‘আমরা জীবনেও ভোট দেই নাই। ভোট ক্যামতে দেয় হেইয়াও জানি না। হুজুর এই এলাকার নারীগো পর্দা করতে কইছে, ভোট দিতে মানা করছে, হেলিগ্যা আমরা কহনো ভোট দিতে যাই নাই। আমার স্বামী কহনই আমারে ভোট দিতে যাইতে কয় নাই। উল্ডা মানা করছে। না যাইতে যাইতে অহন আর ইচ্ছাও করে না।’ নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিয়ে এভাবেই মন্তব্য করলেন চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের গৃদকালিন্দিয়া গ্রামের সলেমান মিয়ার স্ত্রী খাইরুন্নেছা।
জনৈক মওদুদুল হাসান জৈনপুরী (র.) নামের এক পীরের নির্দেশ মেনে এই ইউনিয়নের নারীরা বাংলাদেশ স্বাধীনের পর থেকে অনুষ্ঠিত সকল জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করা থেকে বিরত রয়েছেন। ঘরে বাইরে সকল কাজে নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থাকলেও ওই ইউনিয়নের অধিকাংশ পুরুষই চান না নির্বাচনে নারীরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করুক।
আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও তাদের এই মনোভাবের কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি। যুগ যুগ ধরে কুসংস্কার মেনে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ না করে আসা এসব নারীদের ভোটদানে উদ্বুদ্ধ করতে প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কিংবা রাজনীতিবিদদের কার্যকর কোনো উদ্যোগও দেখা যায় না।
শাশুড়ির মতোই ভোট দেন না পার্শ্ববর্তী রূপসা উত্তর ইউনিয়ন থেকে খাইরুন্নেছার ছেলের বউ হয়ে আসা রাবেয়া বেগমও (৩৫)। বিয়ের পর থেকে তিনি দেখে আসছেন, এখানকার নারীরা ভোট দিতে কেন্দ্রে যান না। তিনি বলেন, ‘আমার শ্বশুর-শাশুড়িও আমাকে ভোট দিতে যেতে নিষেধ করেছেন। তবে আমার স্বামী ভোট দিতে যেতে কখনো নিষেধ করেননি, আবার যেতেও বলেনি। যেহেতু এলাকার কোনো নারীই ভোট দিতে যান না, তাই আমিও যাই না।’ তবে নিজের বাবার বাড়ির এলাকার নারীরা ভোট দিতে যান বলে তিনি জানান। তাঁর নিজস্ব মত, ভোট দেওয়া উচিত। ভোট নষ্ট করা ভালো কিছু না।
রাবেয়ার শাশুড়ি খাইরুন্নেছা বলেন, ‘প্রার্থীরা জানে মহিলারা ভোট দেয় না। হেলিগ্যা হেরা আমগো কাছে ভোট চাইতও আহে না।’ কখনো এই এলাকার নারীদের ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করতে সরকারি কিংবা বেসরকারিভাবে কাউকে কাজ করতে দেখেননি তিনি।
এ ব্যাপারে এই ইউনিয়নের গৃদাকালিন্দিয়া, কাউনিয়া, চর মান্দারীসহ প্রায় প্রতিটি গ্রামের নারীদের মনোভাব একই রকম দেখা গেছে। ৪ বর্গমাইল আয়তনের রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নে মোট ভোটার ১৯ হাজার ৯৪৫ জন। পুরুষ ভোটার ১০ হাজার ৪৪৬ আর নারী ভোটার ৯ হাজার ৪৯৯ জন।
সরেজমিন রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়ন ঘুরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, দেশ স্বাধীনের পরে রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নে হঠাৎ একবার কলেরা মহামারি দেখা দেয়। মহামারি থেকে রক্ষা পেতে দোয়ার আয়োজন করা হয়। তখন জনৈক পীর মওদুদুল হাসান জৈনপুরী নারীদের পর্দা মেনে চলার জন্য আদেশ দেন। যুগ যুগ ধরে সেই আদেশ মেনে চললেও সময়ের ব্যবধানে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন নারীরা। লেখাপড়া থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব কাজই ঘরে–বাইরে সমান তালে করছেন তারা। শুধু ভোট দিতে যান না। পুরুষদের কারও কারও ধারণা, পীরের নির্দেশ অমান্য করে ভোট দিতে কেন্দ্রে গেলে ক্ষতি হবে তাদের।
গৃদকালিন্দিয়া গ্রামের আরেক ভোটার তাছলিমা বেগম। ২০১৫ সালে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় তার নাম। এরপর ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় নির্বাচন, ২০১৯ সালে ফরিদগঞ্জ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন এবং ২০২২ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হলেও তিনি ভোট দেননি। তাছলিমা বলেন, ‘আমি কখনো ভোট দেই নাই। আমাদের বাড়ির কোনো নারী ভোট দেয় না, হুজুরের নির্দেশ। অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে বাইরে বের হলেও ভোট দিতে মুরুব্বিরা নিষেধ করেছেন আমাদের।’ তিনি লোকমুখে শুনেছেন, বেশ কয়েক বছর আগে নারীদের ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করতে একটি সভার আয়োজন করা হয়েছিল। তখন সভায় ব্যবহৃত মাইক নষ্ট হয়ে যায়। তবে মাইক নষ্ট হওয়ার ঘটনা কাকতালীয় বলে জানান ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শরীফ হোসেন।
তাছলিমার বাবা মো. তছলিম বলেন, ‘আমি হুজুরকে নিজের চোখে দেখেছি। তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন, এই ইউনিয়নে যেন কোনো মহিলা ভোট দিতে না যায়, সবাই যেন পর্দার মধ্যে থাকে। তাঁর আদেশ মেনে কোনো নারী ভোট দিতে যান না। তাই আমি আমার মেয়েদের কখনো ভোট দিতে যেতে বলিনি, আগামীতেও বলব না।’
মওদুদুল হাসান জৈনপুরী (র.) এর ভাতিজা মাওলানা তারগিব আহমেদ সিদ্দিকী জৈনপুরী বলেন, ‘ধর্ম প্রচার করার জন্য আমার চাচা বড় হুজুর সৌদি আরব থেকে এই দেশে আসেন। তিনি নারীদের পর্দার মধ্যে থাকার জন্য ভোট না দেওয়ার জন্য বলেছিলেন। এখন অনেক কিছু বদল হচ্ছে। এখন নারীরা বাইরে বের হয়, হাটবাজার করে।’ তার মতে, দেশের আইন অনুযায়ী নারীদেরও ভোট দেওয়ার হক আছে। যার ইচ্ছা ভোট দিতে যেতে পারে। এটা যার যার হক। তবে বড় হুজুরের নির্দেশের ব্যাপারে তিনি কিছু বলতে পারবেন না।
রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের (সংরক্ষিত ১,২,৩) ইউপি সদস্য সাজেদা আক্তার বলেন, ‘নির্বাচনে নারীরা আমাদের ভোট দেয় না। আমরা নারী সদস্যরাও পুরুষের ভোটে নির্বাচিত হই। যা অত্যন্ত কষ্টের বিষয়। নির্বাচনে আমি সম্ভবত ৬৫৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হই। এর মধ্যে নারীরা ভোট দিয়েছে মাত্র ২০ জনের মতো। সকল কাজে তারা ঘর থেকে বের হতে পারে, কিন্তু ভোটের বেলায় আসে না, এটা দুঃখজনক।’
রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শরীফ হোসেন বলেন, এই ইউনিয়নের মহিলার সব ক্ষেত্রে আছেন। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, ভিজিএফ কার্ড, প্রতিবন্ধী ভাতাসহ সরকারের সকল সুযোগ–সুবিধায় তারা আছেন। মাংসের বাজার, মাছের বাজার, গার্মেন্টস সকল জায়গায় নারীরা আছেন। শুধু ভোটকেন্দ্রে নেই, এটা দুঃখজনক। তিনি বলেন, ‘আমার নির্বাচনে আমার কেন্দ্রে প্রায় ১০০ নারী ভোট দিয়েছেন। এরা সবাই আমার আত্মায়-স্বজন। আমি তাদের বুঝিয়ে নিয়ে এসেছিলাম। আমি না দাঁড়ালে হয়তো তাঁরাও ভোট দিত না। তবে প্রতিটি নির্বাচনের আগে নারীদের সচেতন করতে সভা–সমাবেশ করা হয়েছে। আমি মনে করি নারীরা ভোট দিলে কোনো সমস্যা নেই।’
গৃদকালিন্দিয়া মওদুদুল হাসান জৈনপুরী (র.) জামে মসজিদ ও ঈদগাহ ময়দানের ইমাম হাফেজ মো. বেনিয়ামিন বলেন, ‘আমার বাবা ক্বারী মনসুর আহমেদ এই মসজিদে দীর্ঘ ৪৫ বছর ইমামতি করেছেন। বাবা মসজিদে থাকা অবস্থায় জৈনপুরী হুজুর বলে গেছেন, নারীদের ভোট দেওয়া হারাম। এরপর থেকে নারীরা ভোট দেন না। তবে আমরা যতটুকু জানি, ভোট দেওয়া নারীর অধিকার, এটা শতভাগ জায়েজ। নারী পর্দার মধ্যদিয়ে ভোট দিতে যেতে পারেন। আগামীতে নারীরা যেন ভোট দিতে আগ্রহী হন, সে জন্য তিনি ব্যক্তিগতভাবে উদ্বুদ্ধ করবেন বলে জানান।
রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ সভাপতি মো. ইসকান্দার আলী বলেন, পীরের নামে গুজব ছড়িয়ে নারীদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়। এ ক্ষেত্রে এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যানরাও দায় এড়াতে পারবেন না। অতীতে তারাই নারীদের ভোটকেন্দ্রে যেতে উদ্বুদ্ধ করার কোনো উদ্যোগ নেননি। ভোট দিতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে এরকম গুজব ছড়িয়ে নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ বন্ধ করে দেয় এক শ্রেণীর সুবিধাভোগী। গেল ইউপি নির্বাচনে কিছু নারী ভোট দিয়েছেন। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে নারীদের ভোট দেওয়ার জন্যে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এবার নারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট প্রয়োগ করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান বিল্লাল হোসেন খান বলেন, আমরা সব সময়ই নারীদের ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করেছি। কিন্তু কিছু স্বার্থ অন্বেষী মহল নারীদের ভোট দিতে নিরুৎসাহিত করে আসছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে নারীদের বেশি করে নিরাপত্তা দিতে হবে। যেন কেউ কোন অঘটন ঘটানোর সুযোগ না পায়।
জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. তোফায়েল হোসেন বলেন, ২০২২ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আগে তারা ওই ইউনিয়নের নারীদের উদ্বুদ্ধ করতে সভা করেছিলেন। কিন্তু তা খুব একটা কাজে আসেনি। ওই নির্বাচনে মোট ভোট পড়েছিল পাঁচ হাজার ৫৯৪টি। আনুমানিক ১০০ থেকে ১২০ জন নারী ভোট দিয়েছিলেন। এখানে নারী-পুরুষ ভোটারের সংখ্যা প্রায় সমান। তিনি বলেন, ‘ভোট মানুষের নাগরিক অধিকার। তবে আমরা কাউকে জোর করতে পারি না। পরিবার থেকে সচেতনতা বৃদ্ধি না পেলে এই কুসংস্কার থেকে নারীদের মুক্ত করা কষ্টকর হয়ে যাবে।’
যোগাযোগ করা হলে জেলা প্রশাসক কামরুল হাসান বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে জেনে নারীদের ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করব। প্রয়োজনে পুলিশ সুপারকে সঙ্গে নিয়ে নারীদের সচেতন করতে আলাদাভাবে সভা করব।’
চাঁদপুর জেলা সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি ডা. পিযূষ কান্তি বড়ুয়া বলেন, কুসংস্কারকে আঁকড়ে রেখে এখানকার নারীরা নাগরিক অধিকার ভোগ করতে পারছেন না। তারা দেশের সরকার গঠনে অংশ নিতে পারছেন না। তাদের পিছিয়ে রাখা আমাদের জন্য একটি বড় অপরাধ। এই অন্ধকার থেকে নারীদের মুক্তির আলোয় আনা দরকার। এ জন্য প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক, মানবাধিকার সংগঠন, সাংবাদিকসহ সবাইকে এগিয়ে আসা উচিত।
