চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার খালপাড় এলাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করেন নুরুস সাদেকিন। কিছুদিন আগে হঠাৎ বুকে ব্যথা নিয়ে ভর্তি হন নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে। দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায়, তার হার্টের রক্তনালিতে ৯০ শতাংশের ৪টি ব্লক রয়েছে। দ্রুত অস্ত্রোপচার বা সার্জারি জরুরি। কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয়বহুল হওয়ায়, চলতি মাসের শুরুতে ভর্তি হন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ সার্জারি বিভাগে। ভর্তির ১৫ দিন পরেও তার বাইপাস সার্জারি হয়নি।
নুরুস সাদেকিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খরচ কম শুনে ভর্তি হলেও ১৫ দিন হয়ে গেছে, কিন্তু সার্জারির সিরিয়াল এখনো পাইনি। আমার মতো অনেকে এক মাসের বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করছেন। এখানে সপ্তাহে দুটির বেশি অপারেশন হয় না। যন্ত্রপাতি বিকল থাকায় সময় লাগছে।’
হৃদরোগ চিকিৎসায় দেশের প্রথম সরকারি হাসপাতাল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ। তিন যুগেরও বেশি সময় আগে যাত্রা করলেও, বাড়েনি এ হাসপাতালের সেবার মান। বর্তমানে হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগে প্রতিদিন ভর্তি থাকেন তিনশর বেশি রোগী। শয্যা সংকটে রোগীদের হাসপাতালের বারান্দাতেও থাকতে হয়।
হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, পুরুষ ও নারী ওয়ার্ডে স্বাভাবিকের চেয়ে রোগী বেশি থাকায় মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন অনেকে। সিসিইউতে গিয়ে দেখা যায়, ২০ শয্যার অতিরিক্ত রয়েছেন আরও চার থেকে পাঁচজন।
চিকিৎসকরা জানান, বর্তমানে হৃদরোগ বিভাগে দুজন সহযোগী অধ্যাপক, ৯ জন সহকারী অধ্যাপক, দুজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট, একজন রেজিস্ট্রার ও ৪ জন সহকারী রেজিস্ট্রার দিয়ে এই বিভাগ চলছে, যা রোগীর তুলনায় খুবই অপ্রতুল।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, গড়ে প্রতিদিন বহির্বিভাগে ও জরুরি বিভাগ মিলিয়ে চিকিৎসা নিতে আসেন ২০০ রোগী। তবে হাসপাতালের পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও অন্যসব সুযোগ-সুবিধা না থাকায় এসব রোগীকে নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে সেবা নিতে হয়।
এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে হাসপাতালের সামনের অংশে ক্যানসার ইউনিট ভবনে আলাদা করে তৈরি করা হচ্ছে হৃদরোগ বিভাগ। যার কাজ চলমান রয়েছে। এ কাজ শেষ হলে হাসপাতালে সেবাগ্রহীতাদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বাড়বে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে কার্ডিওলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রেজওয়ান রেহান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম জেলার অধিকাংশ রোগী এ হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নিচ্ছেন। খুব স্বল্প খরচে এনজিওগ্রাম কিংবা হার্টের রিং পরানো যাচ্ছে রোগীদের। এ সমস্যা আরও কমে আসত যদি আমাদের এনজিওগ্রামের (ক্যাথল্যাব) অপর একটি মেশিন সচল থাকত। গত দুবছর ধরে একটি মেশিন দিয়ে আমাদের কাজ করতে হচ্ছে। কিন্তু আমরা আমাদের পক্ষ থেকে কোনো ঘাটতি রাখছি না।’
তিনি আরও বলেন, একটি এনজিওগ্রাম করতে রোগীর খরচ হয় সব মিলিয়ে ৫০০০ টাকা এবং রিং পরাতে রিংয়ের মানভেদে সরকারের নির্ধারিত ফি দিয়ে সেটি রোগীকে কিনতে হয়, যা বাইরের হাসপাতালগুলোতে মানভেদে লাখ টাকার ওপরে।
কার্ডিও সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফজলে মারুফ বলেন, ‘আমাদের পর্যাপ্ত ডাক্তার থাকলেও রোগীর তুলনায় তা অপ্রতুল। একটি ইউনিট থাকায় হাসপাতালে সপ্তাহে দুটি সার্জারি করা সম্ভব হয়। আমাদের যদি ইউনিট বাড়ানো যেত তবে প্রতি সপ্তাহে আগের তুলনায় আরও বেশি সার্জারি করা সম্ভব হতো।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ব্যবহারের যন্ত্রপাতিগুলো ১২ বছর পুরনো হলেও আমরা সেসব দিয়ে কাজ চালাচ্ছি। কিন্তু যখন এসব মেশিন বিকল হয় তখন আর কাজ চালিয়ে নেওয়া যায় না। তা সমাধান করা পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হয়। ইদানীং আমাদের এনেস্থেসিয়া মেশিন বিকল থাকায় ঢাকা থেকে লোক এনে ঠিক করা হয়েছে। কিন্তু এতেও সমাধান হয়নি।’
সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাসপাতালে সুযোগ-সুবিধার তুলনায় হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি, তাই রোগীদের ফ্লোরে রেখে চিকিৎসা দিতে হয়। তা ছাড়া আমাদের ২০টি করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ), পর্যাপ্ত না হওয়ায় সেখানেও রোগীদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হয়।’
তিনি বলেন, কার্ডিও সার্জারিতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির সমস্যা থাকা সত্ত্বেও গত এক বছরে এই ওয়ার্ডে মোট ১৯ হাজার ২৯৭ জন রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। এনজিওগ্রাম করা হয়েছে ২ হাজার ৪৭৩ জনের। এনজিওপ্লাস্টি করা হয়েছে ৭০৩ জনের। পেসমেকার বসানো হয়েছে ১৭৯ জনের।
১৯৮৯ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হৃদরোগ বিভাগ চালু হয়। সরকারি পর্যায়ে চট্টগ্রামে এটিই একমাত্র স্বয়ংস¤পূর্ণ হৃদরোগ বিভাগ।
