে অসুবিধা থাকলে শুধু ওজু করে নিন। চিরুনি দিয়ে খুব ভালোভাবে চুল আছড়িয়ে নিন।
৩. এই গোসল শুধু পরিচ্ছন্নতার জন্য। এ কারণে ঋতুবতী মহিলা এবং শিশুদের জন্যও তা সুন্নত। এর পরিবর্তে তায়াম্মুম করা শরিয়তসিদ্ধ নয়।
৪. যদি মাকরুহ ওয়াক্ত না হয়, তবে ইহরামের নিয়তে সাধারণ নফল নামাজের মতো দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ুন। আর যদি মাকরুহ ওয়াক্ত হয় তবে ওই দুই রাকাত নফল নামাজ ছাড়াই ইহরামের নিয়ত করুন।
৫. নিয়তের সঙ্গে সঙ্গে তিনবার তালবিয়া (লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক ... ) নিম্নস্বরে পড়ুন। যদি কোনো মহিলা পড়তে না পারেন তবে অন্য কোনো মহিলা তাকে পড়িয়ে দিন। তারপর দরুদ শরিফ পড়ুন এবং মোনাজাত করুন।
ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজ
১. সেলাইযুক্ত কাপড় যেমন কোর্তা, পায়জামা, টুপি, গেঞ্জি, মোজা ইত্যাদি ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। কিন্তু মহিলারা সেলাইযুক্ত স্বাভাবিক কাপড় পরিধান করবেন।
২. পুরুষের জন্য মাথা ও মুখমণ্ডল আবৃত করা নিষিদ্ধ, জাগ্রত বা ঘুমন্ত উভয় অবস্থায় খোলা রাখতে হবে।
৩. যেকোনো ধরনের সুগন্ধি, আতর, সুগন্ধি তেল বা সুগন্ধি সাবান ব্যবহার করা নিষিদ্ধ।
৪. ক্ষৌরকার্য করা যেমন : চুল, দাড়ি, গোঁফ ইত্যাদি কামানো বা নখ কাটা বা ছিঁড়ে ফেলা নিষিদ্ধ।
৫. বন্য পশুপাখি শিকার করা বা কাউকে শিকারে কোনোরূপ সাহায্য-সহযোগিতা করা নিষিদ্ধ।
৬. এমন জুতা পরিধান করা নিষিদ্ধ যার ফলে পায়ের ওপরের মাঝখানে উঁচু হাড় ঢাকা পড়ে যায়। কিন্তু মহিলাদের ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ নয়।
৭. স্বামী-স্ত্রী দৈহিক সম্পর্ক, এমনকি ওই সম্পর্কে কোনোরূপ আলাপ-আলোচনা ইত্যাদি নিষিদ্ধ।
৮. ঝগড়া-বিবাদ করা, অশ্লীল কথাবার্তা বলা এমনিতেও নিষিদ্ধ, ইহরামের অবস্থায় আরও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
তাওয়াফ
হজের উদ্দেশে কাবা শরিফের চারপাশে ঘোরাকে তাওয়াফ বলা হয়। তাওয়াফের ওয়াজিবগুলো-
১. তাহারাত অর্থাৎ গোসল ফরজ থাকলে তা করে নেওয়া এবং অজু না থাকলে অজু করে নেওয়া।
২. শরীর ঢাকা।
৩. কোনো কিছুতে আরোহণ না করে তাওয়াফ করা (তবে বৃদ্ধ, অসুস্থ ও রুগ্ণ এবং অক্ষম ব্যক্তির জন্য কোনো কিছুতে আরোহণ করে তাওয়াফ করা জায়েজ)।
৪. ডান দিক থেকে তাওয়াফ শুরু করা।
৫. হাতিমসহ (বায়তুল্লাহর উত্তর দিকে বায়তুল্লাহ সংলগ্ন অর্ধচক্রাকৃতি দেওয়াল ঘেরা জায়গা) তাওয়াফ করা।
৬. সবকটি চক্কর পূর্ণ করা ও
৭. তাওয়াফ শেষে দুই রাকাত নামাজ পড়া।
তাওয়াফের সুন্নাত
১. হাজরে আসওয়াদ থেকে তাওয়াফ শুরু করা,
২. ইজতিবা করা (অর্থাৎ ইহরামের চাদর ডান বগলের নিচ দিয়ে এনে বাম কাঁধে জড়ানো),
৩. হাজরে আসওয়াদে চুমু প্রদান করা বা হাতে ইশারা করে তাতে চুমু দেওয়া,
৪. প্রথম তিন চক্করে রমল করা (অর্থাৎ বীরদর্পে হাত দুলিয়ে দ্রুত পায়ে চলা),
৫. বাকি চক্করগুলোতে রমল না করা,
