নির্বাচন পর্যন্ত তেল গ্যাস বিদ্যুতে স্বস্তি দেওয়ার চিন্তা

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০১:৫৪ এএম

নির্বাচনের আগে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি এ সময়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম না বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। সেই সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা কমতে পারে। বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপকালে এমন আভাস পাওয়া গেছে।

গত ১৪ বছরে সরকারের নানামুখী উদ্যোগের কারণে শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎসুবিধার আওতায় এসেছে। পাশাপাশি বিদ্যুতের যে ভয়াবহ লোডশেডিং ছিল তা এখন আর নেই। তবে বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়লেও জ্বালানি সংকটের কারণে সাশ্রয়ী দামে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎসেবা পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। মূলত বিদ্যুৎ খাতে টেকসই উন্নয়ন না হওয়ার কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বিদ্যুৎ নিয়ে প্রায় এক যুগ ধরে ফুরফুরে মেজাজে থাকা সরকার ধাক্কা খায় গত বছরের শেষ দিকে। ১৪ বছর আগের সেই লোডশেডিং আবার মাঝেমধ্যে ফিরে আসায় মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। নানা কৌশলে সরকার সেই পরিস্থিতি সামাল দিয়ে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক রেখেছে। নির্বাচনের আগে যাতে নতুন করে পরিস্থিতির অবনতি না হয়, সে জন্য সরকার সতর্ক অবস্থায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা।

জানতে চাইলে পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নতুন কোনো সংকট তৈরি না হলে বিদ্যুতের এই স্বাভাবিক পরিস্থিতি অব্যাহত থাকবে। কারণ আর কিছুদিন পরই শীতের প্রভাবের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা কমে যাবে। পাশাপাশি বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা আরও বাড়বে। ইতিমধ্যে ভারতের আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোদমে উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন করেছে। এ ছাড়া এস আলমসহ আরও কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আসবে। সবকিছু ঠিক থাকলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে বলে আমরা আশা করি।’

চলতি বছরের শেষ দিকে অথবা জানুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। যদিও নির্বাচন নিয়ে নানা রকম সংশয়, আলোচনা-সমালোচনা চলছে। তারপরও নির্বাচনের আগে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার পরিকল্পনা নিয়েই এগোচ্ছে সরকার।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রমতে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে টানা তৃতীয় মেয়াদে দেশ পরিচালনাকারী এই সরকার প্রথম মেয়াদে ২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করে। তখন দেশে ২৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে থেকে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ৪ হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট। বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা বেড়ে ১৫৩ এবং বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ হাজার মেগাওয়াট (আমদানি ও অনগ্রিড নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ)। যদিও এখন পর্যন্ত গত ১৯ এপ্রিল দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ৬৪৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। চলতি বছর দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা প্রক্ষেপণ করা হয়েছে ১৭ হাজার মেগাওয়াট।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, তামপাত্রা কমতে থাকার কারণে নির্বাচনের আগমুহূর্তে বিদ্যুতের চাহিদাও অনেকটাই কমে যাবে। তা ছাড়া এই সময়ে নির্মাণাধীন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে বেশ কিছু কেন্দ্র উৎপাদনে আসবে। ফলে জাতীয় গ্রিডে আমদানিসহ আরও প্রায় ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ হওয়ার কথা রয়েছে। নতুন উৎপাদনে আসা বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে এস আলম ও ভারতের আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎকেন্দ্রের আপাতত কয়লা নিয়ে সংকট হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। পায়রা ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রেও কয়লার সংকট থাকবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইতিমধ্যে পায়রার বকেয়া নিয়ে যে জটিলতা ছিল তা অনেকটাই কেটে গেছে। এরপরও যদি ডলার কিংবা জ্বালানি নিয়ে সংকট দেখা দেয় তাহলে এই খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে যেভাবেই হোক বিদ্যুতের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখবে সরকার। সব মিলে লোডশেডিং তেমন একটা থাকবে না। তবে বিতরণ ও সঞ্চালন লাইনের ত্রুটির কারণে এলাকাভেদে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের আশঙ্কা রয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, কিছুদিন আগে বিদ্যুতের যে লোডশেডিং ছিল তা কিছুটা সামাল দিতে পেরেছে সরকার। এর মূল কারণ হলো বিদ্যুতের চাহিদা কমে যাওয়া। ঈদের আগে প্রচন্ড যে গরম ছিল তা এখন অনেক কমে গেছে। তারপরও বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ থেকে ১ হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ নিয়ে চলমান সমস্যার মূল কারণ হলো ডলার ও জ্বালানির সংকট। নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত শীতের সময় এমনিতেই বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকবে। সরকার চাইলে তখন তিন থেকে চার মাসের জন্য যেকোনো মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পারবে। কিন্তু পরে আবার পরিস্থিতি আগের অবস্থায় চলে যাবে। কারণ বিদ্যুৎ খাতের যে উন্নয়ন তা টেকসই নয়। ফলে নতুন নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র এলেও জ্বালানির অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। দিন দিন বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ার কারণে সাশ্রয়ী দামে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিতে পারছে না সরকার।

