শিরোনাম দিয়ে যায় চেনা

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৩, ০৬:৪৫ পিএম

নামে কী-বা আসে যায়! বহুল প্রচলিত কথা। কিন্তু নামেই আসে যায়। আর তা যদি হয় শিরোনাম, তাহলে তো কথাই নেই। সংবাদপত্রের শিরোনামই পাঠককে টানে। সংবাদের গভীরে নিয়ে যায়। আর শিরোনাম না টানলে যত তির্যক সংবাদই হোক না কেন, তা পাঠক পড়ে না। তাই সংবাদপত্রে শিরোনামের এত কদর।

সংবাদপত্রে দুভাবে শিরোনাম হয়। একটি হচ্ছে সাজেস্টিভ হেডিং বা শিরোনাম। যা আসে রিপোর্টারের কাছ থেকে। বাকিটা হলো ডেস্ক থেকে দেওয়া শিরোনাম। ডেস্কের দেওয়া শিরোনামই বেশি হয়। কারণ রিপোর্টার সারা দিন ঘটনার মধ্যে থাকেন। তাদের দেখাটা অনেক সময়ই একপেশে হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর যারা ডেস্কে বসে সবকিছু মাথায় নেন, তাদের শিরোনাম হয় সামগ্রিক।

ছাতার নিচে বসে রিপোর্টাররা দেখেন আর ছাতার ওপরে বসে ডেস্কের সহসম্পাদকরা দেখেন। ছাতার ওপর থেকে পুরো ঘটনাটি সহজেই বোঝা যায়। ছাতার নিচ থেকে একাংশ দেখা যায়। তাই সহসম্পাদকদের শিরোনামই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়।

অমিত হাবিব ছিলেন ছাতার ওপরে বসে থাকা সাংবাদিক। একাংশ দেখতেন না, তিনি শিরোনামে তুলে আনতেন পুরো ঘটনা। রিপোর্টাররা ঘটনাস্থলে ঘুরে বেড়ান। যারা ঘটনা ঘটান তাদের সঙ্গে ওঠাবসা তাদের। কিন্তু সম্পাদনা বিভাগের সাংবাদিকরা থাকেন আড়ালে। এসব আড়ালে থাকা সাংবাদিকদের মধ্যে অমিত হাবিব ছিলেন আরও বেশি আড়ালের। আড়ালে থেকেও তিনি শিরোনাম করায় ছিলেন সামনের সারির। ঘটনার আবেগে ভেসে যেতেন না। নিখুঁতভাবে সংবাদের গুরুত্ব বিচার করে ঘটনার জুতসই শিরোনাম করতে পারতেন অবলীলায়। শিরোনাম করতে কসরত করতে দেখা যেত না তাকে। সংবাদের যে অংশটা পাঠক সব থেকে বেশি পড়ে, সেটা হচ্ছে শিরোনাম। তাই শিরোনাম যথাযথ করতে তাগাদা বোধ করতেন তিনি।

ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। এটি একটি নীতিকথামূলক প্রবাদ। এর অর্থ হচ্ছে সত্য কখনো গোপন থাকে না। সাময়িকভাবে ধামাচাপা দিয়ে রাখতে পারলেও তা একসময় না একসময় প্রকাশ হয়ই। এ প্রবাদটি আশ্রয় করে অমিত হাবিব শিরোনাম করেছিলেন ‘সুবিধার কল একদিকে নড়ে’।

সরকারি চাকরিতে কর্মকর্তা আর কর্মচারীদের মধ্যে অনেক বৈষম্য। বেতনে বৈষম্য তো আছেই। এর বাইরে ভাতায়, যানবাহনে সোজা কথায় দৈনন্দিন সুবিধা প্রাপ্তিতে ব্যাপক বৈষম্য আছে। এ নিয়ে সরকারি কর্মচারীরা মন্ত্রিপরিষদ সচিব, অর্থ সচিবের কাছে চিঠি লিখে সমস্যা সমাধানের অনুরোধ জানিয়ে ছিলেন। সমাধান না পেয়ে কর্মচারীরা চরম হতাশ হয়ে পড়েন। এসব সচিব বিষয়টি নিয়ে কাজ করেননি। তারা বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। এসব বৈষম্য নিয়ে একটা রিপোর্ট জমা দেওয়ার পর অমিত হাবিব শিরোনাম করেছিলেন ‘সুবিধার কল একদিকে নড়ে’। গ্রামীণ নীতিকথামূলক প্রবাদ আশ্রয় করে তিনি শিরোনাম করেছিলেন। অর্থবোধক এ শিরোনামটি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল।

দৈনিক সংবাদপত্র সাজাতে হয় গুরুত্ব অনুযায়ী। দিনে একাধিক বড় ঘটনা থাকলে নিখুঁতভাবে বিচার করতে হয়। বড় ঘটনাটি লিড হয়। তারপর গুরুত্ব অনুযায়ী প্রথম পাতায় সেকেন্ড লিড, থার্ড লিড বসে। অনেক সময় বড় ঘটনা থাকলেও বিশেষ নিউজ দিয়ে লিড করা হয়। কিন্তু সেই বিশেষ নিউজটি আক্ষরিক অর্থেই ভালো নিউজ হতে হয়। যখন নিউজ ম্যানেজার নিশ্চিত হন বিশেষ নিউজটিও পরদিন অলোড়ন তুলবে, তখন তারা বিশেষ নিউজটিই লিড করেন। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ নয়। আর সেটি যদি হয় নিমতলীর মতো ভয়ংকর অগ্নিকা-ের দিনে তাহলে লিড বসানোর কাজটি বেশ জটিল হয়ে পড়ে।

২০১০ সালের ২ জুন কালের কণ্ঠে লিড হয়েছিল ‘বিরল ভালোবাসা’ শিরোনামের একটি নিউজ। আগের দিন অর্থাৎ ১ জুন বন্ধ করে দেওয়া হয় ওই সময়ের জনপ্রিয় দৈনিক আমার দেশ। একই দিনে ঢাকার বেগুনবাড়ীতে পাঁচতলা বাড়ি ধসে পড়ার নিউজ ছিল। যার শিরোনাম ছিল ৩ লাশ আটকা পড়েছে শতাধিক। ১ জুন রাতে যখন লিডের জায়গায় ‘বিরল ভালোবাসা’ বসানো হয়, তখনই ভবন ধসের খবর পাওয়া যায়। সে রাতেই মৃত্যুর সংখ্যা ডাবল ডিজিটে পৌঁছায়। প্রথম সংস্করণে লিড করলেও অনেক সময় তা দ্বিতীয় সংস্করণে বদলে ফেলা হয়।

এ অবস্থায় কী করবেন অমিত হাবিব? ওই সময়ে তিনি ছিলেন কাগজটির নির্বাহী সম্পাদক। পদটি দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার ভূমিকা ছিল এক নম্বরের, অর্থাৎ সম্পাদকের। ওই পদে থেকেও তিনি নিজে পত্রিকার পাতা সাজাতেন। নিউজ এডিটর, জয়েন্ট নিউজ এডিটর, শিফট ইনচার্জসহ যারা এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত, তারা একেকজন একেক পরামর্শ দিতে লাগলেন। বিরল ভালোবাসার রিপোর্টারও অপেক্ষা করছেন নিজের লিড নিউজের ভাগ্য দেখতে। ইতিউতি ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন।

একই দিনে মুসা ইব্রাহীমের এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছানোর খবরও নিউজরুমে আসে। সেটিও গণমাধ্যমের জন্য বড় খবর ছিল।

শেষ পর্যন্ত বিরল ভালোবাসাটাই লিড রাখা হয়।

এ নিয়ে একটা ব্যাখ্যা অমিত হাবিব সহকর্মীদের দিয়েছিলেন। বিরল ভালোবাসা দুই মাস পরিশ্রম করে করা একটা নিউজ। প্রথম সংস্করণে ছাপা হওয়ায় নিউজটা তুলে ফেলা সম্ভব নয়। আর সেকেন্ড লিড করা হলে নিউজটার ওজন কমে যাবে। তাই বিরল ভালোবাসা লিডই থাকছে। তবে বেগুনবাড়ীর ভবন ধসের খবরও গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হবে বলে তিনি সহকর্মীদের আশ্বস্ত করেন।

পরদিন সব কাগজে ভবন ধস লিড নিউজ। একমাত্র ব্যতিক্রম কালের কণ্ঠ। ভবন ধসে পাঠক সমবেদনা জানিয়েছেন। আর বিরল ভালোবাসার নিউজ পড়ে পাঠক ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন। বিরল ভালোবাসায় জুটেছে অনেক পুরস্কার, অনেক সম্মান।

অমিত হাবিব সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারঙ্গম ছিলেন। তিনি সেদিন ভবন ধসের নিউজ লিড করলে বিরল ভালোবাসা পাঠকের হৃদয়ে সাড়া ফেলত না।

ঘটনার প্রথম দিন ভবন ধস লিড না করা হলেও পরদিন থেকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেদিন থেকে বেগুনবাড়ীসংক্রান্ত নিউজে কালের কণ্ঠ ছিল শীর্ষে। অনেক মানবিক সংবাদ করে, অনুসন্ধানী নিউজ করে পাঠকের ক্ষতি পুষিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।

ডেস্ক থেকে বিরল ভালোবাসা নিউজের শিরোনাম করা হয় ‘এতিম’ শেখ হাসিনার জন্য একখ- জমি কিনে গেছেন গফরগাঁওয়ের হাসমত আলী। কাগজের প্রথম সংস্করণ ছাড়ার আগমুহূর্তে অমিত হাবিব শিরোনাম বদলে দেন বিরল ভালোবাসা। ডেস্কের করা শিরোনাম তিনি রেখেছিলেন উপ-শিরোনাম হিসেবে।

যেকোনো দেশে অন্য দেশের দূতাবাস মানেই হচ্ছে তা সার্বভৌম। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ধনী এ দেশটিতে প্রচুর নারীশ্রমিক কাজ করতে যান। বাংলাদেশি নারীদের সে দেশে পাঠানোর সময়ই সরকারের এ সিদ্ধান্ত বেশ বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। যাই হোক, দেশটিতে বাংলাদেশি নারীরা কোনো বিপদে পড়লে দূতাবাসের শেল্টার হোমে আশ্রয় নেন। সেই শেল্টার হোমের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটে যাওয়া নারীদের ধর্ষণ করেন। এ ধরনের একটি রিপোর্ট আইডিয়া জানার পর থেকেই অমিত হাবিব তাগাদা দিতে থাকেন। প্রতিদিন তথ্য সংগ্রহের অগ্রগতি জানতে চাইতেন। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত সব তথ্য হাতে আসার পর অমিত হাবিব জানতে পারেন। তাগাদা দেন সেদিনই লিখে দেওয়ার।

যেকোনো ভালো রিপোর্ট পেলেই তিনি উত্তেজনা অনুভব করতেন। রিপোর্ট তার হাতে না যাওয়া পর্যন্ত তিনি থামতেন না। এ রিপোর্টের বেলায়ও এর কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। সন্ধ্যার দিকে রিপোর্ট জমা দেওয়ার পর দীর্ঘ সময় নিয়ে তিনি নিজেই সম্পাদনা করেছিলেন। ওই সময় তিনি চোখের সমস্যায় ভুগছিলেন। সাধারণত ১৪ পয়েন্টে প্রিন্ট করা হলেও সম্পাদকের জন্য নিউজটি ১৬ পয়েন্টে প্রিন্ট করে দেওয়া হয়। তারপরও চোখে সমস্যা হচ্ছিল। ম্যাগনিফায়িং গ্লাস দিয়ে পড়ার চেষ্টা করলেন। সুবিধা করতে না পারায় আরও বড় পয়েন্টে প্রিন্ট দেওয়া হয়।

রিপোর্টারের তরফ থেকে সাজেস্টিভ হেডিং ছিল রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাসে গৃহকর্মী ধর্ষণ। এডিট করার পর অমিত হাবিব রিপোর্টারকে ডেকে বললেন, ‘ধর্ষণের নিউজ কাগজে লিড করি কীভাবে?’

এতদিন যে নিউজ নিয়ে চরম উত্তেজনা দেখিয়েছেন, সেই নিউজ নিয়ে সম্পাদককে এভাবে কথা বলতে দেখে বিমর্ষ হয়ে পড়লেন রিপোর্টার। তার অবস্থা টের পেয়ে তিনি শুধু বললেন, ‘একটা হেডিং বের করেন তো দেখি। আপনার সাজেস্টিভ হেডিং দিয়ে ঘটনার ব্যাপকতা প্রকাশ পাচ্ছে না।’ হেডিং নিয়ে ভাবতে বলে তিনি নিজেও হেডিংয়ের চিন্তায় ডুবে গেলেন।

রাত ১১টায় ফার্স্ট এডিশন ছাড়ার পূর্বপর্যন্ত তিনি অস্থিরভাবে পায়চারি করলেন। শেষমুহূর্তে হেডিং করলেন ‘পবিত্র ভূমিতে পাপাচার’।

সৌদি আরব এ দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে পূণ্যভূমি। সেই আবেগ আশ্রয় করে তিনি শিরোনামটি করেছিলেন। এটিও তার অনন্য শিরোনামের একটি।

রিপোর্টার রিপোর্টের মূলকপি যেভাবে তৈরি করতেন, অমিত হাবিব তা আরও উন্নত করার চেষ্টা করতেন। অনেক সাব-এডিটর অপরিহার্য অংশ কেটেছেঁটে সংবাদমূল্য নষ্ট করে ফেলেন। যদিও এ নষ্ট করা কখনই ইচ্ছাকৃতভাবে করেন না। অমিত হাবিব নিউজের ফাঁকফোকর খুব ভালোভাবে ধরতে পারতেন। তার কলম সেই ফোকরে চলে যেত অবলীলায়।

কিছু পাঠকের অভ্যাসই শুধু শিরোনাম পড়া। মাঝেমধ্যে এমন হয়, শিরোনামে আকৃষ্ট হয়েই তারা পুরো সংবাদ পড়েন। পাঠকের মনকে প্রভাবিত করে শিরোনাম। পুরো সংবাদপত্রের ভাবমূর্তি সৃষ্টি করে সংবাদের এ অংশটি। যে শিরোনামে পর্যাপ্ত তথ্য থাকে না, স্পষ্ট হয় না, সেগুলো পাঠকের মনোযোগও কাড়ে না। এমনই একটি হেডিং ছিল ‘দেড় মাসে তিন লাফ’।

অমিত হাবিব সমকালে উপসম্পাদক ছিলেন। সেই সময় রিপোর্টারের সাজেস্টিভ হেডিং বাদ দিয়ে তিনি হেডিং করেছিলেন ‘দেড় মাসে তিন লাফ’। নিউজটি একজন সেলিব্রেটি আমলাকে নিয়ে। অমিত হাবিব বুঝতে পেরেছিলেন পরদিন নিউজটি নিয়ে তোলপাড় হবে। ভালো হেডিং করেও তিনি ভালো ট্রিটমেন্ট দেননি। এর একটি কারণ ছিল, ওই আমলা এত বেশি প্রভাবশালী ছিলেন যে, তিনি কাগজের বিনিয়োগকারীকে ফোন দিতে পারেন। এ কারণে তিনি বেশি কাভারেজ দেননি।

যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই রাত হয়। ভালো শিরোনামের ছোট্ট নিউজটি নিয়ে প্রশাসনে তোলপাড় হয়। সম্পাদককে বিনিয়োগকারী ফোন দেন। তার আগে বিনিয়োগকারী ফোন পেয়েছেন সেই প্রভাবশালী আমলার। নিউজের প্রতিবাদ ছাপলেই চলবে না। রিপোর্টারকে এমন নিউজ করতে হবে যাতে করে তার ক্ষতি পোষানো যায়।

উল্টো নিউজ করা সহজ কাজ নয়। করব করছি করে সময় পার করছিলেন রিপোর্টার। এর মধ্যেই ওই আমলার আরও বড় ক্ষতি হয়ে গেল। তিনি দেড় মাসে তিন লাফ দিয়ে সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব হয়েছিলেন। একটা পদ থেকে পরের পদে পদোন্নতি পেতে হলে কয়েক বছরের নির্ধারিত সময় পার করতে হয়। সেসব উপেক্ষা করে অতিরিক্ত সচিব করা হয়েছে। দেড় মাসে তিন লাফ নিউজ করার পর ওই সেলিব্রেটি আমলার বন্ধুরা সচিব হয়ে যান। সেলিব্রেটি আমলাকে ডেকে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বলা হয় ‘তোমাকে নিয়ে মিডিয়ায় নিউজ হয়েছে। আপাতত তোমার বিষয়টি থাক। পরে দেখা যাবে।’

সেই সেলিব্রেটি আমলার দুঃখ দেখে কে। সে কপাল চাপড়ে বলেছিল, নিউজের ভেতরের তথ্য যতটা না ক্ষতি করেছে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে হেডিং। এ হেডিং আমার সব শেষ করে দিল।

শিরোনাম করা খুব চৌকস কাজ। খুব অল্প জায়গায় ক্ষুদ্র পরিসরে শিরোনাম লেখা হলেও সংবাদের পুরো প্রতিফলন ঘটাতে হয় শিরোনামে। শিরোনাম অর্থবোধক হতে হয় এবং বোঝার ক্ষেত্রে কোনো অসম্পূর্ণতা থাকতে পারবে না। দেড় মাসে তিন লাফ ছিল সেই ধরনের এক হেডিং।

পদোন্নতি হলে আজও প্রশাসনে বলা হয় দেখি দেড় মাসে তিন লাফ দিল কে?

অমিত হাবিবের ভাষার ভা-ার সমৃদ্ধ ছিল। ভাষাকে সংক্ষিপ্ত করে ভাবের ইঙ্গিতময় প্রকাশ ঘটিয়ে কঠিন বক্তব্যকে রসময় করে শিরোনাম করতেন। শিরোনামে উপমা ব্যবহার করতেন, যার আড়ালে একটা অর্থ থাকত। শিরোনামে ভাষার বৈচিত্র্য প্রকাশ পেত। শিরোনামে তিনি বাগধারা ব্যবহার করতেন। শিরোনামে সংখ্যা ব্যবহার করতেন। এতে বেশি মানুষ আকৃষ্ট হয়। ব্যস্ত দুনিয়ায় পাঠক পড়ার আগে চিন্তা করেন লেখাটা তার কোনো কাজে লাগবে কি না। অল্প সময়ে লেখাটা থেকে তিনি কিছু জানতে পারবেন কি না। যদি পাঠক বুঝতে পারেন তাহলে তিনি লেখার ভেতরে যান। এ ভাবনা থেকে অমিত হাবিব শিরোনামে সংখ্যা ব্যবহার করতেন। কালের কণ্ঠের উদ্বোধনী সংখ্যা থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর প্রমাণ মেলে।

সাধারণত তিনি প্রশ্নবোধক শিরোনাম এড়িয়ে চলতেন। কিন্তু যে প্রশ্নের কাক্সিক্ষত উত্তর তিনি পাঠককে দিয়ে বলিয়ে নিতে পারবেন, সেখানেই প্রশ্নবোধক ব্যবহার করতেন।

শিরোনামেও আছে আগে দর্শনধারী, পরে গুণ বিচারির গল্প। শিরোনামে অনেক শব্দ ব্যবহার করলে তা দেখতে ভালো হয় না। অল্প কথার শিরোনাম যেমন দেখতে ভালো হয়, তেমন পাঠককেও আকৃষ্ট করে। অমিত হাবিবও তাই করতেন। তিনি কখনো ডায়েরি ব্যবহার করতেন না। নিউজের আইডিয়া তার মাথায় গেঁথে যেত। রিপোর্টারের কাছ থেকে যখন শুনতেন, তখনই শিরোনাম ঠিক করে ফেলতেন।

অমিত হাবিবের অনুসন্ধানী মনোভাব অনেক পোক্ত ছিল। আর্থিক বিষয়ের চেয়েও জোরালো ছিল তার দেশাত্মবোধের আবেগ।

সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতা প্রধানত রাজনৈতিক মানদন্ডে বিচার করা হয়। কিন্তু অমিত হাবিব রাজনীতির বাইরে গিয়েও তার নিরপেক্ষতা প্রমাণ করেছেন। নিউজের সব বিষয়কে উপযুক্ত মর্যাদা দিয়ে সংবাদপত্রের পাতা সাজাতেন। নিপুণভাবে এ কাজ করতে গিয়েই তাকে তথ্যে বিচিত্রগামী হতে হয়েছে। নিজে একসময় লিখেছেন টেলিভিশন সমালোচনা। সেখান থেকে স্পোর্টসেও বিচরণ ছিল। ব্যাপক পাঠাভ্যাস ছিল। অনুরাগী ছিলেন রাজনীতি, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তির। এ অনুরাগই তাকে ভালো শিরোনাম করার প্রেরণা জুগিয়েছে।

বার্ট্রান্ড রাসেলের একটা মজার গল্প আছে সংবাদমাধ্যমে।

গল্পটা এরকম : একপাল হাতি সুশৃঙ্খলভাবে হেঁটে চলেছে এক প্রত্যন্ত জঙ্গলে। হঠাৎ মাথার ওপরে প্রবল শব্দ করে একটি উড়োজাহাজ উড়তে থাকে। এর আগে হাতির দল কখনই উড়োজাহাজ দেখেনি। হাতির দল ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। এমনিতে হাতিরা খুব শান্তিপ্রিয় এবং দল বেঁধে যাতায়াত করে। এরকম এক অচেনা দৈত্য দেখে হাতিদের মধ্যে প্রায় দাঙ্গা বেঁধে যাওয়ার জোগাড়। তবে তা ছিল মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যাপার। মুহূর্তেই উড়োজাহাজটি মেঘের মধ্যে মিলিয়ে যায়। শব্দও নাই হয়ে যায়। হাতিরা আবার সারি বেঁধে নিঃশব্দে নীরবে সেই মাঠের মধ্য দিয়ে নিজেদের মতো হাঁটতে লাগল।

রাসেল এ লেখাটা লিখে প্রশ্ন করেছেন বলতে পারেন, কেন এমন একটা ঘটনা এত সহজে নিয়ন্ত্রণে চলে এলো? কোনো গোলমাল বাধল না? এর জবাবটাও রাসেল নিজেই দিয়েছেন, ওই হাতির পালের মধ্যে কোনো সাংবাদিক হাতি ছিল না!

সাংবাদিকরা হরদম তিলকে তাল করেন।

অমিত হাবিব তিলকে তাল করতেন না।

লেখক: চিফ রিপোর্টার, দেশ রূপান্তর।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত