প্রায়োগিক সাংবাদিকতার সঙ্গে তাত্ত্বিক পঠন-পাঠনের কিছু ফারাক অনেক ক্ষেত্রে থেকেই যায়। হয়তো সে কারণে সংবাদকক্ষের সাধারণ দৃশ্য সংবাদের কাভারেজ ট্রিটমেন্ট নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা, কখনো কখনো বিতর্ক। অবশ্য কোনো কোনো সংবাদ গল্পের ক্ষেত্রে এসবের কিছুই নাও হতে পারে। অমিত হাবিব, আমাদের অমিতদা, আমরা যারা তার সঙ্গে কাজ করেছি, বুঝতে পেরেছিলাম প্রায়োগিক সাংবাদিকতার একটি মানদণ্ড তিনি গড়ে তুলেছেন। দীর্ঘদিন বার্তাকক্ষে কাটিয়ে দেওয়া মানুষটি স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজতেন সংবাদ গল্পের মধ্যে। প্রখর সংবাদচেতনা আর অসাধারণ সংবাদবোধের নিপুণ প্রয়োগ তাকে অন্যদের কাছ থেকে আলাদা করে দিয়েছিল।
অমিত দাকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এমন অকপট বক্তব্য আমাদের মুগ্ধতাবশত বিভ্রান্তি কি না, তা যাচাই করতে সাংবাদকিতার কিছু তত্ত্ব তালাশ করে দেখা যাক। সংবাদ বা খবরের সংজ্ঞা সংক্রান্ত আলাপে সাংবাদিকতার প-িতরা বলছেন, গুণের বা উপাদানের ভিন্নতার কারণে দুটি সংবাদের একটি আরেকটিকে ছাপিয়ে যায়। সুতরাং, খবরের ট্রিটমেন্ট এ নিরিখেই আলাদা হয়ে যায়। যদিও দুটিই খবর। একই সঙ্গে সংবাদের সংজ্ঞাও আপেক্ষিকতার দোষে দুষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের সড়কে সুইজারল্যান্ডের একজন অচেনা নাগরিকের মৃত্যুর খবরে বাংলাদেশের পাঠকের কিছুই আসে যায় না। তার মানে স্থানকালপাত্র ও পরিস্থিতিভেদে সংবাদের উপাদান ও মূল্য বদলে যায়।
তারপরও কথা থাকে, তা হলো পাঠকের সন্তুষ্টি। প-িতরাও পাঠকের মনস্তত্ত্বকে আমলে নিয়েছেন। তারা বলছেন, এই কারণে সংবাদও একাধিক শ্রেণিভুক্ত। মোটা দাগে, অমিতদার সংবাদবোধ ও বুদ্ধি সব শ্রেণির সংবাদকেই তার সৃজনশীলতার পরিসরে স্থান দিয়েছিল। এমনকি খবর ছাড়াও সংবাদপত্রের সব বিষয় তার মনোযোগ পেয়েছিল তিনি সম্পাদক হওয়ার অনেক আগেই। এই হয়ে ওঠার জন্য তিনি কোনো সংক্ষিপ্ত রাস্তায় হাঁটেননি। বার্তা বিভগের প্রায় সব ধাপ পার হয়েছেন নিজেকে শুধুই সাংবাদিকতায় নিবেদিত করার মাধ্যমে।
দলবাজি কিংবা সাংবাদিক রাজনীতির বাইরে থাকা আপাদমস্তক সাংবাদিক অমিত হাবিবের সংবাদচিন্তায় প্রাধান্য পেত নতুনত্ব আর অভিনবত্ব। মহাশয় কার্ল ওয়ারেন বলেছেন, শিল্প বা সত্য শব্দটির মতো খবর শব্দটাও ক্ষুদ্র, কিন্তু এর অর্থ বহুবিদ। সংক্ষিপ্ত অর্থে তা সাবান বা জুতার মতো সাদামাটা বস্তু। ব্যাপক অর্থে তা গুণের দিক দিয়ে অভিনব বা অগতানুগতিক, বৈচিত্র্যের দিক দিয়ে অনন্ত এবং তা জীবনের মতো সীমাহীন।
অভিনব প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে একটা কথা বলে রাখা ভালো, সফলতা বা ব্যর্থতার মানদণ্ডে অমিতদাকে বিচার করা ঠিক হবে না। দৈনিক যায়যায়দিন, কালের কণ্ঠ ও সর্বশেষ দেশ রূপান্তর সবখানেই সংগঠক ও নেতৃত্বের ভূমিকায় নতুন চিন্তার ছাপ রেখেছেন তিনি। ছাপা কাগজের বিষয়ে, আঙ্গিকে সৃজনশীলতার ঝলক দেখিয়েছেন।