৬. সায়ী ও তাওয়াফের মধ্যে ইস্তিলাম (হাজরে আসওয়াদে চুমু প্রদান বা হাত কিংবা ছড়ি দিয়ে ইশারা করে তাতে চুমু প্রদান করা,
৭. হাজরে আসওয়াদের সামনে দাঁড়িয়ে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে দুই হাত কাঁধ পর্যন্ত ওঠানো,
৮. তাওয়াফের শুরুতে হাজরে আসওয়াদের দিকে মুখ করা ও ৯. চক্করগুলো বিরতি না দিয়ে পরপর করা।
সায়ী
সাফা-মারওয়া পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে দৌড়ানোকে ‘সায়ী’ বলে। বর্তমানে এ স্থানটুকুর কিছু অংশ সবুজ পিলার দ্বারা চিহ্নিত আছে। সেখানে এসে দ্রুত দৌড়াতে হয়। সায়ী করা ওয়াজিব এবং তাওয়াফ শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই এটা করা সুন্নাত।
সায়ীর ওয়াজিবগুলো
১. পায়ে চলে সায়ী করা,
২. সাত চক্কর পূর্ণ করা,
৩. সাফা ও মারওয়ার মধ্যবর্তী স্থান পরিপূর্ণভাবে অতিক্রম করা।
সায়ীর সুন্নাতগুলো
১. হাজরে আসওয়াদে চুমু দিয়ে সায়ীর জন্য বের হওয়া,
২. তাওয়াফ শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে সায়ী করা,
৩. সাফা ও মারওয়ায় আরোহণ করা,
৪. সাফা ও মারওয়ায় আরোহণ করে কেবলামুখী হওয়া,
৫. সায়ীর চক্করগুলো একটির পর একটি আদায় করা ও
৬. সবুজ স্তম্ভ দুটির মধ্যবর্তী স্থানটি একটু দৌড়ে অতিক্রম করা।
হজের ফরজ
১. ইহরাম বাঁধা।
২. আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা অর্থাৎ ৯ জিলহজের সূর্যাস্ত পর্যন্ত যেকোনো সময় এক মুহূর্তের জন্য হলেও আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা।
৩. তাওয়াফে জিয়ারত করা অর্থাৎ ১০ জিলহজের ভোর থেকে ১২ জিলহজের সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত সময়ের মধ্যে বায়তুল্লাহ শরিফের তাওয়াফ করা।
হজের ওয়াজিব
১. নির্দিষ্ট জায়গা থেকে ইহরাম বাঁধা।
২. সায়ী অর্থাৎ সাফা ও মারওয়ার মধ্যে দৌড়ানো।
৩. সাফা থেকে সায়ী শুরু করা।
৪. তাওয়াফের পর সায়ী করা।
৫. সূর্যাস্ত পর্যন্ত উকুফে আরাফা করা।
৬. মুজদালিফায় উকুফ বা অবস্থান করা।
৭. মাগরিব এবং এশার নামাজ মুজদালিফায় এসে একত্রে এশার সময় পড়া।
৮. দশ তারিখ শুধু জামরাতুল আকাবায় এবং ১১ ও ১২ তারিখে তিন জামরায় রমি-পাথর নিক্ষেপ করা।
৯. জামরাতুল আকবার ‘রমি’ বা পাথর নিক্ষেপ দশ তারিখে হলক অর্থাৎ মস্তক মুণ্ডনের আগে করা।
১০. কোরবানির পর মাথা কামানো কিংবা চুল ছাঁটা।
১১. কিরান এবং তামাত্তু হজপালনকারীর জন্য কোরবানি করা।
১২. তাওয়াফ হাতিমের বাইরে দিয়ে করা।
১৩. তাওয়াফ ডান দিক থেকে করা।
১৪. কঠিন কোনো অসুবিধা না থাকলে হেঁটে তাওয়াফ করা।
১৫. অজু অবস্থায় সঙ্গে তাওয়াফ করা। ১৬. তাওয়াফের পর দুই রাকাত নামাজ পড়া।
১৭. তাওয়াফের সময় সতর ঢাকা থাকা।
১৮. পাথর নিক্ষেপ করা ও কোরবানি করা, মাথা মুণ্ডানো এবং তাওয়াফ করার মধ্যে তারতিব বা ক্রম বজায় রাখা।
১৯. মিকাতের বাইরে অবস্থানকারীদের বিদায়ী তাওয়াফ করা এবং
২০. ইহরামের নিষিদ্ধ কাজগুলো না করা।
আরও পড়ুন—
হজে যাওয়ার আগে কি কি সংগ্রহ করবেন?
হজ সম্পর্কে মহানবী (সা.) যা বলেছেন
মাহরাম ছাড়া নারীরা হজে যেতে পারবেন?
