রক্তের বিকল্প নেই। রক্তের প্রয়োজন মেটাতে পারে কেবল রক্তই। জ্ঞানবিজ্ঞানের এত উৎকর্ষের পরেও রক্ত তৈরি করা যায়নি। কিন্তু প্রযুক্তির সহায়তায় সহজে রক্ত জোগাড় করে রোগীদের জীবন বাঁচানোর অনন্য উদ্যোগ নিয়েছেন তিন তরুণ। লিখেছেন টি এইচ মাহির
বাংলাদেশে প্রতি বছর রক্ত সংকটে মারা যায় হাজার হাজার মানুষ। প্রয়োজনের তুলনায় রক্তদাতার সংখ্যা যেমন কম তেমনি সহজে পাওয়া যায় না কাক্সিক্ষত গ্রুপের রক্ত। ফলে ঘটে রোগীর অকাল মৃত্যু। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাতেগোনা কয়েকটি ব্লাডব্যাংক থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সমৃদ্ধ ডোনার পুল গড়ে তুলে সহজেই সমাধান করা সম্ভব এই সংকটের। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তিন তরুণ নিয়েছেন তেমনই এক উদ্যোগ। তারা ব্লাডব্যাগ নামের ওয়েব অ্যাপের মাধ্যমে সারাদেশে একটি সমৃদ্ধ ডোনার পুল গড়ে তুলতে কাজ করছেন, যা বাঁচাবে লাখো মানুষের জীবন।
ব্লাডব্যাগ মূলত একটি ওয়েব অ্যাপভিত্তিক প্রজেক্ট। যাতে রক্ত প্রয়োজন হলে আবেদন করা যাবে সম্পূর্ণ গোপনীয়তার সঙ্গে। এর ফলে মোবাইল নম্বর অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহারের আশঙ্কা কমে যায় অনেকাংশেই। রক্ত প্রয়োজন হলেwww.bloodbag.app লিঙ্কে প্রবেশ করে রোগীর তথ্য দিয়ে ফরম পূরণ করতে হবে। তারপর তা চলে যাবে ব্লাডব্যাগের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন টেলিগ্রাম গ্রুপ এবং অন্যান্য মাধ্যমে বিভিন্ন ডোনারদের কাছে। টেলিগ্রামে ব্লাডব্যাগের চ্যানেলসহ রক্তের গ্রুপ অনুযায়ী সৃষ্ট স্বতন্ত্র গ্রুপগুলোতে রোগীর তথ্য চলে যাবে। ডোনাররা তথ্য পেয়ে স্বপ্রণোদিতভাবে যোগাযোগ করবেন
রোগীর সঙ্গে।
ফেসবুকে রক্তদানের বিভিন্ন পাবলিক গ্রুপে পোস্ট করার ফলে পেশেন্টের সঙ্গে যোগাযোগের নম্বর ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন স্থানে। যা থেকে হয়রানির শিকার হন অনেকে। কিছুক্ষণ পরপর সব জায়গায় বর্তমান আপডেট প্রদান করাও বেশ কষ্টকর কাজ। তাই ব্লাডব্যাগ প্রাইভেসির ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ব্লাড ম্যানেজ হয়ে যাওয়ার পর রোগীর সঙ্গে যোগাযোগের তথ্যসমূহ মুছে ফেলা হয় অ্যাপ্লিকেশন থেকে। https://www.bloodbag.app/ এ প্রবেশ করলে রক্তের আবেদন দেখা যাবে। দেখা যাবে কোন জেলা থেকে রক্তের আবেদন করা হয়েছে, কয় ব্যাগ রক্ত প্রয়োজন। ওয়েব পেজের একদম নিচে দুটি বাটন দেখা যাবে ‘আমার আবেদন’ এবং ‘নতুন আবেদন’ নামে। নতুন আবেদনে ক্লিক করে রোগী https://www.bloodbag.app/form পেজে আসবে। তারপর রোগী এবং হাসপাতালের তথ্য দিয়ে রক্তের আবেদন করতে পারবে। টেলিগ্রামে https://t.me/bloodbagTGএ চ্যানেলে নিয়মিত বিভিন্ন তথ্য দেওয়া হয়। বর্তমানে ঢাকা এবং চট্টগ্রাম এই দুই অঞ্চলের জন্য কাজ করছে। ঢাকা https://t.me/bloodbagDhaka গ্রুপ এবং চট্টগ্রাম https://t.me/bloodbagCTGএ গ্রুপের মাধ্যমে তথ্য সরবরাহ করবে। নিজেদের বোনার পুল ছাড়াও আরও পাঁচটি ডোনার পুলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্লাডব্যাগ টিম। ওয়েবঅ্যাপে রক্তের আবেদন এলেই সেটি চলে যাবে সহযোগী সংগঠনের ডোনার পুলেও। ডোনাররা আবেদনটি সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেন এবং কল করেন আবেদনকারীকে। রক্ত পাওয়ার পর আবেদনকারী রক্ত পাওয়া গিয়েছে বাটনে ক্লিক করলে চ্যাটবটের মাধ্যমে আগে পাঠানো টেলিগ্রাম মেসেজ ডিলেট করা হয়। এই সেবাটি নিতে কোনো অর্থ প্রদান করতে হবে না। সেবার ব্যাপারে মতামত দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সেবাগ্রহীতাদের মতামতের ওপর ভিত্তি করে পরিবর্তন করা হবে ওয়েবঅ্যাপের কর্মপদ্ধতি। ব্লাডব্যাগ টিম একটি মোবাইল অ্যাপ নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সেখানেও প্রয়োজন হবে সেবাগ্রহীতাদের এই পরামর্শ।
চমৎকার এই প্রজেক্টটি তৈরি করেছেন রিজওয়ানুল হক, ফাতিন সাদাব লিয়ান এবং ফজলে রাব্বি। বাংলাদেশের তিন প্রান্তের এই তিন তরুণের যোগাযোগ হয়েছে অন্তর্জালেই। দেখা হয়েছেন মাত্র একবার।
তাদের এই উদ্ভাবনী ধারণা অর্জন করেছে বেসিস ন্যাশনাল আইসিটি অ্যাওয়ার্ড ২০২২। এই প্রজেক্টটি বাস্তবায়নে প্রতিষ্ঠাতা তিন যুবকের সঙ্গে কাজ করেছে আইআইইউসি কম্পিউটার ক্লাব।
রিজওয়ানুল হক ‘ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রামে’ কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। প্রোগ্রামিং শেখার পর চ্যাটবট তৈরিতে দক্ষ হয়ে উঠেন তিনি। সেই সূত্রেই সেন্ট গ্রেগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী ফাতিন সাদাব লিয়ানের সঙ্গে পরিচয় তার। একদিন লিয়ান তার বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীর অসুস্থতার কথা জানান। এই অসুস্থতার জন্য নিয়মিত রক্তের দরকার হতো। অনলাইন ব্লাড ডোনার পুল তৈরির জন্য কাজ করার চিন্তা সেখান থেকেই আসে এই দুই তরুণের। পরে তাদের সঙ্গে যুক্ত হন ফজলে রাব্বি। ব্লাডব্যাগ বেসিস ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ডকে একটি স্বীকৃতি হিসেবে স্বীকার করে রিজওয়ানুল বলেন, ‘ব্লাডব্যাগকে সফল করতে হলে প্রতিটি স্তরের মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন। সবার প্রচেষ্টায় আমরা রক্ত আদান-প্রদানের এমন ইকোসিস্টেম গড়ে তুলব, যেখানে রক্তের অভাবে একজন মানুষও মারা যাবে না।’