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম বাড়ানোর কারণে সাধারণ মানুষের মনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আইএমএফের ঋণ নিতে তাদের শর্ত পূরণ করতে ভর্তুকি সমন্বয়ের নামে গণশুনানি ছাড়াই নির্বাহী আদেশে চলতি বছর গ্রাহকপর্যায়ে তিন দফায় বিদ্যুতের দাম অন্তত ১৫ শতাংশ বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্যাসের দামও বাড়িয়েছে সরকার। গত জানুয়ারিতে চার শ্রেণির গ্রাহকের গ্যাসের দাম অস্বাভাবিক হারে ১৭৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এমন পরিস্থিতিতে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ানো হচ্ছে, যখন নিত্যপণ্যের চড়া দামে মানুষ সংকটে রয়েছে। ডলার সংকটসহ নানা কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি কমে যাওয়ার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও কমেছে। একদিকে বিদ্যুৎ-সংকট, অন্যদিকে দাম বৃদ্ধি এসব নিয়ে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী, এমপি ও নেতাকর্মী তাদের নির্বাচনী এলাকায় গিয়ে বেশ অস্বস্তিতে পড়েন। সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে আগে থেকেই। নতুন করে আবারও বিদ্যুতের দাম বাড়তে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত এ বছর বিদ্যুতের দাম আর না বাড়ার সম্ভাবনা বেশি দেখা যাচ্ছে এখন পর্যন্ত।

এদিকে গত ২ মে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) জমা দেওয়া মিটারবিহীন আবাসিক গ্যাস গ্রাহকদের বিল পুনর্নির্ধারণ সংক্রান্ত তিতাস গ্যাসের আবেদনের বিষয়টি স্থগিত রয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন জানিয়েছে, অন্যান্য বিতরণ কোম্পানির সঙ্গে কথা বলে পেট্রোবাংলা সমন্বিত প্রস্তাব জমা দিলে তারপর নিয়ম অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তিতাস গ্যাসের ওই প্রস্তাব দেওয়ার পর দেশ রূপান্তরসহ বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। কারণ তিতাসের ওই আবদার পূরণ হলে আবাসিকে মিটারবিহীন এক এবং দুই চুলার গ্রাহকের ক্ষেত্রে অন্তত ৩৯ থেকে ৪৭ শতাংশ গ্যাসের দাম বাড়বে। আপাতত গ্যাসের দাম বৃদ্ধির পদক্ষেপ থেকে সরে এসেছে সরকার।

নির্বাচনের আগে নতুন করে আবার গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঝুঁকি সরকার নেবে না বলে মনে করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা।

গ্যাস-বিদ্যুতের দাম না বাড়লেও জ্বালানি তেলের দাম কমতে পারে এমন আভাস পাওয়া গেছে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমতির দিকে। চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম কমতে থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে গোল্ডম্যান স্যাকস। দাম কম থাকায় দীর্ঘ সময় ধরেই তেল বিক্রি করে লাভ করছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। পাশাপাশি জ্বালানি তেল আমদানির ওপর ৫ শতাংশ অগ্রিম কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনের আগে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ১০ থেকে ১৫ টাকা কমাতে পারে সরকার।

গত ২৯ মে রাজধানীতে ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ (এফইআরবি) আয়োজিত এক সেমিনারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জ্বালানির দাম কমানোর বিষয়ে ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, ‘জনগণকে স্বস্তি দিতে তেল ও কয়লার দামের সমন্বয় দরকার। এসব বিষয়ে আমরা ইতিমধ্যে আলোচনা করছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত