সময়টা দুই হাজার সাল, স্কুল পাস করে কলেজে উঠেছি মাত্র। এসএসসি পরীক্ষার পর সময় কাটত ক্রিকেট খেলা দেখে দেখে। একদিন ইএসপিএন নামের একটা টিভি চ্যানেলে দেখা গেল ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলছে টিভিওয়ালারা। সেখানে আমার বড় ভাই, সে তখন ওইখানের ছাত্র, খুব গম্ভীরভাবে বলছে, ‘আই থিঙ্ক টেস্ট স্ট্যাটাস ফর বাংলাদেশ ইজ রিয়েলি এসেনশিয়াল।’ আমরা তো বিরাট উত্তেজিত। বাড়ির লোক বা পরিচিত মানুষকে টিভিতে দেখা যাওয়া এখনকার মতো ডাল-ভাত ছিল না তখন, তার ওপর দেশি কোনো চ্যানেলও না, খোদ ইএসপিএন! উত্তেজিত হওয়ারই কথা।
ওই বছরই জুন মাসে বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস পেল। কিন্তু আমার কোনো দিনও টেস্ট খেলা দেখা হয়নি, ধৈর্যে কুলায়নি। এমনকি কলেজ পাস করতে করতে ওয়ানডে খেলা (যেটা পঞ্চাশ ওভারের খেলা হতো, এখন সম্ভবত সেটা বিশ ওভারে হয়, যাকে বলে টি-টোয়েন্টি ম্যাচ) দেখাও আমি ছেড়ে দিলাম।
ক্রিকেট খেলা দেখা ছেড়ে দেওয়ার পেছনে কারণ ছিল মূলত দুটি।
প্রথমত, বন্ধু হোক, বড় ভাই হোক, কাজিন হোক, প্রাইভেট টিউটর হোক, কারও সঙ্গেই ক্রিকেট নিয়ে আলোচনা করতে পারতাম না। মতের মিল না হলেই তারা এক বাক্যে বলে বসত, মেয়েরা ক্রিকেটের কী বোঝে? বল ধরতে জানো? মাঠে নেমেছ কোনো দিন? ব্যাটের ওজন তুলতে পারবে? এইটুকু না হয় সহ্য করা গেল! সত্যিই তো, ক্রিকেট দূরের কথা, কোনো খেলাই তো মাঠে নেমে খেলিনি! খেলব যে মাঠ কোথায় শহরে? যা আছে তা তো ছেলেদের দখলে! ছেলেরা মেয়েদের সঙ্গে যে ব্যবহার করে, কোনো বাবা-মা প্রাণে ধরে মেয়েদের ওইসব মাঠে খেলতে যেতে দেবে? কিন্তু যখন শচীন টেন্ডুলকারের বদলে সৌরভ গাঙ্গুলী বা রাহুল দ্রাবিড়ের খেলার ফ্যান হলে শুনতে হতো, মেয়েরা তো খেলা দেখে না, খেলোয়াড় দেখে, চেহারা দেখে ফ্যান হয় তখন আর সহ্য হতো না। রাগে ক্ষোভে কান্না পেত।
দ্বিতীয়ত, বড় হতে হতে দেখলাম ক্রিকেট এমন একটা খেলা, যা খেলে সব সাবেক কলোনি দেশগুলো। ব্রিটিশ শাসনের ফলাফল কী এই ক্রিকেট অবসেশন? অত্যাচারী শাসকদের শিখিয়ে দেওয়া খানদানি এবং উচ্চাঙ্গের এই খেলার প্রতি উন্মাদনা দ্রুতই আমার মনন থেকে মুছে গেল।
আজকাল সোশ্যাল মিডিয়ায় দু-একজনকে হলেও বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলকে ‘পুরুষ ক্রিকেট টিম’ বলে উল্লেখ করতে দেখি। এর আগে জাতীয় দল বললে বোঝাত পুরুষদের ক্রিকেট দলকে। মেয়েদের দলকে বলা হতো, প্রমীলা ক্রিকেট দল। অনেকটা ছোটরা যেমন খেলায় ‘দুধভাত’ থাকে ওরকম একটা ব্যাপার। জিতলে ভালো, হারলেও ক্ষতি নেই। নারী ও পুরুষ ক্রিকেটারদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধার বৈষম্যের কথা আর না-ই বা বললাম।
কিন্তু লক্ষ্য করার মতো মজার ব্যাপার হচ্ছে, যখনই পুরুষদের দল বা জাতীয় ক্রিকেট দল কোনো বিরাট অর্জন করে তখন বলা হয়, তারা দেশের জন্য বিরাট সম্মান বয়ে এনেছে। উল্টোদিকে নারী দলের যে কোনো অর্জনকে দেখা হয় নারী জাতির একটা বিরাট জয় হিসেবে। এই ভুলভাল ধারণার কোনো নিদান নেই।
কলোনিয়াল এবং পুরুষালি একটা খেলায় জিতে নারীকে কেন নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিতে হবে? এই বিষয়ে আমার নারীবাদী বন্ধুদের সঙ্গে দ্বিমত রয়েছে। আমার বন্ধুদের অনেকেই এই খেলাটাকে ‘পুরুষালি’ বলে দেগে দিতে নারাজ। তাদের যুক্তিতে আমিও পরাভূত হয়েছি। সত্য বটে, হাজার বছরের বঞ্চনার ফলে নারীর পেশিশক্তি কমে গেছে, ফলে পেশিশক্তি প্রয়োজন হয় এমন কাজে নারী পিছিয়ে থাকে। তার মানে এই নয় যে, খেলাটা ছেলেদের। সে হিসেবে ধরলে তো সব কাজই ছেলেদের, সিনেমা বানানো বা সাংবাদিকতা করাও! এমনকি নাচ-গান করাও। এক সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেয়েদের সায়েন্স পড়তে নিরুৎসাহিত করা হতো। যদিও বিজ্ঞানে দুবার নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন একজন নারীই। কিন্তু এ দেশের মেয়েদের সায়েন্স পড়ার জন্যও সংগ্রাম করতে হয়েছে মেলাই। যেমনভাবে এখন করতে হচ্ছে খেলার জন্য।
কিন্তু লাভ কী? ফুটবলে জিতে আসা মেয়েদের কভিাবে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল পাঠকের মনে আছে নিশ্চয়ই! মেয়েরা সংগ্রাম করে বিদেশ গিয়ে খেলার মাঠ থেকে একেকটা অর্জন নিয়ে আসবে আর লাভের গুড় খেয়ে যাবে ক্ষমতাশালীরা, যারা বেশির ভাগই পুরুষ। তাই তো হচ্ছে!
তা বলে কি মেয়েরা খেলা বন্ধ করে দেবে? নিশ্চয়ই না! মেয়েরা খেলবে, জিতবে, হারবে সবই হচ্ছে এবং হবে। কিন্তু খেলার সঙ্গে নারীবাদ মেশানোর বিষয়ে আমার আপত্তি আছে। এ বিষয়ে আমেরিকান সম্পাদক, সমালোচক জেসা ক্রিস্পিনের ‘হোয়াই আই অ্যাম নট আ ফেমিনিস্ট’ নামের একটা নারীবাদী মেনিফেস্টো আছে, সেই বইতে তিনি যুক্তি দেখান যে, কোনো নারীর বা কোনো বিশেষ শ্রেণির নারী/দের ব্যক্তিগত অর্জন কোনোভাবেই সার্বিকভাবে নারীর উন্নতি করে না, ওটা কেবল লাইফস্টাইল, লাইফস্টাইল দিয়ে দুনিয়া বদলানো যায় না।
এই পয়েন্টটা লোককে বোঝানো একটু কঠিন। বিশেষত নব্বইয়ের দশক থেকেই যখন মহিলা প্রধানমন্ত্রী, মহিলা বিরোধী দলীয় নেত্রী, হালে মহিলা স্পিকার নিয়ে এ দেশের মানুষ নারীর ক্ষমতায়নের খই ফুটিয়ে আসছে। মোটা দাগের উদাহরণ দিয়ে বলি, আমি এইচএসসি পরীক্ষায় অঙ্কে লেটার পেয়েছিলাম। এটা আমার ব্যক্তিগত অর্জন, আমার বাবা-মা আমাকে ভালো টিউটর দিতে পেরেছিলেন, আমি মন দিয়ে প্র্যাকটিস করেছিলাম, তাই পেয়েছিলাম। আমি যে বছর এইচএসসি পাস করেছি (২০০১ সালে) তখন এমন অঙ্কে লেটার লাখ লাখ মেয়ে পেয়েছে। কিন্তু এটা যদি ২০০১ সাল না হয়ে ১৯৫১ সাল হতো তাহলে হয়তো দেখা যেত পুরো দেশে আমিই একমাত্র মেয়ে যে অঙ্কে লেটার মার্ক পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছে। নিউজ হতো পেপারে। কিন্তু তাতেও সেই অর্জন আমার একার অর্জনই থাকত, এতে নারী জাতির জীবনে কোনো উন্নতি তো হতোই না, বরং এই দৃষ্টান্ত অন্যান্য নারীর জীবনে অভিশাপ হয়ে আসত, ও যদি পারে, তুমি কেন পারবে না?
যেমন উদাহরণ মহিলা ক্রিকেটারদের দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর কারণ সম্প্রতি বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটার ফারজানা হক ভারতের বিপক্ষে ওয়ান ডে তে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে সেঞ্চুরি করেছেন। একটা আর্গুমেন্ট দেখলাম, গ্রামের গরিব ঘরের মেয়েরা, পাহাড়ি আদিবাসী মেয়েরা বিদেশ গিয়ে শিরোপা জিতে আনছে, মধ্যবিত্ত সুবিধাভোগী মেয়েরা কেন পারছে না! এখানে বলা যেতেই পারে, নারীর জন্য দুনিয়ার মেলা হিসাব-নিকাশই আলাদা, কোনো কোনো সময় পুরো উল্টো।
কাকে বলে সুবিধা? শহরে থাকা মধ্যবিত্ত মেয়েরা অঙ্ক করার জন্য ভালো প্রাইভেট টিউটর পেলেও খেলার জন্য মাঠ পায় না। নিজের জীবন থেকেই উদাহরণ দিলাম। আশা করি আর বেশি বলতে হবে না। শেষমেশ এইটুকু বলি, খেলার সঙ্গে রাজনীতি না মেশানোর মতো খেলার সঙ্গে নারীবাদ না মেশানোর চর্চা শুরু করা প্রয়োজন, খেলাকে খেলার জায়গায় থাকতে দেওয়াই উত্তম।
লেখক : কবি ও লেখক
