অনেকেই অস্থিরতা প্রকাশ করে বলেন, আমি চোখের গোনাহ থেকে বাঁচতে পারি না, হারাম সম্পর্ক ছাড়তে পারি না, গোনাহের চিন্তা থেকে মুক্ত হতে পারি না ইত্যাদি। আমার জন্য করণীয় কী? এমন প্রশ্নের উত্তরে ইসলামি স্কলাররা বলেছেন- মৌলিক দুটি বিষয় অন্তরে থাকলে যেকোনো গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা সহজ। ১. অন্তর থেকে গোনাহটিকে খারাপ ও ক্ষতিকর মনে করা, ২. মনে সৎ সাহস রাখা।
আপনি কি গোনাহের কুফল ও ভয়াবহতা সম্পর্কে অবগত? কোনো কুসংস্কার, অপবিশ্বাস কিংবা কোরআন-হাদিসের ভুল ব্যাখ্যার কারণে গোনাহ আপনার কাছে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না তো? নিজের জীবনের পরিণতি সম্পর্কে আপনি সচেতন আছেন তো?
কোরআন-হাদিসে গোনাহ ও আল্লাহর অবাধ্যতার ভয়াবহতা ব্যাপক পরিমাণে আলোচনা করা হয়েছে। আল্লাহর দয়া সংক্রান্ত কোনো আয়াত কিংবা হাদিস থেকে যদি আপনার কাছে গোনাহের স্বাভাবিকতা অনুভূত হয় তাহলে মনে করবেন, আপনি কোথাও বুঝতে ভুল করছেন। সাহাবায়ে কেরাম আপনার মতো বুঝেননি। গোনাহ সম্পর্কে তাদের আকিদা হলো, গোনাহ অত্যন্ত ক্ষতিকর ও ধ্বংসাত্মক বিষয়। এজন্য গোনাহ থেকে পবিত্র করার জন্য তারা নিজেকে মৃত্যুদণ্ডের সম্মুখীন করতেও কুণ্ঠাবোধ করতেন না। আপনি যদি সাহাবায়ে কেরামের আকিদা থেকে বিচ্যুত হন, তবে আপনি সত্যপথ থেকেই বিচ্যুত হয়ে পড়বেন।
গোনাহ থেকে বাঁচার জন্য দ্বিতীয় যে বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, সৎসাহস। আপনি যদি হিম্মত করে মনের চাহিদার মোকাবিলা করতে পারেন, তাহলে গোনাহ থেকে বাঁচা অত্যন্ত সহজ। মনে রাখবেন, আপনার সবচেয়ে বড় শত্রু হলো- নফস ও শয়তান।
শত্রুর সামনে যে নিজের ভীরুতা ও কাপুরুষতা প্রকাশ করে, সে কখনো শত্রুর অত্যাচার থেকে নিরাপদ থাকতে পারে না। তাই মনের মধ্যে গোনাহের চাহিদা জন্ম নিলেই ভেঙে পড়বেন না। গোনাহের চাহিদার জন্ম নেওয়া একটি সহজাত বিষয়। কেউ তা থেকে নিরাপদ থাকতে পারে না। তবে বীরপুরুষ সেই, যে এই চাহিদার মোকাবিলা করতে সক্ষম হয় এবং শত্রুকে পরাস্ত করে।
অন্তরে গোনাহের চাহিদা জন্ম নিলেই যদি আপনি ভেঙে পড়েন, তাহলে নফস ও শয়তান আপনাকে অধিক পরিমাণে গোনাহ করানোর সুযোগ খুঁজবে। পক্ষান্তরে আপনি যদি মনের চাহিদার মোকাবিলা করেন তবে তারা সহজেই আপনাকে কোনো গোনাহে জড়াতে পারবে না। যদি ঘটনাচক্রে কখনো তারা আপনাকে গোনাহে জড়িয়ে ফেলে, তবে কালবিলম্ব না করে দ্রুত তওবা করে নিন এবং ওই গোনাহের প্রতিকারে কোনো নেক কাজ সম্পন্ন করুন। পুনরায় নফস ও শয়তানের মোকাবিলায় বিজয়ী হওয়ার সংকল্প করুন। এভাবে ধীরে ধীরে গোনাহের চাহিদা দুর্বল হয়ে পড়বে।
একটি শক্তিকে যতই ব্যবহার করা হয়, ততই তা শাণিত ও প্রবল হয়। সুন্নাহসম্মত পন্থায় আপনি যত বেশি মনের চাহিদার মোকাবিলা করবেন, আপনার মানসিক শক্তি ততই প্রবল হবে আর গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা আপনার জন্য ততই সহজ হবে। হিম্মতের মাধ্যমে যদি মানুষ এভারেস্ট জয় করতে পারে তবে আপনি কেন গোনাহের চাহিদার মোকাবিলা করতে পারবেন না?
গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার মৌলিক দুটি বিষয়ের পাশাপাশি আরও কয়েকটি বিষয় রয়েছে, যেগুলোর অনুসরণ গোনাহমুক্ত জীবন গড়ে ওঠে। সেগুলো হলো-১. দৈনিক কিছুক্ষণ সময় বের করে মৃত্যু ও আখেরাতকে স্মরণ করা। ২. অর্থ ও সংক্ষিপ্ত তাফসিরসহ প্রতিদিন কোরআন মাজিদের কিছু অংশ গভীর চিন্তা-ফিকিরের সঙ্গে পাঠ করা। ৩. মুত্তাকি তথা আল্লাহওয়ালা লোকদের মজলিসে যাওয়া ও তাদের সঙ্গে চলাফেরা করা। ৪. গোনাহের উপকরণসমূহ বর্জন করা। ৫. অসৎ সঙ্গ পরিহার করা। ৫. প্রতি সপ্তাহে দুটি করে রোজা রাখা। ৬. তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করা। ৭. নন মাহরামদের থেকে দূরে অবস্থান করা। ৮. স্ত্রীকে সঙ্গে রাখা। ৯. ঘরে নিয়মিত দীনি বিষয়ের তালিম করা। ১০. অন্যকে গোনাহ ছাড়ার দাওয়াত দেওয়া। ১১. সর্বদা অজু অবস্থায় থাকা। ১২. মসজিদে অধিক সময় ব্যয় করা। ১৩. নারীর সঙ্গ পরিহার করা। ১৫. স্বামী-স্ত্রী পরস্পর ভালোবাসাপূর্ণ সম্পর্ক রাখা।১৬. মানুষের অগোচরে নেক আমল করা। ১৭. আপন জিহ্বাকে সর্বদা জিকিরের মাধ্যমে তরতাজা রাখা। ১৮. নিয়মিত হাদিস ও আত্মশুদ্ধিমূলক বই পাঠ করা।
