সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক

এক বছরেও দৃশ্যমান নয় একীভূতকরণ, ১৮ হাজার কর্মীর মধ্যে ছাঁটাই আতঙ্ক

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ইসলামী ধারার পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের অনুমোদন দেয়।

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০৮ পিএম

পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও একীভূতকরণের (মার্জার) কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় কর্মীদের মধ্যে হতাশা ও ছাঁটাই আতঙ্ক বাড়ছে। নতুন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ দেওয়া হলেও পাঁচ ব্যাংকের প্রায় ১৮ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরির অবস্থান, একক মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা (এইচআরএমএস), পরিচয়পত্র ও সমন্বিত বেতন কাঠামো এখনো কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, নতুন ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ে উচ্চ বেতনে কর্মকর্তা নিয়োগের কার্যক্রম চললেও পুরোনো পাঁচ ব্যাংকের কর্মীদের নতুন প্রতিষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে স্থানান্তরের বিষয়টি কার্যত স্থবির হয়ে আছে। এতে চাকরির নিরাপত্তা, বেতন-ভাতা এবং পূর্বের দায়দেনা নিষ্পত্তি নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন কর্মীরা।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ইসলামী ধারার পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের অনুমোদন দেয়। সে সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের নেতৃত্বে নেওয়া এ উদ্যোগের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, একীভূতকরণের কাজ সম্পন্ন করতে প্রায় দুই বছর সময় লাগবে।

এরপর ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর পাঁচ ব্যাংকে একজন করে প্রশাসক এবং পাঁচজন করে সহকারী প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক রেজল্যুশন বিভাগের (বিআরডি) রেজল্যুশন স্কিম অনুসারে, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়। একই সঙ্গে পাঁচ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখতে ফরেনসিক নিরীক্ষাও শুরু করা হয়।

তবে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম এগোলেও কর্মীদের নতুন ব্যাংকে একীভূত করার প্রক্রিয়ায় একই ধরনের অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

বোর্ড গঠনের পরও থমকে কর্মী স্থানান্তর

একীভূতকরণের শুরুতে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় রাজধানীর সেনা কল্যাণ ভবনে স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রথম সাত-আট মাসে কার্যকর বোর্ড কার্যক্রম বা নিয়মিত সভার দৃশ্যমান অগ্রগতি ছিল না। পরে প্রধান কার্যালয় এক্সিম ব্যাংকের গুলশান কার্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়।

এরপর ২০২৬ সালের ৮ জুন অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কাজী শায়েরুল আলমকে চেয়ারম্যান করে ব্যাংকটির পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৬ জুলাই ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু নতুন পর্ষদ ও এমডি নিয়োগের পরও পাঁচ ব্যাংকের কর্মীদের আনুষ্ঠানিক স্থানান্তর, অভিন্ন পরিচয়পত্র এবং সমন্বিত বেতন কাঠামো চালুর বিষয়ে কার্যকর অগ্রগতি না থাকায় প্রশ্ন উঠেছে।

কর্মীদের অভিযোগ, গত আগস্টে এমডি পাঁচ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে এক সভায় সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে পরিচয়পত্র এবং মাসের শেষ নাগাদ সমন্বিত বেতন কাঠামো চালুর আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে এসেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি।

ফরেনসিক নিরীক্ষা নিয়েও প্রশ্ন

পাঁচ ব্যাংকের আর্থিক অনিয়ম খতিয়ে দেখতে পরিচালিত ফরেনসিক নিরীক্ষার ফল নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। তাদের দাবি, তুলনামূলক কম খেলাপি ঋণের এক্সিম ব্যাংকের সাবেক শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বিভিন্ন মামলা রয়েছে। অন্যদিকে, বেশি খেলাপি ঋণের চার ব্যাংকের অনিয়মের বিষয়ে নিরীক্ষায় কী উঠে এসেছে, তা নিয়ে তাদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।

তবে নিরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর অনিয়মের তুলনামূলক চিত্র এবং মামলাগুলোর প্রকৃত অবস্থা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

এদিকে, একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পাঁচ ব্যাংকের গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধে প্রায় ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যবহারের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি কর্মীদের চাকরি ও বেতন-ভাতার বিষয়টি কীভাবে নিষ্পত্তি করা হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

১৮ হাজার কর্মীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ

কর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরডির রেজল্যুশন স্কিমের ১৭ নম্বর নির্দেশনায় ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর থেকে পাঁচ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে স্থানান্তরের কথা ছিল। কিন্তু পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কারণ দেখিয়ে প্রক্রিয়াটি পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ।

ফলে পাঁচ ব্যাংকের প্রায় ১৮ হাজার কর্মীর মধ্যে চাকরি হারানোর আশঙ্কা, বেতন-ভাতা নিয়ে উদ্বেগ এবং পদ-পদবি নির্ধারণের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই প্রতিষ্ঠানের অধীনে কাজ করলেও কর্মীদের জন্য অভিন্ন মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা চালু না হওয়ায় প্রশাসনিক জটিলতাও রয়ে গেছে।

কর্মীদের দাবি, একীভূতকরণের ক্ষেত্রে তাঁদের আগের চাকরির অভিজ্ঞতা, জ্যেষ্ঠতা, বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা ও অন্যান্য পাওনা কীভাবে বিবেচনা করা হবে, তা দ্রুত স্পষ্ট করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন ব্যাংকে কর্মীদের আনুষ্ঠানিক নিয়োগ বা স্থানান্তরের প্রক্রিয়া এবং ভবিষ্যৎ জনবল কাঠামো সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

দ্রুত সিদ্ধান্তের দাবি

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান একীভূত করার সময় কর্মীদের চাকরির ধারাবাহিকতা, পূর্বের পাওনা এবং নতুন প্রতিষ্ঠানে অন্তর্ভুক্তির নিয়ম নির্ধারণের নজির রয়েছে। তবে কোন কোন দেশে কী পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে, তার নির্দিষ্ট তথ্য ও তুলনামূলক উদাহরণ যাচাই করা প্রয়োজন।

কর্মীদের প্রত্যাশা, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরডি, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক দ্রুত পাঁচ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর, অভিন্ন এইচআরএমএস চালু, পরিচয়পত্র প্রদান, সমন্বিত বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন এবং পূর্বের দায়দেনা নিষ্পত্তির বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেবেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পাঁচ ব্যাংকের প্রায় ৭৫ লাখ গ্রাহক, প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকার আমানত এবং বিপুলসংখ্যক কর্মীর ভবিষ্যৎ এই একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। তাই কর্মীদের অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হলে তা প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম, গ্রাহকদের আস্থা এবং সামগ্রিক আর্থিক খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত