দুই দিনের সফরে গত ১০ সেপ্টেম্বর ঢাকায় এসেছিলেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। ঘটনাটি রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ তো বটেই। তবে মজার বিষয় হলো মাখোঁর এবারের সফর একইসঙ্গে হয়ে উঠল
সাংস্কৃতিক। কারণ সেদিন রাতেই তিনি হাজির হন দেশের জনপ্রিয় ব্যান্ডদল ‘জলের গান’-এর শিল্পী ও সংগীত পরিচালক রাহুল আনন্দের হোম স্টুডিওতে। তিনি যে রাহুলের অতিথি হবেন সে কথা আগেই জানাজানি হয়ে যায়। প্রেসিডেন্ট তার বাড়িতে প্রবেশের একটু আগেই তিনি টেলিফোনে কথা বলেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। তখন বলেছিলেন, ‘উনি আজ রাতে আমার অতিথি। আমাকে যতটুকু জানানো হয়েছে যে, উনি আমার গান-বাজনা, স্পেশালি বাদ্যযন্ত্রের প্রতি ইন্টারেস্টেড। কারণ উনি নিজেও একজন মিউজিশিয়ান। ফলে একজন মিউজিশিয়ানের বাড়িতে একজন প্রেসিডেন্ট আসবেন ঠিকই, তবে মিউজিশিয়ান প্রেসিডেন্ট আসবেন! আমার ধারণা, উনি হয়তো আমার ইন্সট্রুমেন্টগুলো দেখবেন, গানও শুনতে চাইতে পারেন। আবার নাও আসতে পারেন। তবে আমাকে যেহেতু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, সেহেতু নিজের যতটুকু প্রস্তুতি রাখা দরকার সেটা আমি রেখেছি। উনাকে সাদর অভ্যর্থনা জানানোর জন্য প্রস্তুতি পর্ব শেষ হয়েছে। কারণ উনি তো শুধু আমার অতিথি নন, উনি আমাদের রাষ্ট্রের অতিথি, আমাদের সরকারের অতিথি, আমাদের দেশের জনগণের অতিথি। সাধারণ একজন শিল্পী হিসেবে আমি যতটুকু পারব উনাকে আনন্দ দিতে চেষ্টা করব। উনার কিউরিসিটি মূলত আমার মিউজিক ইন্সট্রুমেন্টগুলোর মেকিং-টেকিংয়ের ওপর।’
তবে রাহুলের যে আশঙ্কা ছিল সেটি ভুল প্রমাণ করে ঠিকই তার ধানম-ির ‘ভাঙাবাড়ি’তে উপস্থিত হন প্রেসিডেন্ট! রাহুল আনন্দ ও চিত্রশিল্পী ঊর্মিলা শুক্লা দম্পতি যে পুরনো বাড়িটিতে ভাড়া থাকেন, সেটির কোনো নাম নেই। তাই এটিকে ভালোবেসে ‘ভাঙাবাড়ি’ নাম দিয়েছেন রাহুল আনন্দ। তাদের সংসারে অতিথি হয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। অতিথিকে বরণ করতে বাড়তি কৃত্রিমতা রাখেননি তারা। সদর দরজার চৌকাঠ পেরোলেই পিচঢালা আঙিনা, সন্ধ্যায় আঙিনায় রংবেরঙের ফুলের পাপড়ি বিছিয়ে আলপনা এঁকেছেন ঊর্মিলা শুক্লা।
পূর্বের আলাপচারিতার রেশ ধরেই রাহুল আনন্দর কাছে জানতে চাওয়া হয়, কেমন ছিল এই বিরল অভিজ্ঞতা? তিনি বলেন, ‘গত রবিবার রাত ১১টার দিকে ইমানুয়েল মাখোঁকে ‘ভাঙাবাড়ি’তে বরণ করে তাকে স্টুডিওতে নেওয়া হয়। স্টুডিওর দেয়াল জুড়ে থরে থরে সাজানো রয়েছে বাদ্যযন্ত্র। দ্রৌপদী, পাগলা, পদ্মা, মনদোলা, তোতাবান, চন্দ্রবান আমার নির্মিত সেই সব বাদ্যযন্ত্রের বাহারি নাম এগুলো। গানে-আড্ডায় বাংলাদেশের লোকসংগীতের সমৃদ্ধ ভান্ডারের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের পরিচিতি ঘটানোর চেষ্টা করেছি। লালন থেকে প্রতুল মুখোপাধ্যায়, আব্বাসউদ্দীন আহ্মদ থেকে আবদুল আলীমের গান শুনিয়েছি। কখনো ‘আমি বাংলায় গান গাই’, কখনো ‘নাইয়ারে নায়ের বাদাম তুইলা, কোন দূরে যাও চইলা’ গেয়ে শোনাই তাকে। সংগীতের সুর নিজেই একটি ভাষা, ভাষার ব্যবধান ছাপিয়ে আমাদের লোকগানের সুরলহরিতে মজেছিলেন মাখোঁ। উনি এতটাই মশগুল ছিলেন যে পরিকল্পনা অনুযায়ী ৪০ মিনিটের মতো অবস্থানের কথা থাকলেও তিনি ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট ছিলেন আমাদের বাড়িতে।’
রাহুল আরও জানান, ইমানুয়েল মাখোঁকে একটি একতারা উপহার দিয়েছি। আমার কাছে একতারা বাজানো শিখেছেন মাখোঁ। ফরাসি প্রেসিডেন্টের তরফ থেকে একটি কলম উপহার পেয়েছি। রাহুল আনন্দ বলেন, ‘উনি বলেছেন, আমি যেন এই কলম দিয়ে গান, কবিতায় প্রকৃতির কথা লিখি, সেই গান, কবিতা উনি শুনবেন। আমি ছোট মানুষ, আমার সাধ্যের মধ্যে তাকে সুখী করার চেষ্টা করেছি।’
আড্ডার একপর্যায়ে রাহুল আনন্দকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট জিজ্ঞাসা করেন, ‘তোমার স্বপ্ন কী?’ রাহুল আনন্দ বলেন, ‘সবুজ পৃথিবী দেখতে চাই।’ এরপর ফরাসি প্রেসিডেন্ট জানতে চান, ‘সে ক্ষেত্রে তোমার ভূমিকা কী?’ রাহুল আনন্দ বলেন, ‘আমি যেখানেই গান করি, সেখানেই গাছ লাগানো, নদী-প্রকৃতির যত্ন নেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করি। ১৯৯৪ সাল থেকে ফাঁকা জায়গায় আমি গাছ লাগাই, কিছুদিন আগে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তেও গাছ লাগিয়েছি।’ রাহুল আরও বলেন, ‘আমি বাদ্যযন্ত্র বানাতে ভালোবাসি। বাদ্যযন্ত্র বানাতে কাঠ লাগে, কাঠের জন্য গাছ দরকার। আর আমি নিজেকে পাখি মনে করি। পাখির জন্য গাছ অপরিহার্য। আমি গাছ না লাগালে পরবর্তী সময় যন্ত্র বানানোর জন্য গাছ কোথায় পাবে? পাখিরা কোথায় থাকবে?’
আপনার ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট আগ্রহী হলেন কেন জানতে চাইলে রাহুল বলেন, ‘আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে আমি কিছুদিন আগে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ নামে একটি এক্সিবিশন করেছিলাম। তাতে সাইকেলের যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরি করা আমার কিছু মিউজিক ইন্সট্রুমেন্ট প্রদর্শিত হয়। উনারা তো এসব ব্যাপরে খোঁজখবর রাখেন। সেখান থেকে আমার ব্যাপারে আগ্রহ তৈরি হতে পারে।’
এত বড় একটি ঘটনা কিন্তু তিনি আসার আগে আপনি ফেসবুকে কিছুই লেখেননি কেন? প্রশ্ন করতেই রাহুলের তৈরি উত্তর, ‘আমি বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ফেসবুকে পোস্ট দিই না। কারও রক্ত লাগবে বা কোনো সাহায্য দরকার, কিংবা জলের গানের কোনো নতুন কাজ বা স্টেজ শোর খবর থাকলে সেটা জানাতে, আর আমার নাটকের দল প্রাচ্যনাটের কোনো ঘোষণা থাকলে সেটি জানাতে পোস্ট করি। ব্যক্তিগত বিষয় ব্যক্তিগত রাখতেই পছন্দ করি। আসলে ফেসবুক তো সবকিছু না!’
যেকোনো দেশে সফরকালে স্থানীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে শিল্পীদের স্টুডিওতে যান মাখোঁ। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সফরে এসে রাহুলসহ চারজন শিল্পীর সঙ্গে আলাপ করেন তিনি। অন্য শিল্পীরা হলেন আশফিকা রহমান, কামরুজ্জামান স্বাধীন ও আফরোজা সারা।