অমিত হাবিবকে নিয়ে যেকোনো আলোচনায় এখনো তার সংবাদ ভাবনা, পরিকল্পনা, অ্যাঙ্গেল, সম্পাদনা, ট্রিটমেন্ট এসব নিয়ে কথা হয়। আর অবধারিতভাবে আসবে ‘শিরোনাম’। দেশ রূপান্তরের আগে কালের কণ্ঠে ছিলেন তিনি। ভোরের কাগজের পর এ পত্রিকাতেই বেশি দিন কাজ করেছেন তিনি। কালের কণ্ঠের বয়স তখন প্রায় ছয় মাস। একটি সংবাদ প্রধান শিরোনাম হয়েছিল, গতানুগতিক সংবাদের বাইরের এ সংবাদগল্পটি তখন তুমুল আলোচিত হয়েছিল। কবে প্রকাশিত হয়েছিল, তারিখ মনে পড়ছিল না, শুধু শিরোনাম মনে আছে ‘বিরল ভালোবাসা’। সেদিন আর কী কী গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ ছিল? সেই কৌতূহল থেকে ফোন করেছিলাম পত্রিকাটির রেফারেন্স বিভাগের জাহাঙ্গীর আলম সজীবকে। সংবাদ গল্পটির বিষয়ে জানতে চাইতেই তিনি বললেন, ‘এটা তো আইকনিক স্টোরি।’ জানালেন, এই সংবাদ গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০১০ সালের ২ জুন।
এই সংবাদ গল্পে পাওয়া যাচ্ছে পঁচাত্তরের জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা পর বঙ্গবন্ধুর এতিম কন্যা শেখ হাসিনার নামে ৭ শতাংশ জমি কিনেছিলেন ময়মনসিংহের দরিদ্র ভ্যানচালক হাসমত আলী। সেই জমির দলিল তিনি হস্তান্তর করে যেতে পারেননি। স্ত্রী রমিজা খাতুনের কাছে রেখে গিয়েছিলেন। ততদিনে রমিজাকে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামতে হয়েছে। রাজধানীর রাস্তায় ভিক্ষা করার পাশাপাশি শেখ হাসিনার হাতে সেই দলিলটি তুলে দেওয়ার জন্য কোমরে গুঁজে সবসময় নিজের সঙ্গে রাখতেন। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী। তার সঙ্গে দেখা করা কি রমিজার পক্ষে সম্ভব? এই জমি নিয়ে ছেলে কাদিরের সঙ্গে শ্যামলীর রাস্তায় ঝগড়ার সূত্রে খবরটি পেয়েছিলেন প্রতিবেদক। সেই খবরটিই কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম করলেন তখন নির্বাহী সম্পাদক পদে থাকা অমিত হাবিব। পাঠক হৃদয়কে আলোড়িত করা এ সংবাদ গল্পটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও আবেগে ভাসিয়েছে। পরদিন প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন গণভবনে ডেকে নিলেন রমিজাকে, বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন। বদলে গেল রমিজার হাত পেতে চলা নির্মম জীবন।
খবরটি কোন বিবেচনায় অমিতদা প্রধান শিরোনাম করলেন। কী আছে এই খবরে? সংবাদটির শিরোনাম পাঠককে প্রথমেই বলে দিচ্ছে ভালোবাসার এমন দৃষ্টান্ত সচরাচর দেখতে পাওয়া যায় না। অর্থাৎ অভিনবত্ব আছে এ খবরে। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার এতিম সন্তানের জন্য একজন ভক্তের এমন মানবিক নিবেদন অকল্পনীয়। হাসমত আলীর মতো মানবেতর ব্যক্তির এ নিবেদন একজন অবিসংবাদিত নেতার জন্য, যিনি বাংলাদেশের মহানায়ক।
খবরটি যেদিন প্রকাশিত হলো, সেদিন বড় আর যে দুটি খবর ছিল তার একটি ‘আমার দেশ’ পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত আর বেগুনবাড়ী এলাকায় ভবন ধস। পরিস্থিতি বাদ দিলে ‘বিরল ভালোবাসা’ শিরোনামের সংবাদ গল্পটির বড় খবর হওয়ার প্রায় সব উপাদানই আছে। যেমন পাঠকের আগ্রহ, নৈকট্য, বিষমতা, অভিনবত্ব, প্রসিদ্ধি, তাৎপর্য, প্রভাব ইত্যাদি।
এবার দেখা যাক, বড় ঘটনা কাভারেজ দেওয়ার ক্ষেত্রে অমিত হাবিব কী করতেন? ২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন যখন শুরু হয় তিনি তখন দ্বিতীয় দফায় কালের কণ্ঠে, উপদেষ্টা সম্পাদকের ভূমিকায়। এ আন্দোলনের ব্যাপকতা ও অভিঘাতের আদ্যোপান্ত কালের কণ্ঠের প্রথম পৃষ্ঠায় তুলে এনেছিলেন তিনি। সে সময় এক দিন দেশের প্রভাবশালী একটি বাংলা দৈনিকের সহকর্মীর সঙ্গে দেখা হতেই উচ্ছ্বসিত প্রশংসা শোনা গিয়েছিল তার কণ্ঠে। পাঠক কী ভাববে সেটা নয়, বরং কী নিয়ে ভাববে তা তুলে আনাই তো সাংবাদিকের কাজ। ইস্যু সৃষ্টি করা নয়, বরং ইস্যুটার সব দিক পাঠককে জানানো। এ নিরিখে অমিত হাবিব গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনকে খুঁটিনাটিসহ পাঠকের সামনে কালক্ষেপণ না করেই তুলে ধরতে পেরেছিলেন।
ওই বছরই সারা দেশকে কাঁপিয়ে দেওয়া হেফাজতে ইসলামের শাপলা চত্বরের অবস্থান কর্মসূচি ও তা-বের ঘটনা ছিল আরেকটি বড় ঘটনা। ওই সময় সংগঠনটি দাবি করেছিল যে, তাদের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী নিখোঁজ। কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে এ দাবির সত্যতা মেলেনি। এ সংবাদটিও গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়েছিল তখন। হেফাজত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। ওই সময় অমিতদা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার কথা বলতেন। তার এ সাংবাদিকতার প্রতিফলন ঘটেছে পরবর্তী বিভিন্ন ঘটনায়। তার মধ্যে ২০১৬ সালে হলি আর্টিসান বেকারি অ্যান্ড রেস্তোরাঁয় হামলা ও ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন অন্যতম। সরাসরি বলতে না পারলে ঘুরিয়ে কীভাবে পাঠককে সত্যটা জানানো যায় সে কৌশল প্রয়োগ করতে দেখেছি বিতর্কিত ওই নির্বাচনের সময়। তখন শুধু দেশ রূপান্তর প্রকাশিত হয়েছে। তার পরে করোনা মহামারীর সময় আমরা দেখেছি, প্রথম আলোর মালিক লতিফুর রহমানের মৃত্যুর খবর শুধু প্রথম পৃষ্ঠায় গুরুত্ব দিয়েই প্রকাশ করেননি, শিরোনামেই পাঠককে জানিয়েছেন তার মতো একজন উদ্যোক্তা সংবাদপত্রের জন্য খুবই দরকার এখন।
প্রায় চার দশকের সাংবাদিকতার জীবনে এলটন জনের গানও নিজে অনুবাদ করে সংবাদপত্রে জায়গা দিয়েছেন। সাক্ষাৎকারকে স্থান দিয়েছেন প্রধান খবরের জায়গায়। কাভারেজ দেওয়ার ক্ষেত্রে এমন উদারতার নজিরও রেখেছেন। কারও কারও মনে হতে পারে যে, এসবের সঠিকতা-বেঠিকতা তর্কাতীত নয়। সে বাহাসে যাব না, বরং অমিত হাবিবের কাজ প্রায়োগিক সাংবাদিকতাকে কতটা সমৃদ্ধ করতে পেরেছে, তা নিয়ে সাংবাদিকতার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গবেষণা করতে পারেন।
লেখক: নিউজ এডিটর, দেশ রূপান্তর।