রাজনীতি শব্দটির যথার্থ অর্থ সংজ্ঞায়িত করা দুরূহ, রাজনীতি হলো একটি ব্যাপক ধারণা। ইংল্যান্ডের ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রখ্যাত রাজনীতি বিজ্ঞানী অড্রিয়ান লেফটউইচের মতে, ‘আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক, সর্বসাধারণ ও ব্যক্তি নির্বিশেষে সব সমষ্টিগত কার্যকলাপের মূলে রাজনীতি বর্তমান।’ রাজনীতিবিজ্ঞানের লেখক অ্যান্ড্রু হেউড তার ‘politics’ গ্রন্থেও একই মত পোষণ করেছেন। গ্রিক শব্দ পলিশ (politic) এবং পলিটেজ (politics) শব্দ দুটি থেকে পলিটিক্স (politics) শব্দটির উৎপত্তি। আর সহজ অর্থে রাজ্য বা রাষ্ট্রবিষয়ক রীতিনীতি বা নিয়মকানুন ইত্যাদি নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের রাজনীতিবিদ বলা হয়ে থাকে। আমাদের সংবিধান মতে, রাষ্ট্রের ৩টি মূল অঙ্গ রয়েছে যথা- ১. বিচার বিভাগ, ২. নির্বাহী বিভাগ, ৩. আইনসভা। বৃহত্তর অর্থে ৩টি রাষ্ট্রীয় মূল ভিত্তির সঙ্গে যারা ওতপ্রোতভাবে জড়িত বা দায়িত্বপ্রাপ্ত তারা সবাই রাষ্ট্রীয় ধারণার আলোকে রাজনীতিবিদ। সেই অর্থে বিচার বিভাগের কর্ণধারদের রাজনীতিবিদ বলার মধ্যে অসাংবিধানিক কিছু নেই।
সংবিধান একটি প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ ও অলংঘনীয় আইন, একটি দেশের রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতিচ্ছবি। রাষ্ট্রের সব বিষয় এতে বিধৃত থাকে। সংবিধানের নির্দেশনাই রাষ্ট্র পরিচালনার মূল সূত্র। এই মহামূল্যবান দলিল বাংলার জনগণ আন্দোলন-সংগ্রাম ও লাখো জীবনের বিনিময়ে লাভ করেছে, যা বাঙালি জাতির হাজার বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে সেরা কীর্তি, রাজনৈতিক চড়াই-উতরাইয়ের ফসল।
বাংলাদেশের সংবিধান বাঙালি জাতির চরম আশা-আকাক্সক্ষার বহিঃপ্রকাশ। মুক্তিকামী রাজনীতি সংশ্লিষ্ট বাঙালি জনতার বুকের তাজা রক্তে লিখিত এক ঐতিহাসিক দলিল। বাঙালির হাজার বছরব্যাপী আত্মাহুতি আর আহাজারির পুরস্কার। যারা এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক মতাদর্শের পরিচয় বহন করে, এ সংবিধান তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না। সংবিধানে সরকারের গঠণপ্রণালি, নাগরিকের মৌলিক অধিকার, রাষ্ট্র পরিচালনাসংক্রান্ত নীতিমালা এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গ ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা, দায়িত্ব ও নিয়ম সম্পর্কে ইতিবৃত্ত লিপিবদ্ধ।
পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি জাতি-রাষ্ট্রের আলাদা আলাদা সংবিধান রয়েছে, যাতে রাষ্ট্রের চরিত্র ও নাগরিকদের রাজনৈতিক অভিপ্রায় লিপিবদ্ধ। সংবিধানের মর্যাদা এবং লক্ষ্য, উদ্দেশ্য-আদর্শ রক্ষা ও তদুপরি এতে অবিচল থাকা প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিকের পবিত্র দায়িত্ব। আমাদের সংবিধানের অখ-তা, মূলনীতির বিরোধিতার অর্থই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ও ঐতিহাসিক অর্জনের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ।
মূল বিষয়ে আসা যাক, গত ১৫ আগস্ট আপিল বিভাগের একজন মাননীয় বিচারপতি বিচারকরা ‘শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ’ মর্মে বক্তব্য দেওয়ায় সমালোচনার ঝড় উঠেছে সে সম্পর্কে কিছু বলতেই আমার এ লেখা। আমেরিকার সিরাকিউস বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক, keith J. Bybee-এর লিখিত ‘All judges are political-Except when they are not’ নামক বইটিতে উল্লেখ করেন, ‘Judicial decision making is essentially a matter of politics’। আমার অভিমত, Judges mix with politics। মূলত রাজনীতি এবং বিচারক একই সূত্রে আবদ্ধ।
এখন দেখা যাক, শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ কী? আমাদের সংবিধান মতে, উচ্চ আদালতের একজন বিচারকের সংবিধানের প্রতিটি মূলনীতি, আদর্শ-উদ্দেশ্য ও নাগরিকের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত রাখা বিচারিক দায়িত্ব, যা সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭,৪৪, ১০১-১০৭ সম্পর্ককৃত। একজন বিচারপতি এই মর্মে শপথ গ্রহণ করেই বিচারকের পদে আসীন হন।
সংবিধানে বর্ণিত শপথবাক্য প্রাসঙ্গিক হওয়ায় হুবহু তুলে ধরলাম, ‘আমি, ......., প্রধান বিচারপতি (বা ক্ষেত্রমত সুপ্রীম কোর্টের আপীল/হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক) নিযুক্ত হইয়া সশ্রদ্ধচিত্তে শপথ (বা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা) করিতেছি যে, আমি আইন-অনুযায়ী ও বিশ্বস্ততার সহিত আমার পদের কর্তব্য পালন করিব; আমি বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করিব; আমি বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করিব; এবং আমি ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হইয়া সকলের প্রতি আইন-অনুযায়ী যথাবিহিত আচরণ করিব।’
ওই শপথবাক্য অনুসারে বিচারকরা আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য এবং ‘সংবিধান ও আইনের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তাবিধান’ করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। যেহেতু রাষ্ট্রের আইন এবং সংবিধানের প্রতিটি বিষয় প্রজাতন্ত্রের নাগরিকের সম্মিলিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রতিফলন, সে দৃষ্টিকোণ থেকে যে সংবিধান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে বাংলার জনগণ মুক্তিসংগ্রামের মাধ্যমে রচনা করেছেন সেটির নিরাপত্তাবিধানে বিচারকরা তাদের বিচার কাজের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত দায়িত্বশীল থাকতে নির্দেশিত ও শপথবদ্ধ। ফলে জনগণের যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও মহান আদর্শের ছকে সংবিধান প্রণীত হয়েছে, এটা রক্ষা ও বাস্তবায়ন পুরোটাই রাজনীতিরই অবিচ্ছেদ্য অংশ।
জনগণ, সংবিধানের প্রস্তাবনায় বর্ণিত রাষ্ট্রের চারটি মূলনীতি রক্ষা ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে রাজনীতি করে থাকেন। অন্যদিকে বিচারকরা শপথ নিয়ে সংবিধানসম্মতভাবে সংবিধান রক্ষার রাজনীতি করেন। সে অর্থে উচ্চ আদালতের বিচারকরা শপথবদ্ধ থেকে সংবিধানের আলোকে জনগণের রাজনৈতিক অভিপ্রায় বিচারকার্যের মাধ্যমে বাস্তবায়ন ও চর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। এভাবেই বিচারকরা ‘শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ’।
যা হোক, বিচারকদের সম্মান ও বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি রক্ষা আমাদের সবার দায়িত্ব। অথচ একটি মহল মাঠে-ঘাঠে দোকান-রেস্তোরাঁয় অপবাদ ছড়িয়ে দিয়েছেন এই বলে যে, বিচারপতিরাও রাজনীতিতে অংশ নিয়েছেন। মূলত এর মাধ্যমে বিচার বিভাগকে জনমনে হেয় করার অপপ্রয়াস রয়েছে। যার ফলাফল কারও জন্যই সুফল বয়ে আনবে না। মাননীয় বিচারপতি যিনি ‘শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ’ পরিভাষাটি এর আগেও ব্যবহার করেছেন, গত বছরের ৩ নভেম্বর একটি আলোচনা সভাসহ একাধিক সভায় তিনি এটি ব্যবহার করেছেন। তখন ওই মহলটি সমালোচনা বা অপব্যাখ্যা করেননি, প্রয়োজনও ছিল না। এখন সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন, বিদেশি শক্তির উসকানি এবং অপরাজনীতির মৌসুম চলছে। তাই ইচ্ছাকৃতভাবে সাধারণ জনগণকে বিচারপতিদের প্রতি বিরূপ ধারণা দিতে এমন অযৌক্তিক সমালোচনায় নেমেছেন বলে মনে হয়, যা খুবই অনাকাক্সিক্ষত।
দেশের প্রতিটি আইনজীবী সমিতির সদস্যকে একজন ভদ্রলোক (Gentleman of the Bar) হিসেবে গণ্য করা হয়। তারা বিজ্ঞজন হয়েও ‘শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ’ পরিভাষাটির অর্থ বুঝেও না বোঝার ভান করে অপব্যাখ্যা প্রদান করে বিচারপতিদের পদত্যাগ দাবি করেছেন। বিচারপতিদের আইনজীবীদের কাতারে এসে রাজনীতি করতে আহ্বান জানিয়ে উপহাস করছেন। পদত্যাগের এমন যুক্তিহীন দাবি বিজ্ঞ আইনজীবীদের ক্ষেত্রে একেবারেই বেমানান। তাহলে ওইরূপ অপব্যাখ্যা ও পদত্যাগের দাবি কেন? এ দাবি সাধারণ জনগণকে বিভ্রান্ত করে দেশের আদালতগুলোয় হট্টগোল তৈরির মাধ্যমে বিচার বিভাগকে দেশে-বিদেশে ও জনমনে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপকৌশল কি-না, এটা এখন একটা বড় প্রশ্ন।
ইতোমধ্যে চলতি মাসের ২৮ তারিখ সুপ্রিম কোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চে বিশেষ এক মামলার সূত্রে মাননীয় বিচারকদের ও আইন-আদালতের প্রতি একদল বিজ্ঞ আইনজীবী কর্তৃক যে অসম্মান ও অসহনশীলতা প্রদর্শিত হয়েছে, তা বিচার বিভাগের প্রতি চরম তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করার শামিল। এমন আচরণ সুপ্রিম কোর্টের বিজ্ঞ আইনজীবীদের পক্ষে কতটা শোভনীয়? কেন এমনটা ঘটছে এর উত্তর খুঁজতে সাধারণ আইনজীবীরা আজ হতচকিত। তবে এটা অনুমেয় যে, এসব ষড়যন্ত্র, কু-আচরণ ও নেতৃত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর নামে যে অপরাজনীতি চলছে সেখান থেকে উত্তরণ খুবই জরুরি, অন্যথায় আইনজীবী সমাজ নিজেরাই নিজেদের সর্বনাশ ঘটাবেন। আর এ জন্য বেশি সময়ের প্রয়োজন হবে না। বলা হয়ে থাকে যে, আইনজীবীরা একটি পরিবার, জাতির বিবেক, বুদ্ধিজীবী, সহজাত নেতা, সভ্য পেশার সদস্য এবং আইনজীবী ও বিচারক একটি পাখির দুটি ডানা। সুতরাং, এসব বাক্যকে অর্থহীন করে ফেলার কোনো চেষ্টা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
