বুয়েট-ঢাবিতে সুযোগ পেয়েও বিষ্ণুর স্বপ্নপূরণে বাধা

আপডেট : ২১ জুন ২০২৩, ০৪:৫০ এএম

বিষ্ণু দাস। জন্ম দরিদ্র পরিবারে। তবুও ছোটবেলা থেকে চালিয়ে গেছেন পড়াশোনা। তার স্বপ্ন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে (সিএসই) পড়বেন। সুযোগও পেয়েছেন সেখানে পড়ার। শুধু বুয়েট নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও (ঢাবি) ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু দারিদ্র্যের সঙ্গে বড় হওয়া বিষ্ণু এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও পড়াশোনার খরচ চালানো নিয়ে পড়েছেন দুশ্চিন্তায়।

গত সোমবার (১৯ জুন) প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, বুয়েটে মেধা তালিকায় বিষ্ণুর স্থান ৬১তম। ঢাবি ভর্তি পরীক্ষায় ‘ক’ ইউনিটে মেধাতালিকায় তিনি ৮১তম স্থান অধিকার করেন। দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েও চিন্তার ভাঁজ বিষ্ণুসহ তার মা-বাবার কপালে। ছেলের স্বপ্ন আদৌ পূরণ হবে কি না; সেই দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা।

বিষ্ণুর পরিবারের সদস্য সংখ্যা সাতজন। পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার সুন্দরদীঘি ইউনিয়নের আরাজী সুন্দরদীঘি শিবেরহাট গ্রামের কুড়েঘরে সবার সঙ্গেই বসবাস। জীর্ণশীর্ণ দুটি কুড়েঘর ছাড়া সেখানে আছে রান্নাঘর। ভূমিহীন মাছ বিক্রেতা বাবা জয়দেব দাশ ও মা জয়ন্তী রানি দাস থাকেন সেখানেই। আর তিন ভাই থাকেন এক ঘরে। আরেকটি ঘরে থাকেন দাদ-দাদি। তিন ভাইয়ের মধ্যে বড় বিষ্ণু। বাকি দুজনের একজন এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে আর সবার ছোট ভাই অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে।

প্রত্যন্ত অঞ্চলের সুন্দরদীঘি উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ ৫ পেয়ে পাস করেন বিষ্ণু। এরপর এলাকাবাসীর সহযোগিতায় ঢাকার নটর ডেম কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ ৫ পেয়ে পাস করেন। অষ্টম শ্রেণিতে তিনি ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিও পান।

বিষ্ণু দাশ জানান, বুয়েটে তিনি সিএসইতে পড়তে চান। কিন্তু বুয়েটে ভর্তি হওয়া ও পড়াশোনা চালিয়ে নিতে যে অর্থের প্রয়োজন, তা তাদের নেই। বাবা গ্রামের বাজারে মাছ বিক্রি করে যা পান; তা দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন। তা ছাড়া বৃদ্ধ দাদা, দাদি আছেন। শৈশব থেকে পরিবারের অভাব-অনটনের মধ্যেই বড় হয়েছেন তিনি।

বিষ্ণুর সাফল্যগাথা নিয়ে সুন্দরদিঘী উচ্চবিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হরিশ চন্দ্র রায় বলেন, ‘বিষ্ণু আমাদের বিদ্যালয়ের একজন মেধাবী শিক্ষার্থী। তার এই সাফল্যে আমরা গর্বিত। বিষ্ণু দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তার বাবা একজন মাছ বিক্রেতা। আড়ত থেকে মাছ কিনে খুচরা বিক্রি করেন। স্কুল ও এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে তাকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেছি। এখন বুয়েটে চান্স পেয়েছে। এটা আমাদেরও গর্বের বিষয়। সবাই যদি একটু সহযোগিতা করে হয়তো সে অনেক দূরে যাবে।’

একই গ্রামের গ্রাম্য চিকিৎসক বিকাশ চন্দ্র রায় বলেন, ‘বিষ্ণু ছোটবেলা থেকেই মেধাবী। এসএসসি পাসের পর এক ধরনের জোর করেই তাকে নটর ডেমে ভর্তি করাই। সবার সহযোগিতায় সে সফল হয়েছে।’

বিষ্ণুর বাবা জয়দেব দাস গতকাল মঙ্গলবার বলেন, ‘রাতে ছেলের ফলাফল শুনে সারা রাত ঘুমাতে পারেনি। একদিকে আনন্দ, অন্যদিকে দুশ্চিন্তা। আড়তে মাছ নিয়ে আর ক-টাকাইবা হয়। সাতজনের সংসার। নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। এলাকাবাসীর সহযোগিতায় ছেলে এত দূর গেছে। এখন ছেলের ভর্তির জন্য কোথায় টাকা পাব? কে দেবে টাকা? সামনে কী হবে এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’

বিষ্ণু বলেন, ‘চান্স পেয়েছি, এখন কীভাবে ভর্তি হব, পড়াশোনা কীভাবে চালিয়ে যাব বুঝতে পারছি না। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন। স্বপ্ন ছিল বুয়েটে সিএসসিতে পড়ার। কিন্তু জানি না এ স্বপ্নপূরণ হবে কি না, নাকি স্বপ্নই থেকে যাবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত