এবার বিদ্যুতে দামের ধাক্কা

আপডেট : ০৪ জুন ২০২৬, ০২:৩১ এএম

আবাসিক, বাণিজ্যিক, কৃষি ও শিল্পসহ সব খাতের বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গতকাল বুধবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করে দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়।

দাম বাড়ানোর ফলে জনজীবনে বাড়তি চাপ পড়বে, তবে সরকারের অতিরিক্ত আয় হবে ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং বিদ্যুতের ৫৬ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি কমে ৪১ হাজার কোটিতে দাঁড়াবে।

বিইআরসি সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, পাইকারি বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিটে ৭ টাকা থেকে ১.৩৯ টাকা বাড়িয়ে ৮.৩৯ টাকা করা হয়েছে; দাম ১৯.৮৫ শতাংশ বেড়েছে।

অন্যদিকে খুচরা বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিটে ৯.১১ টাকা থেকে ১.৫২ টাকা বাড়িয়ে ১০.৬৩ টাকা করা হয়েছে; দাম ১৬.৬৮ শতাংশ বেড়েছে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পর এখন গ্যাসের দাম বাড়াতে চায় সরকার। ইতিমধ্যে পেট্রোবাংলার তরফ থেকে এলএনজি আমদানিতে অতিরিক্ত খরচ বিবেচনায় নিয়ে সরকারের কাছে গ্যাসের দাম বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। যদিও এখনো এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কাছে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেনি পেট্রোবাংলা।

তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছিলেন, আগামী দুই বছর বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ানো হবে না। ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে উঠলে সরকার সে প্রতিশ্রুতি থেকে সরে দাঁড়ায়। দায়িত্ব নেওয়ার ১০০ দিনের মধ্যেই কয়েক দফায় এলপিজি ছাড়াও সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়। এবার বাড়ানো হলো বিদ্যুতের দাম।

গ্রাহকপর্যায়ে লাইফলাইন বা প্রান্তিক মানুষের বিদ্যুতের দামও এবার বাড়ানো হয়েছে। শূন্য থেকে ৫০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সারা দেশে মোট গ্রাহকের একটি বড় অংশ লাইফলাইন গ্রাহক। সরকার প্রান্তিক মানুষকে ভর্তুকিমূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে তাদের শিক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। সারা দেশে এমন গ্রাহকের সংখ্যা ১ কোটি ৭৮ লাখ ৮২ হাজার ৩৮০। এর মধ্যে গ্রামীণ জনপদে অর্থাৎ আরইবির সমিতিগুলোতে ১ কোটি ৬১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৯১টি লাইফলাইন সংযোগ রয়েছে।

লাইফলাইন গ্রাহকের বিদ্যুতের দাম ১৫ শতাংশের কাছাকাছি বাড়িয়ে ইউনিটপ্রতি ৫ টাকা ৩২ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এর সঙ্গে ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট এবং মিটার ভাড়া পরিশোধ করতে হয়। এখন নতুন দামে ৫০ ইউনিট ব্যবহারকারী একজন গ্রাহকের মাসিক বিদ্যুৎ বিল সার্বিকভাবে ৩৭ টাকা বেশি হবে। মোটাদাগে বলা যেতে পারে, একজন গ্রাহক আগে যে বিদ্যুৎ বিল দিতেন এখন তার চেয়ে ১৭ থেকে ২০ শতাংশ বেশি বিল পরিশোধ করতে হবে। 

আবাসিকে অন্য গ্রাহক শ্রেণিতে ০-৭৫ ইউনিটের নতুন দাম ৬.১৮ টাকা, ৭৬-২০০ ইউনিটের ৮.৫০ টাকা, ২০১-৩০০ ইউনিটের ৯.১০ টাকা, ৩০১-৪০০ ইউনিটের ৯.৬২ টাকা, ৪০১-৬০০ ইউনিটের ১৫.০১ টাকা এবং ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারকারীর জন্য ১৭.৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

ক্ষুদ্র শিল্পগ্রাহকের দামবৃদ্ধি : ক্ষুদ্র শিল্পের ক্ষেত্রে আগে ফ্ল্যাট দাম ছিল ইউনিটপ্রতি ১০.৭৬ টাকা এখন তা বেড়ে হয়েছে ১২. ৭৩ টাকা। এ শ্রেণির গ্রাহকের অফ-পিকে দাম ছিল ৯.৬৮ টাকা এখন হয়েছে ১১.৪৫ টাকা এবং পিকে দাম ছিল ১২.৯৫ টাকা এখন হয়েছে ১৫.২৭ টাকা।

মাঝারি ও বৃহৎ শিল্প : মাঝারি এবং বৃহৎ শিল্পের জন্য ফ্ল্যাট দাম ১১.৬৩ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩.৯৩ টাকা, অফ-পিকে ১০.৪৮ থেকে ১২.৫৪ টাকা এবং পিকে ১৪.৫৭ থেকে বাড়িয়ে ১৭.৪১ টাকা করা হয়েছে।

নির্মাণ শ্রেণি : ভবন এবং ফ্যাক্টরি নির্মাণের সময় গ্রাহককে একটি পৃথক নির্মাণ লাইন নিতে হয়, যা কাজ শেষ হওয়ার পর আবার হস্তান্তর করতে হয়। এ শ্রেণির গ্রাহকের বিদ্যুতের দাম তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। এ শ্রেণির বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ১৫.১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৯.০৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ শ্রেণির ডিমান্ড চার্জ আগের মতোই কিলোওয়াটপ্রতি ১২০ টাকা রাখা হয়েছে।

কৃষি শ্রেণি : সারা দেশে সেচ পাম্পের জন্য সরকার খানিকটা কম দামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। কৃষির ব্যয়কে সীমিত রাখতেই এ উদ্যোগ। এবার কৃষি খাতের বিদ্যুতের দাম ৫.২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ইউনিটপ্রতি ৬.০৪ টাকা করা হয়েছে।

শিক্ষা, ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতাল : এ শ্রেণির গ্রাহকের বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ৭.৫৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯.০৫ টাকা করা হয়েছে।

ব্যাটারি চার্জিং স্টেশন : সারা দেশে বিপুলসংখ্যক ইজিবাইক রয়েছে। প্রতিদিন গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নিয়ে এসব বৈদ্যুতিক যানে চার্জ দেওয়া হয়। এ শ্রেণির গ্রাহকের জন্য পৃথক লাইন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও আবাসিক লাইন থেকে ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। চার্জিং স্টেশনে ফ্ল্যাট ৯.৬২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১.৩৬ টাকা, অফ-পিকে ৮.৬৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০.২২ টাকা, সুপার অফ-পিকে ৭.৭৮ টাকা থেকে ৯.০৯ টাকা এবং পিকে ১২.১৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪.২০ টাকা করা হয়েছে।

বাণিজ্যিক ও অফিস : এ শ্রেণির গ্রাহকের মধ্যে বাণিজ্যিক ও স্থায়ী অফিসের ক্ষেত্রে ফ্ল্যাট ১৩.০১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫.৩৬ টাকা, অফ-পিকে ১১.৭১ থেকে ১৩.৮২ এবং পিকে ১৫.৬২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮.৪৩ টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া বাণিজ্যিক শ্রেণির অস্থায়ী গ্রাহকের জন্য ২০.১৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৩.৮১ টাকা করা হয়েছে।

পাইকারি বিদ্যুতের দামবৃদ্ধি : এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন সংবাদ সম্মেলনে জানায়, পাইকারি বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিটে ৭ টাকা থেকে ১.৩৯ টাকা বাড়িয়ে ৮.৩৯ টাকা করা হয়েছে। এতে ১৯.৮৫ শতাংশ পাইকারি বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) দেশের উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনে নিয়ে বিতরণ প্রতিষ্ঠানের কাছে এ দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করে।

সঞ্চালন মাশুল বৃদ্ধি : উৎপাদিত বিদ্যুৎ গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিতে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেওয়ার কাজটি করে পৃথক একটি কোম্পানি। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির বিদ্যুতের সঞ্চালন চার্জ ইউনিটপ্রতি ০.৩১৩৫ টাকা থেকে ০.০৭৫১ টাকা বাড়িয়ে ০.৩৮৮৬ টাকা করা হয়েছে।

এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বিদ্যুতের নতুন দাম ঘোষণার সময় বলেন, ‘সরকারের কোনো চাপ ছিল না।’ তিনি জানান, এবার বিদ্যুৎ বাবদ সরকারকে বাজেটে ৫৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি রাখতে হতো, যা এখন কমে দাঁড়াবে ৪১ হাজার কোটিতে।

সংবাদ সম্মেলনে চেয়ারম্যান ছাড়াও কমিশন সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

বিক্ষোভের ডাক জামায়াতের : বিদ্যুতের অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহার এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণের দাবিতে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। আজ বৃহস্পতিবার সব মহানগরীতে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করবে দলটি। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখার উদ্যোগে বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টায় বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে বিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে।

এদিকে বিদ্যুতের দামবৃদ্ধির সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ, অবিলম্বে এই বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহার এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার  গতকাল বুধবার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘সরকার সাধারণ মানুষের পকেট কাটার এক চরম ও নিষ্ঠুর খেলায় মেতে উঠেছে। আসন্ন বাজেটকে সামনে রেখে তড়িঘড়ি করে বিদ্যুতের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপর বড় ধরনের জুলুম। এমনিতেই নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্রের দামের ঊর্ধ্বগতিতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, তার ওপর আবার বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধি ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখা দেবে।’

সিপিবির নিন্দা ও প্রতিবাদ : জ্বালানি তেলের দাম দুই দফায় বাড়ানোর পর এবার বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ‘অগণতান্ত্রিক, অন্যায্য ও গণবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে তা অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে দলটি।

গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, ‘জনমত সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সরকারের নির্দেশে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বিদ্যুতের যে মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে, তাতে দেশবাসী হতবাক ও উদ্বিগ্ন। এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী দরিদ্র মানুষ চরম সংকটে পড়বে। এর প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ বিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে পরিবহন ভাড়ার পাশাপাশি দৈনন্দিন ব্যবহার্য সব জিনিসের উৎপাদন খরচ বাড়বে। যার চূড়ান্ত খড়্গ গিয়ে পড়বে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত