এক টাকা-দুই টাকার বিড়ম্বনা

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২৩, ০৫:২৭ পিএম

ব্রান্ডেড ওয়্যার হাউস আর্টিসান। রুচিশীল মানুষের চাহিদা পূরণ করে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করে যাচ্ছে দীর্ঘদিন। গত শনিবার (১৯ আগস্ট) আর্টিসানে মূল্য ছাড়ের ঘোষণা দিয়ে মোবাইল ফোনে বার্তা পাঠানো হয়। অমনিই হুমড়ি খেয়ে পড়ে ফ্যাশন সচেতন নারী-পুরুষরা।

রাজধানীর অভিজাত এলাকা বেইলী রোডের শো-রুমে কেনাকাটা করতে যান শফিকুল ইসলাম নামের এক ব্যাক্তি। রাত ৮টায় শো-রুমে ঢুকে ছয় হাজার ৩২৪ টাকার কেনাকাটা করেন তিনি। পরে মূল্য পরিশোধ করতে ক্যাশ কাউন্টারে যান।

এ সময় শফিকুল এক হাজার টাকার সাতটি নোট আর্টিসানের ক্যাশ কাউন্টারের দায়িত্বে থাকা নারীকে (নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশ করা হয়নি) দেন। কিন্তু ভাংতি না থাকার অজুহাতে তার কাছ থেকে ছয় হাজার ৩২৫ টাকা রাখা হয়। তখন ওই ক্রেতা ক্যাশ কাউন্টারে থাকা নারীকে বলেন, ভাংতি না থাকলে এক টাকা কম তো আপনার রাখা উচিত। এক টাকা বেশি রাখবেন কেন? এটি উচিত নয়।

এই প্রশ্নে ক্যাশ কাউন্টারের দায়িত্বে নারী মৃদু হাসি দিলেন। জানালেন, এক টাকা কম রাখা কম্পিউটার সিস্টেমে নেই। কম রাখলে সেটা আমার বেতন থেকে কাটা হবে।

রাত সাড়ে ৮টার দিকে যখন এ ঘটনা ঘটছে, তখন এই প্রতিবেদক নিজেও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। পরে বেইলী রোডের ইয়োলো, জেন্টাল পার্কসহ আরও কয়েকটি ওয়্যার হাউসের শো-রুমে খবর নেন তিনি। এ সময় আরও দুটি এমন ঘটনা নজরে আসে।

তবে বেশিরভাগ ক্রেতা ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন করেন বলে এ বিপত্তিতে কম পড়েন। জটিলতায় পড়েন যারা নগদ লেনদেন করেন সেসব ক্রেতারা।

রাত ৯টার কিছু আগে ইয়োলোতে চার হাজার ৩৩৪ টাকার কেনাকাটা করেন রেশমা নামের এক নারী। তিনি এক হাজার ও ৫০০ টাকার নোট মিলিয়ে মূল্য পরিশোধ করেন। কিন্তু বাকি টাকা ফেরত নিতে গিয়ে এক টাকা কমই পেলেন। অবশ্য এতে তিনি কোনও আপত্তি জানাননি।

শো-রুম থেকে বেরোবার সময় এ প্রতিবেদককে বলেন, এক, দুই টাকা কম নেওয়ার ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। এ আর এমন কী! রেশমার কাছে বিষয়টি গুরুতর মনে না হলেও ব্যাপারটা কী এতই সামান্য কিছু?

প্রশ্ন হলো, হাজার হাজার টাকার শপিংয়ে এক, দুই টাকা কম নেওয়া সত্যিই এমন কোনও গুরুতর ঘটনা নয়, কিন্তু কোটি কোটি টাকা পুঁজির ব্যবসায়ী মালিকরা কেন এক, দুই টাকা কম রাখার প্র্যাকটিস করেন না? কেন এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের এক টাকা কম নেওয়ার চর্চা শেখানো হয় না? কম্পিউটার সিস্টেমে কেন এক টাকা কম রাখার সুযোগ থাকে না? সাধারণ ক্রেতারা কেন ভাংতির জন্য ঠকবেন?

যেমন বাংলামোটর এলাকায় টেস্টি ট্রিটের শো-রুমটিতে প্রায় এক, দুই ও পাঁচ টাকার সংকট দেখানো হয়। আনিস নামের এক ব্যক্তি বলেন, ভাংতি না থাকার অযুহাতে এ শো-রুমে প্রায় টাকা কম দেওয়ার ঘটনা ঘটে। কর্মীরা ভাংতি না রেখে সেই দায় সাধারণ ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দেয়।

এদিকে ফুটপাতের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বড় বড় শপিংমলের সর্বত্রই কেনাকাটায় ভাংতির জন্য বিড়ম্বনায় পড়েন সাধারণ মানুষ। কোথাও কোথাও আবার পাঁচ টাকার বিড়ম্বনাও থাকে। এ অপরাধের জন্য স্যরি বলার সংস্কৃতিও গড়ে উঠেনি। বরং ক্রেতা তার পাওনা এক, দুই টাকা চাইলে প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন।

সাধারণ ক্রেতারা মনে করছেন, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের মালিক, ম্যানেজার বা কর্মচারী যিনিই ক্যাশ কাউন্টারে দায়িত্ব পালন করেন মূল্য পরিশোধের পর ভাংতি না থাকার অজুহাতে ক্রেতাকে বঞ্চিত করেন। এই সমস্যা থেকে মুক্তির উপায় খুঁজে বের করা উচিত।

ঘটনাটির আরও একটু গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করতে এ প্রতিবেদক গতকাল রবিবার (২০ আগস্ট) কয়েকটি অভিজাত শপিং সেন্টারে যান। সেখানেও ওয়্যার হাউসগুলোর ক্যাশ কাউন্টারে একই চিত্র দেখা যায়।

বসুন্ধরা শপিং সেন্টারে জেন্টাল পার্কের এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। তার দাবি, এমন ঘটনা ঘটার কোনও কারণ নেই। প্রত্যেক ওয়্যার হাউসেই লেনদেনের জন্য প্রতিদিন ৩০ হাজার টাকা ভাংতি রাখা হয়।

যদিও নাম প্রকাশ না করার শর্তে আর্টিসান, ইয়োলোর শো-রুমের দায়িত্বে থাকা একাধিক ম্যানেজার দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, প্রতিদিন ভাংতি কিছু টাকা দেওয়া হয় তা সত্যি। তবে ভাংতি এক, দুই ও পাঁচ টাকা কমই থাকে। তারা এও জানান, ক্যাশ পরিচালনার সময় এক ও দুই টাকা নিয়েই ঝামেলায় পড়েন তারা। মালিকপক্ষের এক, দুই টাকা কম রাখার নির্দেশনা থাকলে সাধারণ ক্রেতাদের কাছ থেকে কম রাখা যায়।

এদিকে মুদি দোকানসহ রাস্তার ফুটপাতে, চা-সিগারেট বিক্রির দোকানগুলোতেও ভিন্ন পথ অনুসরণ করছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। এ ক্ষেত্রে ক্রেতাকে ভাংতি নেই বলে সমমূল্যের চকলেট ধরিয়ে দেওয়া হয়। আবার অনেকে তাও করেন না। অবশ্য ভাংতি না থাকলে পাড়া-মহল্লার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কখনও কখনও এক, দুই টাকা কম রাখেন, যা দেখা যায় না বড় বড় শপিংমলের ব্রান্ডেড ওয়্যার হাউসের ক্যাশ কাউন্টারে। এ কারণে সাধারণ ক্রেতাদের মুখে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের প্রশংসা করতে শোনা যায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত