সুষ্ঠু নির্বাচনের আইনি কাঠামোতে সন্তুষ্ট ইইউ : আইন সচিব

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২৩, ০২:০৮ এএম

সফররত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রাক নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল গতকাল বুধবারও ব্যস্ত দিন পার করেছে। এদিন তারা আইন মন্ত্রণালয়ে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব মো. গোলাম সারওয়ার, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে আগামী নির্বাচনের বিষয়ে কথা বলেন তারা। নির্বাচনে তথ্য মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা সম্পর্কে তথ্যমন্ত্রীর কাছে জানতে চায় প্রতিনিধিদল। নির্বাচনী আইন যথেষ্ট কি না, তা আইন সচিবের কাছে জানতে চান প্রতিনিধিদলের সদস্যরা।

গতকাল সকালে ইইউ দল প্রথমে সচিবালয়ে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, দুপুরে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী এবং বিকেলে আইন সচিবের সঙ্গে বৈঠক করে।

আইন সচিবের সঙ্গে বৈঠক : সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বিদ্যমান আইনি কাঠামো ‘যথেষ্ট’ বলে ইইউ প্রতিনিধিদলকে জানিয়েছেন আইন ও বিচার বিভাগের সচিব মো. গোলাম সারওয়ার। গতকাল সচিবালয়ে জাতীয় নির্বাচনের পরিবেশ মূল্যায়ন করতে আসা ইইউর ছয় সদস্যের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে এ কথা বলেন তিনি।

পরে সচিব সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের আইনগত কাঠামো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যথেষ্ট কি না, এটা তারা জানতে চেয়েছেন। আমরা বলেছি, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আমাদের যে আইনগত কাঠামো আছে, সেটা যথেষ্ট। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে আরপিও (গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ) পাস হয়েছে, সেখানকার ৯১(১)এ-তে নির্বাচন বাতিল করার ব্যবস্থা আছে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী ৯১-এএ যুক্ত করে নির্বাচন কমিশনকে আরও শক্তিশালী করেছেন। এটা ওটার আরও বাড়তি। ওনারা এতে সন্তুষ্ট হয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে সম্প্রতি যে আইন করা হয়েছে, উপমহাদেশে এরকম আর কোনো আইন নেই। আমরা তাদের আরও জানিয়েছি, যেটি তারা হয়তো আগে জানতেন না। যেটি আমাদের আইন ও বিচার বিভাগের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সম্পৃক্ত, সেটি হলো নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর একজন যুগ্ম জেলা জজ এবং একজন সিনিয়র সহকারী জজের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এটা তফসিলের শুরুর দিন থেকে নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট নোটিফিকেশন হওয়া পর্যন্ত তারা দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ে নির্বাচন নিয়ে কোনো অনিয়ম বা কারও কোনো অভিযোগ থাকলে তারা সেটার প্রতিবেদন তৈরি করে নির্বাচন কমিশনকে দেন। নির্বাচন কমিশন সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে।’

সচিব আরও বলেন, ‘এ ছাড়া আরেকটা বিষয় আছে জুডিশিয়াল অফিসারদের দেওয়া। বিচার বিভাগ স্বাধীন। নির্বাচন কমিশন রিকুইজিশন দিলে আমরা সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের নির্বাচন কমিশনে ন্যস্ত করি। আমরা যখন নির্বাচন কমিশনে ন্যস্ত করি তখন তারা নির্বাচন কমিশনের অধীনে দায়িত্ব পালন করেন। জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরা নির্বাচনের আগে দুদিন, নির্বাচনের দিন ও নির্বাচনের পর দুদিনসহ পাঁচ দিন দায়িত্ব পালন করেন। তখন কোনো অনিয়ম হলে তারা সংক্ষিপ্ত বিচার (সামারি ট্রায়াল) ও আরপিওতে যে বিধানগুলো আছে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এটার বিষয়ে তারা প্রশংসা করেছে।’

দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নিয়ে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা কোনো কিছু বলেছেন কি না এ প্রশ্নের জবাবে গোলাম সারওয়ার বলেন, ‘না, এসব নিয়ে কোনো আলাপ করা হয়নি।’

তারা কোনো পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন কি না, জানতে চাইলে আইন সচিব বলেন, ‘না। তারা জানতে চেয়েছেন অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এ আইনি কাঠামো যথেষ্ট কি না। আমরা বলেছি হ্যাঁ, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আমাদের মেকানিজম আছে, আইনি কাঠামো আছে। এ আইনি কাঠামো যথেষ্ট। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অন্য কোনো কিছু করার প্রয়োজন নেই।’

আরপিও সংশোধন নিয়ে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা কিছু বলেছেন কি না এ বিষয়ে সচিব বলেন, ‘আগের আরপিও অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা রয়েছে, তারা যেকোনো ভোটগ্রহণ বন্ধ করে দিতে পারে। পুরো নির্বাচনী আসনের ভোট বন্ধ করে দিতে পারবে।’

তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ইইউ প্রতিনিধিদলের বৈঠক : বাংলাদেশের গণমাধ্যম এবং তার মন্ত্রণালয়ের কাজের বিষয়ে ইইউ প্রতিনিধিদলকে অবহিত করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হাছান মাহমুদ। গতকাল সচিবালয়ে প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান তিনি।

আলোচনার বিষয় নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। তারা দেশের গণমাধ্যম, আমাদের মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। আমরা বলেছি, বাংলাদেশের গণমাধ্যম মূলত বেসরকারি। বাংলাদেশ টেলিভিশন আর ৩৫টি বেসরকারি টিভি চ্যানেল এখন সম্প্রচারে আছে। ১ হাজার ২৫০ দৈনিক পত্রিকা, কয়েক হাজার অনলাইন, এফএম ও কমিউনিটি রেডিও সবই বেসরকারি, বাংলাদেশ বেতার ছাড়া।’

তিনি বলেন, ‘সমসাময়িক চ্যালেঞ্জগুলো বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানোর ফলে অনেক সময় যে হানাহানি হয়, সেজন্য সেই প্ল্যাটফর্মের যে দায়িত্ব রয়েছে, সেগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আপনারা জানেন যে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এ বছরের গোড়াতে আইন সংশোধন করে বলেছে, প্রত্যেক সামাজিক যোগাযোগ প্ল্যাটফর্মকে ইউরোপে রেজিস্টার্ড হতে হবে।’

আমরা ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউবসহ সব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মকে বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী এখানে রেজিস্টার্ড হওয়ার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বলে আসছি, কিন্তু এখনো পর্যন্ত তা হয়নি উল্লেখ করে হাছান মাহমুদ বলেন, সেখানে কোনো গুজব বা বিতর্কিত পোস্ট সরাতে বললেও তারা দেরি করে এবং যদিও সরায় তার হারটা হচ্ছে ১০ শতাংশ, ৯০ শতাংশ সরায় না। এতে রাষ্ট্রে, সমাজে যে হানাহানি তৈরি হয়, সেই চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

তথ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘ইউরোপের দেশগুলোতে যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, তারা ক্ষমতায় থেকেই নির্বাচন হয়, আমাদের দেশেও আইন অনুযায়ী তাই হবে, সে বিষয়টি আমি তাদের জানিয়েছি। কিন্তু নির্বাচনের সময় সরকারের রুটিন কাজ করা ছাড়া আর কোনো কাজ করার ক্ষমতা থাকে না। সরকারের সব প্রতিষ্ঠান যেগুলো নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তাদের সবার চাকরি নির্বাচন কমিশনের হাতে ন্যস্ত হয়, সেটি আমি তাদের জানিয়েছি।’

তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং বিরোধী দলকে নির্বাচনে আনা প্রসঙ্গে আলোচনা হয়েছে কি না এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। আসলে এ নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। এটি একমাত্র বিএনপির মাথাব্যথা। আর তারা এসেছে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের ব্যাপারে, বিরোধী দলকে নির্বাচনে আনার জন্য আসেনি। তবে আমি তাদের বলেছি, আমরা চাই বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দল আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক।’

ইইউ প্রতিনিধিদলের তিন সদস্য রিকার্ডো কেলেরি, দিমিত্রা আয়ানো ও ক্রিস্টিনা ডোস রামোস আলভেস এসব বৈঠকে অংশ নেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত