১৭ হাজার কোটি হয়ে গেল ১০০ কোটি!

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২৩, ০২:২৩ এএম

শরিয়াহসম্মত সুদবিহীন বিনিয়োগের প্রচারণা চালিয়ে মাল্টিপারপাস কোম্পানির নামে সাধারণ মানুষের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে পিরোজপুরভিত্তিক এহসান গ্রুপ। এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২১ সালের শেষের দিকে অভিযান চালিয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রধানসহ সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তার করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। পুলিশের বিশেষায়িত এই ইউনিটটি তখন এহসান গ্রুপের বিরুদ্ধে ১৭ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের তথ্য জানালেও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এত বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ খুঁজে পাচ্ছে না। তারা এহসান গ্রুপের লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনার পর প্রাথমিকভাবে মাত্র ১০১ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে। এ ঘটনায় অর্থপাচার আইনে একটি মামলা করে এই তদন্ত সংস্থাটি। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে করা মামলাটির তদন্ত এখনো চলছে, তবে র‌্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী ১৭ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সিআইডির তদন্তকারীরা।

সিআইডির কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, এহসান গ্রুপের বিরুদ্ধে করা অর্থপাচার আইনের মামলায় ১০১ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির অনুকূলে ১৭৭ শতাংশ জমি ও ২৫টি ব্যাংক হিসাবে ১২ লাখ টাকা পাওয়া গেছে, যা আদালতের মাধ্যমে জব্দ করা হয়েছে। তদন্ত শেষে সম্পদ ও টাকার অঙ্ক বাড়বে, তবে তা ১৭ হাজার কোটি হবে বলার কোনো সুযোগ নেই। যেসব তথ্য এখন পর্যন্ত সংগ্রহ করা হয়েছে সেখানে এত টাকা হাতিয়ে নেওয়ার প্রমাণ এখনো পাওয়া যাচ্ছে না।

২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীর তোপখানা রোডে অভিযান চালিয়ে এহসান গ্রুপের চেয়ারম্যান রাগীব আহসান ও তার সহযোগী আবুল বাশারকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাবের একটি দল। একই দিনে পিরোজপুর সদর থানার পুলিশ রাগীব আহসানের দুই ভাই মাহমুদুল হাসান ও খাইরুল ইসলামকেও গ্রেপ্তার করে। এরপর ডিসেম্বরে পিরোজপুর সদর থানায় অর্থপাচার আইনে মামলা করে সিআইডি। এই মামলায় এহসান গ্রুপের চেয়ারম্যান রাগীব আহসান, তার স্ত্রী সালমা আহসান, আবুল বাশার খান, খায়রুল ইসলাম, শামীম হাসান, মাহমুদুল হাসান, নাজমুল ইসলামসহ ৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইমের বিশেষ পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবির (বর্তমানে সিআইডি নারায়ণগঞ্জে কর্মরত) জানিয়েছেন, মামলাটির তদন্তে যথেষ্ট সময় নিয়ে প্রাপ্ত তথ্যগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যগুলোতে এত টাকা (১৭ হাজার কোটি) আত্মসাতের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে তদন্ত শেষে টাকার প্রকৃত পরিমাণ জানা যাবে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কাছে ১৭ হাজার কোটির অভিযোগ ছিল। গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা (এহসান গ্রুপের চেয়ারম্যান রাগীব আহসান ও তার সহযোগীরা) ১১০ কোটি টাকা সংগ্রহের স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন। আমরা তাদের গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য গণমাধ্যমকে জানাই। পরে এ বিষয়ে তদন্ত সংস্থাগুলো বিস্তারিত তদন্ত করে।’

জানা গেছে, এহসান গ্রুপ শরিয়াহসম্মত সুদবিহীন বিনিয়োগের প্রচারণা চালিয়ে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করে। বিভিন্ন এলাকায় ওয়াজ মাহফিল আয়োজন করে তার আড়ালে ব্যবসায়িক প্রচারণা চালাত। এভাবে ২০০৮ সাল থেকে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আমানত নিয়ে ব্যবসা করে আসছিল প্রতিষ্ঠানটি। ১ লাখ টাকা আমানতের বিপরীতে মাসে ২ হাজার টাকা লভ্যাংশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা। এছাড়াও ৫৪ মাস, ৫৬ মাস, ৬ বছর, ১০ বছরসহ বিভিন্ন মেয়াদি আমানত সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৯ সালের জুলাই থেকে তারা গ্রাহকদের মাসিক মুনাফা ও আমানতের টাকা ফেরত দেওয়া বন্ধ করে দেয়। প্রতারণার উদ্দেশ্যে হাতিয়ে নেওয়া টাকা বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করে। এরই মধ্যে ‘এহসান গ্রুপ বাংলাদেশ’ নামে ছাড়াও এহসান পিরোজপুর বাংলাদেশ (পাবলিক) লিমিটেড, এহসান রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড বিল্ডার্স লিমিটেড, নুর-ই মদিনা ইন্টারন্যাশনাল ক্যাডেট একাডেমি, জামিয়া আরাবিয়া নুরজাহান মহিলা মাদ্রাসা, হোটেল মদিনা ইন্টারন্যাশনাল (আবাসিক), আল্লাহর দান বস্ত্রালয়, পিরোজপুর বস্ত্রালয়-১ ও ২, এহসান মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড, মেসার্স বিসমিল্লাহ ট্রেডিং অ্যান্ড কোং, মেসার্স মক্কা এন্টারপ্রাইজ, এহসান মাইক অ্যান্ড সাউন্ড সিস্টেম, এহসান ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলস, ইসলাম নিবাস প্রজেক্ট, এহসান পিরোজপুর হাসপাতাল, এহসান পিরোজপুর গবেষণাগার এবং এহসান পিরোজপুর বৃদ্ধাশ্রম নামে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। এছাড়াও রাগীব আহসান আত্মীয়স্বজনদের নামে বিভিন্ন এলাকায় জমি কিনেছেন।

র‌্যাব জানায়, রাগীব আহসান ১৯৮৬ সালে পিরোজপুরের একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত হাটহাজারীর একটি মাদ্রাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস এবং ১৯৯৯-২০০০ পর্যন্ত খুলনার একটি মাদ্রাসা থেকে মুফতি ডিগ্রি সম্পন্ন করে পিরোজপুরে একটি মাদ্রাসায় চাকরি নেন। ২০০৬-২০০৭ সালে তিনি ইমামতির পাশাপাশি একটি কোম্পানিতে মাসিক ৯০০ টাকা বেতনের চাকরি করতেন। ওই প্রতিষ্ঠানে চাকরির সময় তিনি মাল্টিপারপাস কোম্পানির আদ্যোপান্ত রপ্ত করেন। পরবর্তী সময়ে নিজে ২০০৮ সালে এহসান রিয়েল এস্টেট নামে একটি মাল্টিপারপাস কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ২০০৮ সালে পিরোজপুরে সমবায় অধিদপ্তরের কার্যালয় থেকে নিবন্ধন নিয়ে এহসান মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড নামে একটি সমবায় সমিতি খুলে আমানত নেওয়া শুরু করেন। এর এক বছর আগে তিনি মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির কাছে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনার লাইসেন্সের আবেদন করেছিলেন, তবে তার অনুমোদন পাননি। ২০১২ সালে অবৈধভাবে আমানত গ্রহণ করায় মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি এহসান গ্রুপকে গ্রাহকের সঞ্চয় ফেরত দিতে বলেছিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত