ডাইংয়ের দূষণে বিপর্যস্ত জনপদ

আপডেট : ০৫ জুন ২০২৩, ০৫:৪৪ এএম

বেড়িবাঁধের ওপর দিয়ে সরু রাস্তাটা এঁকেবেঁকে চলে গেছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার যাত্রামুড়া থেকে ভুলতার গোলাকান্দাইল পর্যন্ত। কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধটির উত্তরের বেশিরভাগ অংশ পড়েছে রূপগঞ্জে আর দক্ষিণের অধিকাংশ সোনারগাঁয়ের অধীনে। বেড়িবাঁধ ধরে যেতে যেতে দুই পাশের আলাদা ভৌগোলিক পরিচয় চোখে না পড়লেও পরিবেশ-প্রকৃতির তফাত চোখে পড়ে স্পষ্টভাবে। বাঁধের উত্তর পাশ ঘেঁষে কালো ও বিষাক্ত পানির খাল, তার পাড়ে ঘরবাড়িসহ নানা স্থাপনা। সবই বিবর্ণ-ধূসর হয়ে উঠেছে। টিনের ঘরবাড়িগুলো মরচে পড়ে জরাজীর্ণ হয়ে গেছে। অনেক গাছপালাই কেবল মরা কাণ্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

অন্যদিকে দক্ষিণের চিত্রটা পুরো উল্টো। যাত্রামুড়া থেকে একটু এগিয়ে গেলে তুলনামূলক কম হলেও দক্ষিণ পাশে কিছু চাষের জমি চোখে পড়ে। উত্তর পাশের খালের মতো নেই কালচে বিষাক্ত পানির খাল।

স্থানীয় লোকজন বলছেন, একসময় উত্তর পাশেও ঢেউ খেলত ফসলের মাঠ। গাছে গাছে ছিল ফুল-ফল আর পাখির কলকাকলি। খাল আর পুকুরে ছিল নানা জাতের মাছ। তবে গেল দুই দশকে কলকারখানার দূষিত ধোঁয়া ও বর্জ্যে তাদের এলাকাটি অনুর্বর হয়ে গেছে। ধূসর হয়ে গেছে জনপদ। মানুষের শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা অজানা অসুখ। পেশা বদলে বাধ্য হয়েছেন কৃষকরা। জেলেরা হয়ে গেছেন রিকশাচালক কিংবা মজুর।

যাত্রামুড়া বেড়িবাঁধ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নানা রঙের তরল বর্জ্য কয়েকটি বড় নালা দিয়ে খালে গিয়ে পড়ছে। এ পানি আবার মিশছে শীতলক্ষ্যায়। খালের অন্য অংশটি দখলে-দূষণে প্রায় ভরাট হয়ে গেছে। যদিও সম্প্রতি খালটি খননের কাজ শুরু হয়েছে।

স্থানীয়রা বাসিন্দা জানান, এমন অসংখ্য নালা এ খালে যুক্ত হয়েছে। কিছু নালা মাটির নিচ দিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাই খাল খনন করে গভীরতা বাড়িয়ে লাভ হবে না। যদি ডাইং কারখানার তরল বর্জ্য ঠেকানো না যায়। তারা জানান, এই এলাকাসহ আশপাশে গত কয়েক বছরে কয়েকশ ডাইং কারখানা গড়ে উঠেছে। প্রতিদিন হাজার হাজার ঘনমিটার বর্জ্য পরিশোধন ছাড়াই নদীও খালে চলে যাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে ডাইংয়ের বর্জ্য এক স্থানে থাকলেও বর্ষায় পানি বাড়লে ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে কৃষিজমি থেকে শুরু করে ঘরবাড়িও নষ্ট হচ্ছে।

বাড়গাঁও ইউনিয়নের বাড়গাঁও গ্রামের বাসিন্দা ইদ্রিস আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগে টিনের ঘর ছিল। কলকারখানার দূষণে ঘরের টিনে মরিচা পড়ে যায়। শুধু তাই নয়, ইলেকট্রিক বোর্ডও নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু প্রতি বছর টিন পাল্টানো সম্ভব হচ্ছিল না। পরে জমি বিক্রি করে নতুন বাড়ি বানিয়েছি। টাকার অভাবে এখনো আস্তর করাতে পারিনি। কিন্তু বাঁচতে তো হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বর্ষায় খালের পানি বেড়ে যায়। ডাইংয়ের দূষিত পানি অনেক সময় ঘরের মধ্যে উঠে যেত। পরে মাটি কিনে জমিও উঁচু করতে হয়েছে।’

একই গ্রামের বাসিন্দা হানিফ মিয়া বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষের পেশা ছিল কৃষিকাজ। বছরের যে ধান হতো তাতে নিজেদের চাহিদা মিটিয়েও বিক্রি করতে পারতাম। কিন্তু গত ১০-১৫ বছর ধরে কোনো ফসল হচ্ছে না। অনেক জমিই বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘বহু প্রতিবাদ আর স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের আশ্বাসেও কাজ হয়নি।’

আরেক বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আগে মাছ ধরে সংসার চলত। ঢাকা শহরের দেশি মাছের চাহিদার অধিকাংশ মেটানো হতো এখানের খাল-বিলের মাছে। কিন্তু এখন খালে পানিও নেই, মাছও নেই। এই পানিতে হাত দিলেও চর্ম রোগ হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের আদি পেশা মাছ ধরা, এখন অটো চালিয়ে সংসার চলে। দুই বছর আগে অটো কিনেছিলাম। অটোর যন্ত্রপাতিতেও মরিচা ধরেছে। রঙ করেও টেকানো সম্ভব হচ্ছে না।’

এক গবেষণায় এখানকার পানিতে উচ্চমাত্রার তেল, গ্রিজ, ফেনল ও অ্যামোনিয়া পাওয়া গেছে, যা মানুষের জন্য খুবই ক্ষতিকর।

পরিবেশ অধিদপ্তর তথ্য বলছে, নারায়ণগঞ্জে তরল বর্জ্য নির্গমন হয় এমন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা পাঁচশোর বেশি। বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি প্ল্যান্ট) আছে ৩৪০টির মতো কারখানায়। এসব কারখানার বর্জ্য শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা নদীতে গিয়ে পড়ছে।

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ আল-মামুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন কারখানাগুলো পরিদর্শন করি। যেখানে অনিয়ম হচ্ছে, সেখানেই ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, ‘ডাইং বর্জ্য যেভাবে পরিবেশ দূষণ করে, তা কমসংখ্যক শিল্পেই দেখা যায়। এসব জায়গায় যখন আমরা গিয়েছি আমাদের যন্ত্র পর্যন্ত বিকল হয়ে গিয়েছিল।’ তিনি বলেন, ‘দূষণ কমানোর ক্ষেত্রে যে মনিটরিং ব্যবস্থা, এটিও জটিল। কারণ পরিবেশ অধিদপ্তর বা অন্যান্য সংগঠন যখন যায় তখন তারা বর্জ্য ফেলে না।’

অধ্যাপক কামরুজ্জামান বলেন, ডাইং কারখানায় ব্যবহার রাসায়নিক পদার্থ নানাভাবে ক্ষতি করে থাকে। এগুলো মানুষের চামড়ার সংস্পর্শে এলে অ্যালার্জিসহ নানা রোগ হতে পারে। এটা যদি মাছের পেটে যায় তাহলে সেই মাছ খেলে মানবদেহেও ওইসব পদার্থ ঢুকবে। দূষিত এ পানি যখন মাটিতে যাচ্ছে, মাটিও দূষিত হচ্ছে। ওই মাটিতে উৎপাদিত শস্য, শাকসবজিও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর।’

তিনি বলেন, ‘ইটিপি সিস্টেম দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। শুধু ইটিপি চালু করলেই হবে না, কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিং করতে হবে। কতটুকু বর্জ্য তারা উৎপাদন করছে আর কতটুকু পরিশোধন করছে, এ হিসাব করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরিফ জামিল বলেন, ‘বস্ত্র শিল্পকারখানা যেসব জায়গায় গড়ে উঠেছে সেখানেই ডাইং দূষণ হয়েছে বা হচ্ছে। এখন এসব প্রতিষ্ঠান অর্থনীতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখন কথা হচ্ছে, তাদের যদি নিয়মের মধ্যে না আনা যায় তাহলে দেশের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে।’

ডাইং দূষণের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপমন্ত্রী বেগম হাবিবুন নাহার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুই শতাংশের মতো ইটিপি স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু কার্যকর হয়নি। আমরা গেলে পরে তারা এসব চালু করে। আবার চলে এলে বন্ধ করে দেয়। আমাদের একার পক্ষে তো সব নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত