খুলনায় তিন দফা দাবিতে জ্বালানি তেল ব্যবসায়ীদের ডাকা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু হয়েছে। রবিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টা থেকে এ ধর্মঘট শুরু হয়। এ কারণে খুলনার পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা ডিপো থেকে জ্বালানি তেল উত্তোলন ও সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
তবে পেট্রোল পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেল বিক্রি স্বাভাবিক রয়েছে।
বাংলাদেশ ট্যাংকলরি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ জ্বালানি তেল পরিবেশক সমিতি, খুলনা বিভাগীয় ট্যাংকলরি শ্রমিক ইউনিয়ন এবং পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা ট্যাংকলরি শ্রমিক কল্যাণ সমিতি এ ধর্মঘটের ডাক দেয়।
জ্বালানি তেল ব্যবসায়ীদের তিন দফা দাবির মধ্যে রয়েছে ট্যাংকলরি ভাড়ার ওপর ভ্যাট সংযুক্ত নয় ও ট্যাংকলরি ইকোনমিক লাইফ ২৫ বছরের বেশি নির্ধারণ করে পৃথকভাবে সুস্পষ্ট গেজেট প্রকাশ, জ্বালানি তেল বিক্রির ওপর প্রচলিত কমিশন কমপক্ষে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ করা এবং জ্বালানি তেল ব্যবসায়ীরা কমিশন এজেন্ট বিধায় প্রতিশ্রুতি মোতাবেক সুস্পষ্ট গেজেট প্রকাশ করা।
জ্বালানি তেল ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের খবরে শনিবার (২ সেপ্টেম্বর) রাতে খুলনায় পেট্রোল পাম্পগুলোতে জ্বালানির জন্য মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট গাড়ির লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। তবে রবিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সব পাম্পে স্বাভাবিকভাবে তেল বিক্রি হয়েছে।
ডুমুরিয়ার মেসার্স এ লতিফ ফিলিংয়ের ম্যানেজার মোস্তাক মোল্লা বলেন, তাদের তেল বিক্রি বন্ধে কোনো নির্দেশনা নেই। তাই যত সময় পাম্পে তেল থাকবে তত সময় বিক্রি করবেন।
এ ফিলিং-এ মোটরসাইকেলের তেল কিনতে এসেছেন সন্দিপন বিশ্বাস। তিনি জানান, আগে তিনি একসঙ্গে দু শ টাকার তেল কিনতেন। অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘটের খবরে তিনি একবারে এক হাজার টাকার পেট্রল কিনেছেন।
খুলনা সিটি বাইপাসে (জয় বাংলার মোড়) অবস্থিত মেসার্স মারিয়া ফিলিং স্টেশন। এ স্টেশনের ম্যানেজার বাশারুল ইসলাম বলেন, তাদের স্টেশনে ধারণক্ষমতার ৪৬ হাজার লিটার। যত সময় স্টেশনে তেল থাকবে বিক্রি করবেন। তেল বিক্রি বন্ধে কোনো নির্দেশনা আসেনি।
এ পাম্পে তেল কিনতে আসা বাসচালক এরশাদ বলেন, সাতক্ষীরা থেকে যাত্রী নিয়ে খুলনা এসেছেন। তিনি এক সাথে ১৫ হাজার টাকা তেল কিনলেন। আগে ১০ হাজার টাকার তেল কিনতেন। তবে এতে যাত্রী ভাড়ার বেশিরভাগ টাকাই খরচ হয়েছে। যার নেতিবাচক বাস স্টাফদের ওপরই পড়বে।
অনির্দিষ্টকালের জন্য ঘোষিত কর্মসূচী চলাকালীন দুপুরে খুলনাস্থ খালিশপুরের ট্যাংকলরি ভবনের সামনে বাংলাদেশ জ্বালানী তেল পরিবেশন সমিতির খুলনা বিভাগীয় কমিটির সভাপতি আব্দুল গফফার বিশ্বাসের সভাপতিত্বে এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় অন্যদের মধ্যে আর বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জ্বালানী তেল পরিবেশক সমিতির সিনিয়র সহ-সভাপতি মোড়ল আব্দুস সোবহান, সাধারণ সম্পাদক শেখ মুরাদ হোসেন, বাংলাদেশ ট্যাংকলরি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি এম মাহবুব আলম, খুলনা বিভাগীয় ট্যাংকলরি শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মীর মোকছেদ আলী, সাধারণ সম্পাদক আলী আজিম, কোষাধ্যক্ষ মো. মিজানুর রহমান মিজু, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা ট্যাংকলরি শ্রমিক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম কালু , সংগঠনের নেতা শেখ জাহঙ্গীর হোসেন, আব্দুল মান্নান খান, মো. কামাল হোসেন, কাজী রফিকুল ইসলাম নান্টু, শেখ জামিরুল ইসলাম, মো. মুরাদজ্জামান, শেখ আশিকুজ্জামান প্রমুখ।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, ২০১৯ সাল থেকে একই দাবিতে আন্দোলন করতে হচ্ছে আমাদের। জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী, সচিব, উপ-সচিব, বিপিসি চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টরা বারবার আমাদের দাবী যৌক্তিক বলেছেন এবং প্রতিবার নির্দিষ্ট করে সময় দিয়েছেন। উক্ত সময়ের মধ্যে দাবিগুলো বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। জনগণের ভোগান্তি ও সরকারকে বিপদে ফেলা যেহেতু আমাদের কাম্য নয়, সেহেতু প্রতিবার আমাদের আন্দোলন স্থগিত করা হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে এবং দাবীসমূহ বাস্তবায়নে বারবার ব্যার্থ হয়েছেন। বর্তমান বাজারদর ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুতের মূল্যে বারবার বৃদ্ধি করা হয়েছে, কর্মচারীর বেতন বৃদ্ধি করতে হয়েছে, সকল ক্ষেত্রে ব্যয় কয়েকগুন বৃদ্ধি পেয়েছে, অথচ জ্বালানী তেল বিক্রয়ের ওপর কমিশন বৃদ্ধি করা হয়নি। যেখানে ১৩০ টাকা ১ লিটার অকটেন-পেট্রোলে বিক্রয়ে ৮% কমিশন দেওয়া হয়, ৫২ টাকা ১ লিটার এলপি গ্যাস বিক্রয়ে ৮ টাকা অর্থাৎ ১৬% কমিশন দেওয়া হচ্ছে। ফলে জ্বালানী ব্যবসায়ীদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে।
বক্তারা বলেন, আর প্রতিশ্রুতি নয় আমাদের দাবি মেনে নিয়ে বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত ধর্মঘট অব্যাহত থাকবে। জনগণের ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে ফিলিং স্টেশন আমরা বন্ধ রাখিনি, তবে যেহেতু তেল উত্তোলন বন্ধ সেহেতু যেকোন সময় তেল না থাকার কারণে ফিলিং স্টেশন আপনা-আপনি বন্ধ হয়ে যাবে। তখন জনগণ চরম ভোগান্তির স্বীকার হবে।
বক্তারা উদ্ভূত পরিস্থিতির উত্তরণে সংশ্লিষ্টদের দ্রুত সময়ের মধ্যে দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ ট্যাংকলরি মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় মহাসচিব শেখ ফরহাদ হোসেন বলেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের ধর্মঘট চলবে। ধর্মঘটের কারণে খুলনা বিভাগের ১০ জেলা এবং বৃহত্তর ফরিদপুরের ৪ জেলায় তেল সরবারহ বন্ধ রয়েছে।
বাংলাদেশ জ্বালানি তেল পরিবেশক সমিতির সভাপতি আব্দুল গফফার বিশ্বাস বলেন, তিন দফা দাবিতে দীর্ঘদিন থেকে আন্দোলন করছেন জ্বালানি তেল ব্যবসায়ীরা। এ নিয়ে সংশ্লিষ্টরা কয়েকবার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। প্রতিবার সময় নিয়েছেন। কিন্তু দাবি বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে বাধ্য হয়েই জ্বালানি তেল উত্তোলন ও পরিবহন বন্ধের কর্মসূচি পালন করতে হচ্ছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
এর আগে গত ২৩ আগস্ট নগরীর নিউমার্কেট এলাকার একটি রেস্টুরেন্টে আয়োজিত প্রস্তুতি সভায় জ্বালানি তেল বিক্রির ওপর কমিশন বাড়ানোসহ তিন দফা দাবি পূরণে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন জ্বালানি তেল ব্যবসায়ীরা। দাবি পূরণে বেঁধে দেওয়া সময়সীমা শেষ হওয়ায় ৩১ আগস্ট বিকেলে নগরীর খালিশপুরে ট্যাংকলরি ভবনে সভা করে ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের কয়েকটি সংগঠন ৩ সেপ্টেম্বর থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট পালনের চূড়ান্ত ঘোষণা দেয়।
